রোকসানা আক্তার, বয়স-৪০ বছর। পেশা-ব্যাংকার। কাছে কম দেখেন এটাই তার সমস্যা। রোকসানা আক্তারের চশমা দেবার পর সাধারণ নিয়ম অনুযায়ী চোখের প্রেসার মেপে দেখি ৩২ মি.মি. মারকারি যা সাধারণ ১০-২০ মি.মি. মারকারি থেকে অনেক বেশি। আমার সন্দেহ হলো- তার কি গ্লাকোমা আছে? আমি চোখে ফোঁটা ওষুধ দিয়ে চোখের ভিতরে পরীক্ষা করে দেখি তার অপটিক নার্ভে পরিবর্তন হয়েছে। সম্মানিত রোগীকে বুঝিয়ে বললাম, আমি আপনার চোখের আরও কয়েকটি পরীক্ষা করাতে চাই। তিনি তো অবাক! তার চোখে তো কম দেখা ছাড়া আর কোন সমস্যা নেই। তারপরও আমার কথায় তিনি দৃষ্টির পরসীমা পরীক্ষা এবং গ্লাকোমার জন্য ওসিটি পরীক্ষা করলেন। সকল পরীক্ষায় দেখা গেল তার চোখে গ্লাকোমা হয়েছে কিন্তু প্রাথমিক পর্যায়ে। রোকসানা আক্তারকে তার রোগটি সম্পর্কে যখন বললাম, তিনি কিছুটা বিরক্ত হলেন এমনকি ভয়ও পেলেন। তখন তাকে বুঝিয়ে বললাম, এটা চোখের প্রেসার, আপনাকে প্রেসার কমাবার ওষুধ দিচ্ছি। আপনি ভাল থাকবেন। সারা জীবন ওষুধ ব্যবহার করতে হতে পারে। প্রয়োজন হলে সার্জারি করা লাগতে পারে।
রোকসানা আক্তার একজন ব্যস্ত ব্যাংক অফিসার। সেজন্য তাকে একটি মাত্র ফোঁটা ওষুধ দিয়েছি রাতে দেবার জন্য। তাতেই উনি গত এক বছর যাবত্ ভাল আছেন। এটাই হচ্ছে অদৃশ্যমান গ্লাকোমা। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে যার কোন উপসর্গ থাকে না কিন্তু প্রাথমিক অবস্থায় রোগ নির্ণয় না হলে চোখের নার্ভ ক্ষয় হয়ে যায় এবং নিরব অন্ধত্বকে বরণ করে নিতে হয়।
অন্ধত্বের কারণ গ্লাকোমা বিষয়ে সচেতন করার জন্য বিশ্ব গ্লাকোমা সমিতি প্রতি বছরই আয়োজন করে থাকে বিশ্ব গ্লা¬কোমা সপ্তাহ এবং বিশ্ব গ্লাকোমা দিবস। আজ (১৫ মার্চ ২০১৪) বিশ্ব গ্লাকোমা দিবস। “বিট ইনভিজিবল গ্লাকোমা বা অদৃশ্যমান গ্লাকোমাকে প্রতিহত করুন”। এই হচ্ছে এ বছরের বিশ্ব গ্লাকোমা দিবসের শ্লোগান বা প্রতিপাদ্য বিষয়। বিশ্ব গ্লাকোমা সমিতি প্রদত্ত এই শ্লোগানে বোঝানো হয়েছে- গ্লাকোমা রোগে অনেক সময় উপসর্গ থাকে না। সঠিক সময়ে সঠিক চিকিত্সা নিতে পারলে গ্লাকোমা প্রতিরোধ করা যায় এবং এ রোগ নিয়ে সারা জীবন ভালো থাকা যায়। গত ২০০৮ সাল থেকে প্রতি বছরই মার্চ মাসে বিশ্ব গ্লাকোমা দিবস পালন করা হয়ে থাকে। এছাড়া গত ২০১০ সাল থেকে এক সপ্তাহব্যাপী বিশ্ব গ্লাকোমা সপ্তাহ পালন করা হচ্ছে। এ বছর ৯-১৫ মার্চ ২০১৪ বিশ্বব্যাপী নানা কর্মসূচির মাধ্যমে বিশ্ব গ্লাকোমা সপ্তাহ এবং ১৫ মার্চ বিশ্ব গ্লাকোমা দিবস পালন করা হচ্ছে। বাংলাদেশ গ্লাকোমা সোসাইটির উদ্যোগে শেরে বাংলা নগর জাতীয় চক্ষু বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটে বিনামূল্যে গ্লাকোমা স্ক্রিনিং ক্যাম্প, লিফলেট, পোস্টার, ব্যানার বিতরণ, বর্ণাঢ্য র্যালি আলোচনা সভাসহ বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে এই সপ্তাহ জুড়ে পালন করছে বিশ্ব গ্লাকোমা সপ্তাহ ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী বর্তমানে সারা বিশ্বের প্রায় ৭০ লক্ষ লোক গ্লাকোমা রোগে ভুগছেন এবং আগামী ২০২০ সালের মধ্যে এ সংখ্যা প্রায় ৮০ লক্ষে দাঁড়াবে। অতি সমপ্রতি বাংলাদেশে একটি সমীক্ষায় দেখানো হয়েছে শতকরা অন্তত ১০ জন মানুষ এখন সামান্য হলেও এ রোগটির সম্বন্ধে ধারণা রাখেন।
গ্লাকোমার চিকিত্সার জন্য রয়েছে ফোঁটা ওষুধ, লেজার এবং শল্য চিকিত্সা। বাংলাদেশে বর্তমানে সিলেকটিভ লেজার ট্রাবিকুলোপ্লাস্টি বা এসএলটি লেজারের সাহায্যে অত্যন্ত সফলভাবে প্রাথমিক গ্লাকোমার চিকিত্সা করা হচ্ছে। তবে কারো যদি ওষুধ দিয়ে এবং লেজারের চিকিত্সায় চোখের চাপ স্বাভাবিক না থাকে তাহলে গ্লাকোমার শল্য চিকিত্সা করার প্রয়োজন হতে পারে। শল্য চিকিত্সার ঝুঁকি কিছু বেশি হলেও অন্ধত্ব বরণ করার চাইতে অবশ্যই ভালো। এ বিষয়ে একজন চক্ষু ও গ্লাকোমা বিশেষজ্ঞের পরামর্শ মেনে নেয়াই কাম্য।
গ্লাকোমা হলে দুশ্চিন্তা না করে চিকিত্সকের পরামর্শ অনুযায়ী চিকিত্সা করালে গ্লাকোমাকে সাথে নিয়েই প্রায় স্বাভাবিক জীবন যাপন করা সম্ভব। আপনার দৃষ্টি যতটুকু ভালো আছে এটা দিয়ে বাকী জীবন ভালোভাবেই বসবাস করতে পারবেন। তবে তার জন্য দরকার দৈনন্দিন জীবনের কিছু নিয়ম ও শৃঙ্খলা রক্ষা করা।
লেখক :প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশ গ্লাকোমা সোসাইটি
চক্ষু ও গ্লাকোমা বিশেষজ্ঞ
