স্মরণ

নিভৃতচারী খোকা ভাই

আপডেট : ০৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৮
গত ৬ মার্চ ছিল প্রখ্যাত সাংবাদিক, চলচ্চিত্র-সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং একজন প্রবীণ শিক্ষক আহমেদ জামান চৌধুরী খোকা ভাইয়ের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৩ সালের এই দিনে (১৯৪৭-২০১৩) সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে চিকিত্সাধীন অবস্থায় তিনি ইন্তেকাল করেন। ১৯৪৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর বৃহত্তর কুমিল্লায় জন্মগ্রহণ করেন। চলচ্চিত্রে বিভিন্ন ভাষার ব্যবহার, সামাজিক-নৈতিক মূল্যবোধ, কুরআন হাদীসের বিষয়বস্তুর মর্মকথা ব্যবহার করেন। তিনি অসংখ্য কালজয়ী সৃষ্টিকর্ম মানবজীবনের অজানা কথার পাশাপাশি মানবপ্রেমের আকুতি, নতুন নতুন সম্ভাবনার অনুভূতি প্রকাশসহ নান্দনিক আবহ সৃষ্টি করেছেন। খোকা ভাইয়ের ‘মাগো তোর কান্না আমি সইতে পারি না’, ‘এক বুক জ্বালা নিয়ে বন্ধু তুমি কেন একা বয়ে বেড়াও’, ‘যেওনা না সাথি চলেছো একেলা কোথায়’, ‘চুরি করেছো আমার মনটা’, ‘নতুন নামে ডাকব তোমায়’, ‘এই বৃষ্টিভেজা রাতে চলে যেয়ো না’, ‘পিচঢালা এই পথটারে ভালোবেসেছি’, ‘ওরে ও বাঁশিওয়ালা তুমি যে গলার মালা’, ‘লাল দোপাট্টা’, ‘বন্ধু হতে চেয়ে তোমার শত্রু বলে গণ্য হলাম’, ‘কে তুমি এলে গো আমারই এই জীবনে’, ‘তওবা তওবা তওবা কবুল কর তওবা’ ‘বিদায় দাওগো বন্ধু’ এ রকম অসংখ্য সৃষ্টিকর্ম। সময়ের কালস্রোতে তাঁর অজস্র লেখা-গান বিভিন্ন অনুষ্ঠানে শুনেছি, অনেক কাহিনী ও চিত্রনাট্যের ছবি দেখেছি। এমন একজন খোকা ভাইয়ের সাথে বিশ্ববিদ্যালয়ে ফ্যাকাল্টি হিসাবে কাজ করার এবং বিভিন্ন সময় অতিবাহিত করবার সুযোগে আমাদের বুক আনন্দে ভরে উঠতো। তিনি যে অনেক চমত্কার গান লিখে শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তাঁর সাথে আমি একাধিকবার প্রেসক্লাব, বিএফডিসি, শিল্পকলা একাডেমি এবং তাঁর বাসায় গিয়েছি; সেসব স্মৃতি আজও আমাকে তাড়িত করে। আহমেদ জামান চৌধুরী একজন সাহসী শিক্ষক ছিলেন। কারো কাছে তিনি প্রিয় সহকর্মী, শিক্ষার্থীদের কাছে প্রিয় স্যার, সংবাদপত্রের পাতায় আজাচৌ, আবার কারো কারো কাছে প্রিয় খোকা ভাই বা খোকা দা নামে সমধিক পরিচিত। বৈচিত্র্যময় পরিচয়ের অধিকারী খোকা ভাই ২০১১ সালে গ্রীন ইউনিভার্সিটিতে এফ.টি.ডি.এম বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষক হিসাবে যোগ দেন, তখন আমি সমাজবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার হিসাবে দায়িত্ব পালন করছিলাম। গ্রীন ইউনিভার্সিটির তত্কালীন উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর অফিসেই প্রথম এ গুণী ব্যক্তি আহমেদ জামান চৌধুরীর সাথে আমার পরিচয় হয়। সেখানে অন্যদের মধ্যে ছিলেন তত্কালীন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান ডা. ফজলুল হক, ট্রেজারার শাহীন মাহবুবা হক এবং আমার বিভাগের চেয়ারম্যান ড. ফজলে হাসান চৌধুরী। উপাচার্যের আহ্বানে তিনি গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ এ ফিল্ম, টেলিভিশন এন্ড ডিজিটাল মিডিয়া বিভাগের খণ্ডকালীন শিক্ষকতায় যোগদান করেন। এর কয়েক মাস পর গ্রীন ইউনিভার্সিটির মালিকানা পরিবর্তন হয়। নতুন মালিক (বর্তমান মালিক) এফ.টি.ডি.এম বিভাগটি বন্ধ করে দেয়ার উদ্যোগ নেয়। কিন্তু তদানীন্তন উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী মালিক পক্ষের এহেন সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করেন। খোকা ভাইয়ের হস্তক্ষেপে বিভাগটি টিকে থাকে। ২০১২ সালের মে মাসে উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরীর পূর্ণ মেয়াদ শেষ হবার কিছুদিন আগে উপাচার্যের অনুমোদন ছাড়াই মালিক পক্ষ (বর্তমান মালিক) খোকা ভাইকে চাকরি থেকে অব্যাহতি প্রদান করেন। এতে অধ্যাপক আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী অত্যন্ত ক্ষুব্ধ ও ব্যথিত হন। বস্তুতপক্ষে প্রফেসর চৌধুরী এবং আহমেদ জামান চৌধুরীর সম্পর্ক প্রায় ৫০ বছর পুরনো। শিক্ষকতার, সাংবাদিকতার, চলচ্চিত্র জগতের পূর্ণতার জন্য তিনি আরও অনেকদিন বেঁচে থাকলে জাতি উপকৃত হত নি:সন্দেহে। তিনি কখনো কাজের স্বীকৃতি চাননি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজ বিজ্ঞান বিভাগে প্রথম শ্রেণিতে উন্নীত হয়ে একই বিভাগে অধ্যাপনা শুরু করেন, কিন্তু চিত্র সাংবাদিকতার টানে সেটাও ছেড়ে চলচ্চিত্রে মনোনিবেশ করেন। তিনি ছিলেন নি:স্বার্থ ও কর্মপাগল। তিনি নিজস্ব সংস্কৃতি ও তারুণ্যের অপার শক্তিতে বিশ্বাসী ছিলেন। তরুণ শিক্ষক, তরুণ নির্মাতা, তরুণ কলা-কুশলী ও শিল্পীদের বিপুল উত্সাহ দিতেন। তরুণ পরিচালক নঈম ইমতিয়াজ নেয়ামুল, সৈয়দ জামিম, ড. এ এইচ খানসহ অনেককে উত্সাহ-অনুপ্রেরণা দিতেন। মিডিয়ার কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সরাসরি স্মৃতিচারণ বা মূল্যায়নের জন্য তাঁকে ডাকা হতো। তখন তিনি মাঝে মাঝে ফোন দিয়ে বলতেন, পারভেজ আরটিভি দেখ, এনটিভি দেখ। তিনি কোন বিষয়কে জরুরি মনে করলে, যখন যেভাবে প্রয়োজন সেভাবে অধ্যাবসায়-চেষ্টা দিয়ে কখনো সামনে থেকে কখনো পিছন থেকে তা প্রতিষ্ঠিত করায় নিয়োজিত থাকতেন। আজকের চলচ্চিত্রের ববিতা, নায়ক রাজ্জাকের নায়করাজ উপাধি, গ্রীন ইউনিভার্সিটির এফ.টি.ডি.এম বিভাগসহ অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে। সবসময় তিনি আশাবাদী মানুষ ছিলেন। লেখক : বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়র শিক্ষক E-mail: [email protected]