সোনার তরী
১। “কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা”— এ পঙিক্ততে ‘নাহি ভরসা’ কথার সাপেক্ষে কবির মনের অবস্থা ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : “কূলে একা বসে আছি, নাহি ভরসা”— এ পঙিক্ততে “নাহি ভরসা” কথার সাপেক্ষে কবির মনের অবস্থা বিবেচনা করলে কবিকে দারুণ শঙ্কিত দেখা যায়।
প্রকৃতির বৈরিতা ও নদীর তাণ্ডবে পরিবেশ ক্রমেই ভয়াল রূপ ধারণ করছে। এ অবস্থায় কবি তথা কৃষক নদীর কূলে একা বসে আছেন তাঁর সোনার ধান তথা সমস্ত সঞ্চয় নিয়ে। নদীর করাল গ্রাস কবি তথা কৃষকের সমস্ত সঞ্চয় যে কোনো সময় কেড়ে নিতে পারে এই আশঙ্কায় হাল ছেড়ে দিয়েছেন। অর্থাত্ এ প্রতিকূলতা থেকে উদ্ধার পাওয়ার কোনো আশাই অবশিষ্ট নেই।
২। “ভরা নদী ক্ষুরধারা”— পঙিক্তটি দ্বারা নদীর কোন রূপকে বোঝানো হয়েছে— ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ‘ভরা নদী ক্ষুরধারা’ এ পঙিক্তর দ্বারা নদীর উত্তাল অবস্থাকে বোঝানো হয়েছে, যেখানে ঢেউয়ের সমাগম ও প্রচণ্ড গর্জন রয়েছে।
নদী সাধারণত শীতকালে স্থির থাকে, অন্য সময়ে নদীর রূপ বিশেষ আগ্রাসী না হলেও বর্ষাকালে নদী হয়ে ওঠে রাক্ষসীর মতো। কারণ নদীর বুক ভর্তি থাকে পানি এবং ঢেউয়ের গতিও হয় বিভিন্নমুখী। বস্তুত বর্ষার ভরা নদী যেন ধ্বংসযজ্ঞের জন্য উন্মুখ হয়ে থাকে। ‘ভরা নদী ক্ষুরধারা’ দ্বারা নদীর এ আগ্রাসী রূপকেই বোঝানো হয়েছে।
৩। “কাটিতে কাটিতে ধান এলো বরষা” পঙক্তিটির ভাবগত তাত্পর্য বুঝিয়ে লেখ।
বরষা”— পঙিক্তটি দ্বারা আপাতদৃষ্টিতে বর্ষার আগমনকে বোঝালেও তাত্পর্যগত দিক থেকে মৃত্যুকে নির্দেশ করা হয়ে।
মানুষের জীবন নিয়ত প্রবহমান এবং এ প্রবাহ একটি নির্দিষ্ট দূরত্বে গিয়ে থেমে যায়। ধান কাটতে কাটতে যেমন বর্ষা আসে, তেমনি জীবন প্রবাহ হতে হতে এক সময় মৃত্যু আসে। বর্ষার আগমন যেমন পরিবেশে স্পষ্ট হয়ে ওঠে, মৃত্যুর আগমনও তেমনি ইন্দ্রিয় শক্তি দ্বারা ব্যক্তিমানসে প্রকট হয়ে ওঠে। আলোচ্য পঙিক্তটি দ্বারা বস্তুত এটাই বোঝানো হয়েছে।
৪। “এপারেতে ছোটো ক্ষেত, আমি একেলা”— পঙিক্ততে কৃষকরূপী কবির অসহায় অবস্থার ব্যাখ্যা দাও।
ক্ষেত, আমি একেলা”— এ পঙিক্ততে কৃষকরূপী কবিকে দারুণ অসহায়রূপে পাওয়া যায়, যার জন্য সময় ও পরিবেশ দায়ী।
ঢেউয়ের উত্তাল ছিল না, তখন নদীর তীরে পরম নিশ্চিন্তে ছিলেন কৃষকরূপী কবি। কিন্তু যখন আকাশে কালো মেঘের আনাগোনা বাড়ল এবং নদীতে ঢেউ রাক্ষসের মতো গর্জন করল, তখন কবি নিজের অবস্থান সম্পর্কে অবগত হলেন এবং দারুণ অসহায় হিসেবে নিজেকে দেখতে পেলেন, যা আলোচ্য পঙিক্ততে প্রকাশ পেয়েছে।
৫। ‘সোনার তরী’ কবিতায় “ঢেউগুলি নিরুপায়” দ্বারা মূলত কোন দিককে ইঙ্গিত করা হয়েছে, তা বুঝিয়ে দাও।
উত্তর :‘সোনার তরী’ কবিতায় “ঢেউগুলি নিরুপায়” দ্বারা সময়ের নিরন্তর প্রবাহকে ইঙ্গিত করা হয়েছে।
সময় কারো জন্য থেমে থাকে না, অথবা সময়ের
থামার কোনো ক্ষমতা নেই। একটি নির্দিষ্ট ছন্দের তথা নিয়মের মাধ্যমে সময় নিয়ত প্রবহমান, তেমনিভাবে নদীর ঢেউও নিয়ত প্রবহমান। ঢেউ ইচ্ছা করলেই নিজে থামতে পারবে না, অথবা কেউ ইচ্ছা করলেই ঢেউকে থামাতে পারবে না। অর্থাত্ ‘সোনার তরী’ কবিতার ‘ঢেউগুলি নিরুপায়’ দ্বারা সময়ের প্রবাহকেই নির্দেশ করা হয়েছে।
৬। “বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে”— এ পঙিক্ততে যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, সময়সাপেক্ষে তা কতটুকু যুক্তিযুক্ত— ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : “বারেক ভিড়াও তরী কূলেতে এসে” পঙিক্ততে যে আকুলতা প্রকাশ পেয়েছে, সময়সাপেক্ষে তা সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।
ফলিয়েছেন। পরিপক্ব ফসল কেটে যখন কৃষক সাজিয়েছেন, ঠিক তখনি পরিবেশ বৈরী হয়ে উঠল, নদীর রূপ হলো আগ্রাসী। ফলে কৃষকের জীবন ও ফসল দুটোই বিপন্ন হওয়ার পথে দ্লায়মান। কৃষক দূরে একটি নৌকা দেখতে পেল তখন মিনতি ভরে ডাকল কূলে আসার জন্য, যা সময়সাপেক্ষে সম্পূর্ণ যুক্তিযুক্ত।
৭। “আমার সোনার ধান” বলতে কবি মূলত কী বোঝাতে চেয়েছেন— ব্যাখ্যা কর।
উত্তর : ‘আমার সোনার ধান’ বলতে কবি মূলত সমগ্র জীবনের অর্জনকে বোঝাতে চেয়েছেন।
মানসে তাড়িত হয়ে রচনা করেছেন অজস্র সাহিত্য। জীবনের অপরাহ্নে এসে দেখলেন, কবির সঞ্চয়ে বিশাল সাহিত্য সম্ভার। বস্তুত কৃষক যেমন মাথার ঘাম পায়ে ফেলে ফসল ফলিয়ে আনন্দ পান, কবিও তেমনি সমগ্র জীবন সাহিত্য সৃষ্টি করে আনন্দ পেয়েছেন। এ কারণেই নিজের সৃষ্টিকে কবি সোনার ধানের সঙ্গে তুলনা করেছেন।
