ইউক্রেনে চলমান সঙ্কটের অন্তরালে

আপডেট : ০৯ মার্চ ২০১৪, ২১:০০
ইউক্রেন লইয়া তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ বাধিয়া যাইবার শঙ্কা করিতেছেন কিছু বিশ্লেষক। আমরা অতখানি আশঙ্কার দিকে যাইব না। বিশ্বযুদ্ধ বাধাইয়া এমনকি জয়লাভ করিয়াও কতখানি অর্জন হইবে অথবা হইবে না তাহা বুঝিবার মত বোধ দুই পরাশক্তির আছে বলিয়া আমরা মনে করি। তবে এই বোধ যে তাহাদিগকে ভূরাজনৈতিক ক্ষেত্রে প্রতিপক্ষকে টেক্কা দেওয়ার পথে ইউক্রেন রাষ্ট্রকে মল্লভূমি বানাইয়া ফেলা হইতে বিরত রাখিবে ততখানি আশা আমরা করি না। রাশিয়া-আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদতের জেরে রাজনৈতিক মতানৈক্যের পরিণতিতে ইউক্রেনে গৃহযুদ্ধ লাগিয়া গেলে তাহাতে অবাক হইবার কিছু থাকিবে না। তবে রাশিয়া যেইভাবে ইউক্রেনের স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়াতে ঢুকিয়া পড়িয়াছে এবং স্বাধীন-সার্বভৌম এই রাষ্ট্রটিকে হুমকি-ধামকি দিতেছে তাহা অমার্জনীয়। এইখানেই শেষ নহে— রাশিয়ার বর্তমান তত্পরতা ইউক্রেন প্রসঙ্গে ১৯৯৪ সালে রাশিয়া, আমেরিকা ও ব্রিটেনের মধ্যে স্বাক্ষরিত বুদাপেস্ট মেমোরেন্ডামের স্পষ্ট লঙ্ঘনও বটে। ১৯৯৪ সালে এই ত্রিশক্তি সামরিক বা অর্থনৈতিক স্বার্থে ইউক্রেন ব্যবহার না করা এবং দেশটির অখণ্ডতা ও সার্বভৌমত্বের বিরুদ্ধে কিছু না করিবার অঙ্গীকার করিয়াছিল। গত তিন মাসের ঘটনাপ্রবাহ বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ভিক্টর ইয়ানুকোভিচকে হঠাইবার লক্ষ্যে গড়িয়া উঠা আন্দোলন ও পার্লামেন্ট কর্তৃক তাহাকে পদচ্যুত করাইবার ক্ষেত্রে পশ্চিমা শক্তিগুলি বড় ধরনের সমর্থন দিয়াছে। উল্লেখ্য, ইউরোপিয়ান ইউনিয়নে (ইইউ) অন্তর্ভুক্তি সংক্রান্ত গত নভেম্বরের একটি প্রস্তাবনা হইতে সরিয়া আসিয়া রাশিয়ামুখী কিছু পদক্ষেপ লইবার পর হইতেই ইয়ানুকোভিচকে হঠাইবার তোড়জোড় শুরু হইয়া যায় যাহা গত মাসের শেষ দিকে আসিয়া সাফল্য লাভ করে। ইউক্রেনকে নিজ বলয়ে রাখিবার মধ্যে রাশিয়ার অর্থনৈতিক ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ একেবারেই স্পষ্ট। কিন্তু লক্ষণীয় বিষয় এই যে, ইউক্রেনকে ইইউতে অন্তর্ভুক্তিতে পশ্চিমের এত উত্সাহের প্রকৃত কারণগুলি পশ্চিমা মিডিয়া সযত্নে এড়াইয়া যাইতেছে। উল্লেখ্য, পূর্ব ইউরোপ এবং সাবেক সোভিয়েত দেশগুলিকে ইইউতে অন্তর্ভুক্ত হইবার জন্য নানাবিধ দীর্ঘসূত্রতার মধ্য দিয়া যাইতে হয়। কিন্তু ইউক্রেন লইয়া ব্যতিব্যস্ত হইবার কারণ রহিয়াছে। ইউক্রেনকে সদস্য করিয়া লইলে পশ্চিমা শক্তিগুলির সামরিক জোট ন্যাটোর বিস্তৃতি রাশিয়ার সীমান্ত ছুঁইয়া ফেলিবে। ইহার মাধ্যমে ইউক্রেনের স্থল ও সমুদ্র ব্যবহার করিয়া মস্কোর উপরে স্থায়ী একটি চাপ জারি করা সম্ভব হইবে। মূলত দেশের পশ্চিমাঞ্চলীয় ইইউমুখী মধ্যবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের অংশগ্রহণমূলক সামপ্রতিক আন্দোলন যত সফলই হউক না কেন, পূর্বাঞ্চলের শিল্পোন্নত অঞ্চলগুলিতে ক্ষমতাচ্যুত প্রেসিডেন্ট ও তাহার দলের ব্যাপক জনপ্রিয়তা রহিয়াছে। ইয়ানুকোভিচকে ক্ষমতা হইতে বিদায় করিয়া দেওয়ার পর হইতে, ২০১২ সালে পাস হওয়া একটি আইন বাতিল করিবার জন্য উঠিয়া পড়িয়া লাগিয়াছে উগ্র ইউক্রেনিয় জাতীয়তাবাদীরা। এই আইনবলে রুশ ভাষা ইউক্রেনের একটি সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃত। ইউক্রেনের প্রায় ৩০ শতাংশ লোক রুশ ভাষাভাষী। ইহার মধ্যে রাশিয়া সংলগ্ন বিশেষ স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল ক্রিমিয়াতে রুশভাষী সংখ্যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৫৯ ভাগ। ইউক্রেনে যে ভয়াবহ পরিস্থিতি চলিতেছে তাহার ভূ-রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক-অর্থনীতি না বুঝিলে কেবলমাত্র উপরিতলের ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়া বিভ্রান্ত হইবার সমূহ আশঙ্কা থাকিবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন