রাজনীতিতে ধোঁকাবাজি নয় দরকার কৌশল

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৪, ২১:১৮
দেশের মানুষ আগের তুলনায় অনেক এগিয়ে। ইদানীং জনগণ সহজেই রাজনীতিকে বুঝতে পারে। এর অন্যতম কারণ হলো প্রযুক্তি ও গণমাধ্যমের প্রসার। এখন মিথ্যা এবং বিভ্রান্তিকর বক্তব্যে কিংবা তথ্যে রাজনীতিতে লাভবান হওয়া কঠিন। এককথায় বলা যায়, ধোঁকাবাজির রাজনীতি এখন আর নেই। একথা আমরা সবাই জানি, রাজনীতিতে আস্থা-অনাস্থা এবং বিশ্বাস-অবিশ্বাসের প্রশ্নটি অনেক বেশি। পাশাপাশি সন্দেহ-সংশয় তো আছেই। সাম্প্রতিককালের বিএনপি চেয়ারপার্সনের বক্তব্য শুনলে মনে হয় রাজনীতিতে আস্থা এবং বিশ্বাস বলতে কিছু নেই। বিশেষ করে চলমান গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অস্বীকার এবং সরকারকে অবৈধ আখ্যায়িত করার প্রবণতা অধিকভাবে লক্ষণীয়। বিএনপিকে ভুলে গেলে চলবে না যে, বর্তমান সরকারকে ফাঁকা মাঠে গোল দেয়ার সুযোগ তারাই করে দিয়েছিল। অন্যদিকে সংবিধানের ধারাবাহিকতা রক্ষায় আওয়ামী লীগ তথা সরকার ছিল বদ্ধপরিকর। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার বিএনপিকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের অনুরোধ জানানো সত্ত্বেও অবিশ্বাস আর অনাস্থার দোলাচলে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ায়। এরই ফলশ্রুতিতে সংবিধান রক্ষার নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সরকার গঠন করে। তা সত্ত্বেও বিএনপি চেয়ারপার্সন এই সরকারকে অবৈধ বলে আখ্যায়িত করে যাচ্ছে। যেটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক আচরণ হতে পারে না। গত ৯ মার্চ ঢাকা আইনজীবী সমিতির নবনির্বাচিত কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে বিএনপি চেয়ারপার্সন বলেন, এ সরকার প্রমাণ করেছে তাদের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন হতে পারে না। এই সরকারের পাশাপাশি বর্তমান সংসদও অবৈধ বলে মন্তব্য করেন তিনি। বিগত সংসদ নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটিও সঠিক বলে তিনি উল্লেখ করেন। বাংলাদেশে সাধারণত রাজনীতিবিদরা নিজেদের ভুল স্বীকার করতে চান না। ভুল স্বীকার করলে তাদের বড় ধরনের সর্বনাশ হয়ে যাবে এমনটাই মনে করেন তারা। বিএনপি চেয়ারপার্সন বর্তমান সরকারের অধীনে কোনো সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয় বলে ঘোষণা করলেও উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিতরা অংশগ্রহণ করছে এবং সরকার সমর্থিত প্রার্থীর তুলনায় বেশি পরিমাণে বিজয়ী হয়েছেন। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে সেটি সম্ভব হতো কিনা তা নিয়ে সন্দেহের অবকাশ থাকে না। এক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় যে, সংসদ নির্বাচনে সরকার, নির্বাচন কমিশন ও জনগণের প্রতি আস্থা না থাকলেও উপজেলা নির্বাচনে সেই আস্থা রাখতে সক্ষম হয়েছে বিএনপি। কাজেই বিএনপিকে মনে রাখতে হবে, শুধুমাত্র মিথ্যা ও বিভ্রান্তিকর তথ্যে দেশবাসীর মন গলানো যাবে না। এতে যথাযথ এবং ন্যায্য কিছু যুক্তি নিয়েই জনগণের সামনে উপস্থিত হতে হবে। এক্ষেত্রে বিশ্বাস ও আস্থার মাত্রাও বাড়ানো দরকার। বিশ্বাস ও আস্থার রাজনীতি গণতন্ত্রের স্থায়িত্বের জন্য আবশ্যক। বাংলাদেশে গণতন্ত্র প্রত্যাবর্তনের ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, বিএনপি অপেক্ষাকৃত নবীন রাজনৈতিক দল হওয়া সত্ত্বেও রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত থেকেছে দীর্ঘ সময়। বিশেষ করে ’৯০-পরবর্তী বাংলাদেশে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার পালাবদল হয়েছে প্রধানত দুটি দল আওয়ামী লীগ এবং বিএনপির মধ্যেই। এ প্রেক্ষাপট থেকেই বিএনপি বিগত দশম সংসদ নির্বাচনের প্রাক্কালে নিশ্চিতভাবেই ধরে নিয়েছিল যে, তারা সরকার গঠন করবে। কে কোন পদ পেতে যাচ্ছেন কিংবা কে কোন পদ নিতে চান এমন হিসাব-নিকাশও বিএনপি-দলীয় কতিপয় নেতৃবৃন্দ ও সমর্থকরা শুরু করেছিলেন। এর অন্যতম কারণ ছিল, নির্বাচনের কয়েক মাস পূর্বেই পাঁচ সিটি কর্পোরেশনে বিএনপির একচেটিয়া বিজয়। তারা ধরেই নিয়েছিল দেশের আপামর জনসাধারণ তাদের ‘নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের’ দাবিতে একমত হয়ে রাস্তায় নেমে আসবে এবং দাবি মেনে নিতে বাধ্য হবে সরকার। এছাড়াও বিগত সংসদ নির্বাচনের পূর্বে বিএনপির অনেকের ধারণা ছিল বিদেশিরাই তাদের ক্ষমতায় বসিয়ে দেবে। এছাড়া বিএনপিরও অতিমাত্রায় আস্থা ছিল জামায়াত এবং হেফাজতের ওপর। শুধু আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারেনি সরকার, নির্বাচনী প্রক্রিয়া, নির্বাচন কমিশন এবং দেশের মানুষের প্রতি। এমন অনাস্থার ভ্রমে চূড়ান্তভাবে নির্বাচন বর্জনের সিদ্ধান্তটি বেছে নেয়। সিভিল সমাজের বেশিরভাগ সদস্য এবং বিএনপির তৃণমূল পর্যায়ের অনেক নেতা এ সিদ্ধান্তকে ভুল বলে আখ্যায়িত করলেও বিএনপি চেয়ারপার্সন তা স্বীকার করতে নারাজ। তবে ওই সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল কিনা তা নিয়ে এখন পর্যন্ত দলে এবং দলের বাইরে বাক-বিতণ্ডা লেগেই আছে। ‘নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের’ দাবির আন্দোলনে বিএনপি নিজেদেরকে বিজয়ী দেখতে চেয়েছিল। কিন্তু শতকরা ৫ জনও স্বতঃস্ফূর্তভাবে দাবি তুলেছিল কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সংসদ নির্বাচনে যাওয়া না যাওয়া প্রশ্নে এবং বিএনপির ভুল করা না করার প্রশ্নে দলে কিছুটা সংকট তৈরি করেছে। বিএনপির তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় অনেক নেতাই মনে করেন, সংসদ নির্বাচনে সরকারের দেয়া ‘সর্বদলীয় সরকারের’ প্রস্তাবে রাজি না হয়ে ‘নির্বাচন বর্জনের’ সিদ্ধান্তটি ভুল ছিল। তবে বিএনপির চেয়ারপার্সনসহ কতিপয় নেতা ‘নির্বাচন বর্জন ও প্রতিহত’ করার সিদ্ধান্তকে সঠিক বলেই এখনও চালিয়ে যাচ্ছেন। আগামী একাদশ সংসদ নির্বাচনের প্রসঙ্গ যখনই আসবে, তখনই বিএনপি নির্দলীয় সরকারের দাবি তুলবে। দেশের বর্তমান পরিস্থিতি এবং সরকারের ভাবমূর্তিতে পরিষ্কার লক্ষণীয় যে, কোনোভাবেই দেশে ‘নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের’ ধারণা সংবিধানে ফিরে আসবে না। বিএনপিকে বর্তমান সাংবিধানিক বাস্তবতাতেই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে হবে। নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করে আন্দোলনের নামে সহিংসতা কোনোভাবেই জনগণের কাছে কাম্য হবে না। বিএনপির উচিত হবে সরকারের কাছে তাদের যথাযথ রূপরেখা দেয়া। অন্যায্য আন্দোলনের প্রস্তুতি নিয়ে মাঠে নামাটা তাদের জন্য খুব বেশি ভালো হবে না। বিএনপি চেয়ারপার্সন উপজেলা নির্বাচনের পরই সরকার পতনের আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। সেজন্য তারা দল গোছানোর কাজে মাঠে নেমেছেন। সাংবিধানিক কাঠামোতে একটি নির্বাচিত সরকার পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে এটি খুবই স্বাভাবিক। কিন্তু বিগত সংসদ নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহণ না করায় অনেক আসনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ায় একপ্রকার ফাঁকা মাঠেই গোল করে ট্রফি ঘরে তুলেছেন আওয়ামী লীগ। গত আট বছর ধরে বিএনপি ক্ষমতার বাইরে। এখন কঠিন সংকটের মধ্যে বিএনপিকে যেতে হচ্ছে। অপেক্ষার পালা শেষ হচ্ছে না। এই অপেক্ষার মেয়াদ কতদিন হবে তা বলা মুশকিল। কারণ পশ্চিমা বিশ্ব বিএনপি-জামায়াত নীতিকে খুব বেশি ভালোভাবে নিচ্ছে না। ইতিমধ্যেই শিবিরকে শীর্ষ সন্ত্রাসী সংগঠনের তালিকার প্রথম সারিতে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। অতএব বিএনপি-জামায়াতের অবস্থান আন্তর্জাতিকভাবে খুব বেশি ইতিবাচক নেই বললেই চলে। তবে বর্তমানে দেশের অবস্থা ও বিএনপির মনোভাব দেখে মনে হচ্ছে, সরকার ইচ্ছা করলেই বাধাহীন যাত্রায় পূর্ণ মেয়াদ শেষ করতে পারবে কিনা তা নিয়ে সংশয় আছে। অবশ্য সরকারকে জোর করে নির্বাচন দিতে বাধ্য করতে পারবে না বিএনপি। তবে এক্ষেত্রে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখার বিষয়টি সরকারের নিকট গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ। সরকারের মেয়াদ কতদিন এমন প্রশ্ন বেশিমাত্রায় উপলব্ধি হয় তখনই যখন আওয়ামী লীগের হাই-প্রোফাইল নেতারা ঘোষণা করেন, ‘তারা পাঁচ বছরই ক্ষমতায় থাকবে।’ এমন বক্তব্য বারবার উপস্থাপনেই জনমনে প্রশ্ন জেগে ওঠে। কাজেই আওয়ামী লীগের নেতাদের প্রতি আমার অনুরোধ বারবার সরকারের মেয়াদ নিয়ে কথা বললে সেটি দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ হিসেবেই বিবেচিত হয়। অতএব এ বিষয়ে তাদের সচেতন হতে হবে। তাছাড়া আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ও সাংগঠনিক ভিত্তিকেও ঢেলে সাজানো দরকার। তা না হলে রাজনৈতিকভাবে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ১৯ দলীয় জোট কৌশলগত বিজয়ী হয়ে যাবে। কারণ ইতিমধ্যেই বিএনপি হরতাল-অবরোধের নামে সহিংস রাজনীতি থেকে বের হয়ে এসে গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক কর্মসূচি অব্যাহত রেখেছে। বর্তমানে যদি বিএনপিকে শুধু পরাজিত শক্তি মনে করা হয় তাহলে আওয়ামী লীগ তথা সরকারের জন্য সেটি হবে ভুল চিন্তা। উপজেলা নির্বাচন শেষে রাজনৈতিক চূড়ান্ত হিসাব-নিকাশ করতে যাচ্ছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগ। উভয় দলই তৃণমূল থেকে কেন্দ্রীয় পর্যায় পর্যন্ত কমিটি পুনর্গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে (৯ মার্চ, বাংলাদেশ প্রতিদিন)। উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল প্রমাণ করেছে, তৃণমূল পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সাংগঠনিক ভিত্তি অনেকটাই দুর্বল। দলের মধ্যে বিভেদ-গ্রুপিং-কলহ চরমে। তবে জামায়াতেরও জনপ্রিয়তাও রয়েছে যথেষ্ট। পাশাপাশি তাদের শক্তি তো রয়েছেই। রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বলা যায়, জামায়াত অতীতের তুলনায় অন্তত তৃণমূলে জনপ্রিয়তা একেবারেই কমে যায়নি। বরং উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেখে মনে হয়, তাদের জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। যদিও জামায়াতের নেতাদের নির্বাচনে জয়ী হয়ে আসার বিষয়ে অর্থনৈতিক লেনদেনের খবর পাওয়া গেছে অধিক মাত্রায়। তৃণমূল পর্যায়ের জনগণকে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা ও আর্থিক প্রলোভনের কৌশল নিয়ে জামায়াত-সমর্থিত প্রার্থীদের বিজয়ী হওয়ার সংবাদ আমরা গণমাধ্যম থেকে জেনেছি। তবুও তাদের জনপ্রিয়তার বিষয়টি ঈর্ষণীয়। সাধারণত স্থানীয় পর্যায়ে জাতীয় ইস্যু কোনো প্রভাব ফেলার কথা নয়। কিন্তু এবারের উপজেলা নির্বাচনে জাতীয় ইস্যুই প্রচার-প্রচারণায় প্রাধান্য লাভ করেছে। এ ধারা ভবিষ্যতেও বজায় থাকবে কিনা তা নিয়ে কোনো স্পষ্ট ধারণা এ সময় দেয়া সম্ভব নয়। অবশ্য স্থানীয় সরকার নির্বাচনের ভবিষ্যত্ কাঠামোগত পরিবর্তন প্রসঙ্গে স্থানীয় সরকার-বিষয়ক মন্ত্রী ইতিমধ্যেই বলেছেন, বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করে ভবিষ্যতে দলীয়ভিত্তিক স্থানীয় পরিষদ নির্বাচন হবে। সাধারণত গণতান্ত্রিক সমাজে ক্ষমতা পরিবর্তনের মূল মাধ্যম নির্বাচন। এছাড়াও গণতান্ত্রিক সরকার পরিবর্তন হতে পারে গণঅভ্যুত্থান এবং সামরিক অভ্যুত্থানে। বাংলাদেশে বর্তমানে এর কোনোটারই সম্ভাবনা নেই। পথ একটাই, তা হলো নির্বাচন। রাজনীতিতে পেশীশক্তি, ভোটশক্তির পাশাপাশি দরকার কৌশলী হওয়া। রাজনীতির লড়াইয়ে সংসদ নির্বাচন-পূর্ব আওয়ামী লীগ কিছুটা কৌশলের আশ্রয় নিয়েছিল। আমার মনে হয়, বিএনপিকে নির্বাচনের বাইরে রাখা ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম কৌশল। ‘তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছাড়া বিএনপি নির্বাচনে অংশ নেবে না’- এমন ফাঁদটি আওয়ামী লীগের ক্ষমতার লড়াইয়ের খেলায় বিজয়ী হতে সহজ করে দেয়। কাজেই রাজনীতিতে বিজয়ী হতে হলে বিএনপিকেও কৌশলী হতে হবে এবং প্রতিপক্ষের কৌশল বুঝতে হবে। তাহলেই রাজনীতির খেলায় চূড়ান্ত বিজয় সহজ হবে। লেখক :সহকারী অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় E-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন