নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা চলছে। এ এক সর্বনাশা দুঃসংবাদ। বিদ্যুত্ এমন একটি পণ্য যার দাম বাড়লে পারিবারিক ইলেকট্রিক বিলই শুধু স্ফীত হয় না, বেড়ে যায় বাজারের সব জিনিসপত্রের দাম। ফলে মূল্যস্ফীতির পরিমাণ আরো বৃদ্ধি পেয়ে আম-জনতার জীবন-যন্ত্রণা তীব্রতর হয়ে ওঠে। এসব কথা জানা সত্ত্বেও নতুন সরকারের দুই মাস যেতে না যেতেই বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে। নবাগত সরকারের তরফ থেকে গরিব-মধ্যবিত্ত জনগণের জন্য ইলেকট্রিক শক প্রদানের মতো ‘উপহারের’ ব্যবস্থা করা হচ্ছে।
কোনো নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর প্রথম ১০০ দিনকে বলা হয় তার মধুচন্দ্রিমার সময় (honeymoon period)। সেই ১০০ দিন সরকারকে কোনোভাবে বিরক্ত না করাটা একটি প্রচলিত রেওয়াজ। বাংলাদেশের জনগণ বর্তমান সরকারকে তার মধুচন্দ্রিমার ‘আয়েস’ ভোগ করার সুযোগ দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, তার মধুচন্দ্রিমার এরূপ আয়েসী সময়ে সরকার সাধারণ মানুষের ওপর এভাবে ‘জুলুম’ করার বদমতলবে তত্পর হয়ে উঠলো কেন?
সরকার কথা দিয়ে কথা রাখছে না। বলা হয়েছিল যে ২০১৩ সালের পরে বিদ্যুতের দাম আর বাড়বে না। অল্প কিছুদিনের জন্য তরল জ্বালানি নির্ভর ভাড়াভিত্তিক (rental), দ্রুত-ভাড়াভিত্তিক (quick-rental) ইত্যাদি ধরনের অস্থায়ী ও আপদকালীন বিদ্যুত্-উত্পাদন ব্যবস্থা অবলম্বন করায় সাময়িকভাবে এই মূল্যবৃদ্ধি ঘটবে। ২০১৪ সালের আগেই দেশ গ্যাস ও কয়লা নির্ভর বিদ্যুত্-উত্পাদন ব্যবস্থা পরিচালনার মতো সক্ষমতা অর্জন করবে। তখন থেকে বিদ্যুতের দাম বাড়ার বদলে পর্যায়ক্রমে কমতে থাকবে। ‘মানুষকে তখন আর বিদ্যুতের জন্য ছুটে বেড়াতে হবে না, বরঞ্চ বিদ্যুত্ই তখন মানুষের পেছনে ছুটে বেড়াবে।’ ২০১৪ সাল থেকে এ ধরনের ‘সোনালী পরিস্থিতি’ সৃষ্টি হবে বলে সরকার দেশবাসীকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। সেই স্বপ্ন দেখিয়ে সরকার ২০১০ সাল থেকে ৫ দফায় বিদ্যুতের ইউনিটপ্রতি (এক কিলোওয়াট ঘণ্টা) দাম মোট ৪৩.৭৫% শতাংশ বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত জনগণকে ‘হজম’ করাতে সক্ষম হয়েছিল।
কিন্তু সরকার তার সে কথা এখন আর রাখছে না। ২০১৪ সাল চলে এসেছে। তার পরেও সরকার তার দেয়া প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে পুনরায় বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পাঁয়তারা করছে। কয়েকদিন আগে প্রধানমন্ত্রী সংসদে বলেছেন, ‘বিদ্যুতের উত্পাদন খরচ বাড়লে তো বিদ্যুতের বেশি দাম দিতেই হবে।’ তিনি গ্রাহকদেরকে বিদ্যুত্ ব্যবহারে সাশ্রয়ী হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন এবং বলেছেন, চিত্কার করে লাভ নেই। কোথায় গেল ‘... ২০১৪ সালে বিদ্যুত্ই মানুষের পেছনে ছুটে বেড়াবে’ এবং ‘... ২০১৪ সাল থেকে বিদ্যুতের দাম কমতে থাকবে’ মর্মে জনগণকে দেয়া সরকারের প্রতিশ্রুতি?
বিদ্যুতের মূল্যহার কিরূপ হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি)। এটি একটি স্বাধীন সংস্থা। উন্মুক্ত গণশুনানিতে বিভিন্ন স্বার্থ-সংশ্লিষ্টমহলের মতামত ও যুক্তি-তর্ক বিবেচনায় নিয়েই বিইআরসি বিদ্যুতের দাম নির্ধারণ করবে— এরূপই হলো আইন। এরূপ একটি গণশুনানি গত ৪ মার্চ শুরু হয়ে ৩ দিন ধরে চলেছে। শুনানিকালে তুমুল তর্ক-বিতর্ক হয়েছে। মূল্যবৃদ্ধির পাঁয়তারার বিরুদ্ধে অফিসের বাইরে ৩ দিন ধরেই গণঅবস্থান হয়েছে। এমতাবস্থায়, বিইআরসি’র রায়ের আগে প্রধানমন্ত্রী তার মন্তব্যগুলো না করলেই পারতেন। সরকার প্রধানের কথায় প্রভাবিত হয়ে বিইআরসি বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিলে তা হবে এই সংস্থার নিয়ম-নীতির বরখেলাফ। এদিকে, গণশুনানি শুরুর আগেই জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী ও খোদ বিইআরসি’র সদস্য ‘বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি হচ্ছে’ বলে গণ্যমাধ্যমে ঘোষণা দিয়ে দিয়েছেন। এটিও বিইআরসি’র নিয়ম-নীতির পরিপন্থি এবং এই সংস্থার কর্তৃত্ব, এখতিয়ার ও নিরপেক্ষতা খর্ব করার শামিল।
বিদ্যুতের দাম যেমন বাড়ানো যেতে পারে, তেমনি তা কমানোও যেতে পারে। জনগণ চায় দাম কমানো হোক। সরকার, পিডিবি, বিইআরসি প্রভৃতি সংস্থা আগে একাধিকার বলেছে যে ২০১৩ সালের পরে আর দাম বাড়াতে হবে না। বলেছে, ২০১৪ সাল থেকে দাম কমানো সম্ভব হবে। তাহলে গণশুনানির এজেন্ডারূপে ‘বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব’ কেন আগেভাগেই নির্ধারণ করা হলো? এজেন্ডা তো করা হতে পারতো ‘বিদ্যুতের দাম কমানোর প্রস্তাব। এটিকে কেন এজেন্ডা করা হলো না?
বিদ্যুতের উত্পাদন খরচ বেড়েছে, তাই বিদ্যুতের দামও বাড়াতে হবে— এই কথা বলে পার পাওয়া যাবে না। প্রশ্ন হলো, উত্পাদন খরচ বাড়লো কেন? এই খরচ বাড়াটা কি অবধারিত ও অপরিহার্য ছিল? তাছাড়া, যেসব কারণে খরচ বেড়েছে তার জন্য কি জনগণ দায়ী? সেক্ষেত্রে কেন সেরূপ ব্যয় বৃদ্ধির দায় জনগণকে বহন করতে হবে? এ বিষয়ে মাত্র কয়েকটি প্রাসঙ্গিক যুক্তি হাজির করাটা এক্ষেত্রে যথার্থ হবে।
এক) একথা সর্বজনজ্ঞাত যে, বিভিন্ন ধরনের রেন্টাল ও কুইক-রেন্টাল বিদ্যুত্ প্লান্টের অনেকগুলোই বিদ্যুত্ উত্পাদন না করেও, অথবা সক্ষমতার চেয়ে কম উত্পাদন করেও, পূর্ণ পরিমাণ উত্পাদনের হিসেব অনুসারে বিভিন্ন সুবিধাদি ও বিল আদায় করে থাকে। অনেক প্লান্ট অতিরিক্ত তেল ব্যবহারের হিসেব দেখিয়ে সরকারের কাছ থেকে হাজার হাজার কোটি টাকার ‘তেল-সাবসিডির সুবিধা’ নেয়, অথচ বিদ্যুত্ উত্পাদনের কাজে সে তেল ব্যবহূত হয় না। এসব বাড়তি খরচের বোঝা জনগণ বহন করবে কেন?
দুই) বিইআরসি ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে সর্বশেষ ৩ হাজার ৮ শত কোটি টাকা ভর্তুকিসহ বাল্ক বিদ্যুতের পাইকারি মূল্যহার ৪ টাকা ৭০ পয়সা নির্ধারণ করেছিল। সে সময় বলা হয়েছিল যে ২০১২-১৩ অর্থ বছরে দেশে ৪০ বিলিয়ন ইউনিট বিদ্যুত্ উত্পাদন হবে। অর্থাত্ উত্পাদন প্রবৃদ্ধি হবে ২০ শতাংশ। অথচ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে মোট ৩ বিলিয়ন ইউনিট কম উত্পাদন হয়েছে। এক্ষেত্রে তরল জ্বালানি নির্ভর বিদ্যুত্ উত্পাদন যেমন কম হয়েছে, আবার গ্যাস সরবরাহে স্বল্পতার ফলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুত্ উত্পাদনের বিদ্যমান ক্ষমতাও অব্যবহূত থেকে গেছে। অর্থাত্, বিদ্যুত্ উত্পাদনের পরিমাণ কম হওয়া সত্ত্বেও প্লান্টের পূর্ণ-ক্যাপাসিটি অনুসারে খরচ বহন করতে হয়েছে। এই বাড়তি খরচ ভোক্তারা কেন বহন করবে?
তিন) পিডিবি ভাড়াভিত্তিক প্লান্ট থেকে ইউনিটপ্রতি গড়ে ৬ টাকা দামে ৬০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ কিনে থাকে। অথচ গ্যাসের অভাবে পিডিবির নিজস্ব প্লান্টের উত্পাদন ক্ষমতার ৭০০ থেকে ৮০০ মেগাওয়াট বিদ্যুত্ সে উত্পাদন করতে পারছে না। এই অব্যবহূত ক্ষমতার পূর্ণ ব্যবহার নিশ্চিত করতে পারলে পিডিবিকে ভাড়াভিত্তিক প্লান্ট থেকে ৬ টাকা ইউনিট মূল্যে বিদ্যুত্ কিনতে হতো না। ইউনিটপ্রতি মাত্র ৬৫ থেকে ৭০ পয়সা জ্বালানি খরচে সে নিজেই তার চাহিদার সমপরিমাণ বিদ্যুত্ উত্পাদন করতে পারতো। এতে ইউনিটপ্রতি কমপক্ষে ৫ টাকা ৩০ পয়সা সাশ্রয় হতো। পিডিপির প্লান্টগুলোতে পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করলেই ভাড়াভিত্তিক বা দ্রুত ভাড়াভিত্তিক প্লান্ট-এর বিদ্যুতের জন্য বাড়তি খরচ করতে হতো না। গ্যাস সরবরাহে অবহেলার কারণে পিডিবিকে অতিরিক্ত দামে ব্যক্তিমালিকানাধীন ভাড়াভিত্তিক প্লান্ট থেকে বিদ্যুত্ কেনায় যে বিপুল বাড়তি খরচ করতে হচ্ছে তা জনগণের কাঁধে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা জনগণ কেন মেনে নেবে?
চার) বিদ্যুত্ উত্পাদনের ব্যবহূত তরল জ্বালানির মূল্যহার নির্ধারণের এক্তিয়ার বিইআরসির হাতে থাকবে— এটাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু বাস্তবে সেই মূল্যহার নির্ধারণ করে থাকে মন্ত্রণালয়। তরল জ্বালানির ক্রয় মূল্য, জাহাজ ভাড়া ইত্যাদি ক্ষেত্রে অস্বচ্ছতা ও দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এসব কারণে বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচের হিসেব ফুলে-ফেঁপে উঠেছে। এ ধরনের ফাঁপানো হিসাবের দায় ভোক্তারা কেন কাঁধে নেবে?
পাঁচ) দেশে ‘গ্যাসের উত্পাদন প্রবৃদ্ধির হারের’ তুলনায় সরকারি মালিকানাধীন বিদ্যুত্ উত্পাদন প্লান্টে ‘গ্যাস সরবরাহের প্রবৃদ্ধি হার’ খুবই কম। বিদ্যুত্ উত্পাদনের জন্য ব্যক্তিমালিকানাধীন ক্ষুদ্র আইপিপি ক্যাপটিভ বিদ্যুতের ক্ষেত্রে গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে, কিন্তু পিডিবি’র জন্য গ্যাস সরবরাহ বাড়ানো হচ্ছে না। এ বিষয়ে আপত্তি তোলা হলেও বিইআরসি তা গ্রাহ্য করছে না। ফলে গ্যাসের অভাবে সরকারি খাতে বিদ্যুত্ উত্পাদন বৃদ্ধি সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুতের জন্য ব্যক্তিখাতের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। এই সুযোগে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক প্লান্টের নামে দেশি-বিদেশি কোম্পানিগুলো বেপরোয়া লুটপাট চালানোর সুযোগ করে নিচ্ছে। সরকারের এরূপ গণবিরোধী নীতির আর্থিক বোঝা জনগণের কাঁধে চাপালে তা তারা মানবে কেন?
এ বিষয়ে এ ধরনের আরো অনেক তথ্য ও যুক্তি তুলে ধরা যায়। তবে, সমস্যার গোড়ার কথা আসলে হলো ‘লুটপাট’। বিদ্যুত্ ও জ্বালানি খাত নিয়ে দেশে যে লুটপাট চলছে তা কল্পনাতীত। লুটেরার একটি শক্তিশালী চক্র। সরকারে, রাজনৈতিক দলে, আমলাতন্ত্রে, ব্যবসায়ী মহলে, ‘সুশীল সমাজে’— সবখানে রয়েছে তাদের শক্ত প্রভাব।
শেখ হাসিনা সরকারের গত মেয়াদে, ২০১০ সালের মার্চে নতুন করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো শুরুর আগে বিদ্যুতের উত্পাদন খরচ ও বিক্রয় মূল্য তো কমই ছিল। তারপরে তা হঠাত্ বেড়ে গেল। এর কারণ কি? হঠাত্ দাম এভাবে বেড়ে যাওয়ার কারণ হলো, কম খরচে বিদ্যুত্ উত্পাদনকারী সরকারি প্রতিষ্ঠান ও প্লান্টগুলোকে এর আগে পরিকল্পিতভাবে দিনের পর দিন অবহেলা করা হয়েছে। মেশিনপত্রের আধুনিকায়ন তো দূরের কথা, সে সবের মেরামতের পয়সাও ঠিকমতো দেয়া হয়নি। পর্যাপ্ত গ্যাস সরবরাহ করা হয়নি। সামান্য কিছু টাকা খরচ করলেই সরকারি বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো পূর্ণ শক্তিতে সচল রাখা যেত। নতুন অনেক বিদ্যুত্ উত্পাদন প্লান্টও চালু করা যেত। কিন্তু সেসব পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। কয়েক দশক ধরে ক্ষমতায় থাকা সরকারগুলো এসব জরুরি কাজ অবহেলা করেছে। তার বদলে লোডশেডিং ও কিছুটা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করা হয়েছে। এর সুযোগে ঢুকে পড়েছে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক প্লান্টের স্বার্থেন্বেষী শক্তি।
এরপর, পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে, বিশেষ দায়মুক্তির আইন পাস করে, বিনা টেন্ডারে ব্যক্তিমালিকানায় ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক বিদ্যুত্ কেন্দ্র স্থাপন করতে দেয়া হয়েছে। তাদেরকে সরকারি জমি দেয়া হয়েছে। সরকারি পয়সায় ভর্তুকি দিয়ে অল্প দামে চড়া মূল্যের তরল জ্বালানি সরবরাহ করা হয়েছে। ফলে বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচ বিপুলভাবে বেড়ে গেছে। ২০০৯ সালে যেখানে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুত্ উত্পাদন হতো ২ টাকা ৫০ পয়সায়, ২০১৪ সালে তা এসে দাঁড়িয়েছে ৬ টাকা ২২ পয়সায়। বেশি দামে এই বিদ্যুত্ কিনে নিতে হচ্ছে সরকারকে। ভর্তুকির এই বাড়তি খরচ সরকারকে বহন করতে হচ্ছে। বিদ্যুতের খুচরা মূল্য লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ানোর মাধ্যমে সে এখন তা আদায় করে নিচ্ছে পাবলিকের পকেট থেকে। ২০০৯ সালে ভোক্তাকে যেখানে দাম দিতে হতো ইউনিটপ্রতি গড়ে ৩ টাকা ৮৩ পয়সা, ২০১৪-এর ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ টাকা ৭৫ পয়সায়। সেই দাম এখন আবার আরো এক দফা বাড়ানোর তোড়জোড় চলছে। এসব হলো এদেশের বিদ্যুত্ ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক সর্বনাশা ষড়যন্ত্র। সবকিছুই হলো অবাধ লুটপাটের একটি পরিকল্পিত আয়োজন।
সরকার বলেছিল, শুধুমাত্র অসহনীয় লোডশেডিং-এর সমস্যার সাময়িক মোকাবেলার পথ হিসেবে ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত ভাড়াভিত্তিক প্লান্ট স্থাপন করতে দেয়া হচ্ছে । এটি একজন অসুস্থ রোগীর মূল চিকিত্সা শুরুর আগে তাকে অন্ততঃ বাঁচিয়ে রাখার জন্য ‘কোরামিন’ প্রদানের মতো একটি ব্যবস্থা। ২০০৯ সালের পিডিবির সমন্বিত পরিকল্পনায় বলা হয়েছিল, এসব বিদ্যুত্ কেন্দ্রের পেছনে অত্যধিক যে ব্যয় করতে হবে তা ২০১২-১৩ সালে সর্বোচ্চ পর্যায়ে যাবে। ততোদিনে গ্যাস ও কয়লা চালিত নতুন বিদ্যুত্ কেন্দ্র চালু হয়ে যাবে এবং প্রাইভেট ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত-ভাড়াভিত্তিক প্লান্টের আর প্রয়োজনীয়তা থাকবে না। তারপর থেকে বিদ্যুতের দাম কমতে থাকবে। ২০১৩-১৪ সালে ইউনিটপ্রতি বিদ্যুতের গড় উত্পাদন ব্যয় হবে ৪ টাকা ৩২ পয়সা। ২০১৪-১৫ সালে তা আরো কমে হবে ৩ টাকা ৯৮ পয়সা। ফলে ২০১৩-১৪ সাল থেকে বিদ্যুতের বিক্রয় মূল্যও কমানো শুরু করা সম্ভব হবে। এসব ছিল পিডিবির ২০০৯ সালের হিসেব। অথচ এখন পিডিবি বলছে যে আগামী বছর ইউনিটপ্রতি বিদ্যুত্ উত্পাদন খরচ হবে ৬ টাকা ২৭ পয়সা। ২০০৯ সালের মূল সমন্বিত পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যাস ও কয়লাভিত্তিক নতুন বিদ্যুত্ উত্পাদন কেন্দ্র স্থাপনে ব্যর্থতার জন্যই এরূপ ঘটেছে। ধারণা করা যায় যে, সচেতনভাবেই নিশ্চিত করা হয়েছে যেন তা ব্যর্থ হয়। এমতাবস্থায় সরকার ভাড়াভিত্তিক ও দ্রুত-ভাড়াভিত্তিক প্রকল্পগুলোর সাথে চুক্তি নবায়ন করে চলেছে। অবস্থা হয়েছে, রোগীকে ‘কোরামিনের’ ডোজ দেয়া হচ্ছে তো হচ্ছেই, অথচ আসল চিকিত্সা শুরুর কোনো নাম-গন্ধ নেই। এটি কি সরকারের অদক্ষাজনিত দুর্বলতা অথবা হিসেবের গোলমালের ফলাফল, নাকি তা দ্রুত টু-পাইস কামিয়ে নেয়ার ফন্দির একটি অংশ হিসেবে জনগণের সাথে সচেতন ও পরিকল্পিত প্রতারণার সাজানো নাটক? সবাই বলবে, দ্বিতীয়টিই সত্য।
রেন্টাল ও কুইক-রেন্টাল বিদ্যুত্ কেন্দ্রগুলো এখন হয়ে উঠেছে ‘কুইক-লুটপাটের’ একটি উত্কৃষ্ট উত্স। দেশের ও জনগণের স্বার্থের সর্বনাশ হলেও, উচ্চ পদে অধিষ্ঠিত যে শক্তিশালীমহল এই লুটপাটের ভাগীদার, তারা তাদের এই ‘সোনার ডিম পাড়া হাঁসের’ মতো ব্যবস্থাটি জিইয়ে রাখতে বেপরোয়া? এই শক্তির ষড়যন্ত্র রোধ না করতে পারলে বিদ্যুত্ নিয়ে জনগণের পকেট কেটে মুষ্টিমেয় মানুষের পকেট ভরার ‘কুইক-লুটপাটের কারবার’ নতুন নতুন রূপে আবির্ভূত হতে থাকবে। একটি মৌলিক বিপ্লবী গণজাগরণ ছাড়া এই ‘কারবার’ শেষ হবে না।
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
