ফরিদপুর সদর উপজেলা পরিষদের নির্বাচন সামনে রাখিয়া আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীর পক্ষে অর্ধশতাধিক অ্যাম্বুলেন্সসহকারে একটি ব্যতিক্রমী নির্বাচনী শোভাযাত্রা বাহির করা হইয়াছে। এতদিবষয়ক একটি খবর রবিবার একটি দৈনিকে ফলাও করিয়া প্রকাশিত হয়। এই খবরটিতে উল্লেখিত অ্যাম্বুলেন্স শোভাযাত্রা নির্বাচনী বিধিমালা বা আচরণবিধির লংঘন এমন কথাও বলা হইয়াছে। কিন্তু আমরা বলিতে চাই যে, আমাদের দেশে এমন ধরনের শোভাযাত্রা কি কোন নূতন ঘটনা? নির্বাচনে তো বটেই, এমনকি বিভিন্ন উপলক্ষে সরকারি গাড়িঘোড়া বা যানবাহন ব্যবহারের নজির এই দেশে অত্যন্ত স্বাভাবিক ঘটনা। যিনি বা যাহারা নির্বাচনী প্রচারণায় অ্যাম্বুলেন্স কিংবা কোন সরকারি যানবাহন ব্যবহার করেন, তিনি কাজটি সঠিক করিলেন না বেঠিক করিলেন উহা নির্ণয়ের পূর্বে কী করিয়া এইসব সরকারি যান সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর প্রচারণার কাজে ব্যবহূত হইবার অনুমতি লাভ করিল—উহা তলাইয়া দেখা আবশ্যক নয় কি? বাংলাদেশে দীর্ঘকাল ধরিয়া সরকারি দফতরের গাড়ি বা যানবাহনের সঠিক কোন প্রকার হিসাব-নিকাশ আছে, এমন দাবি নিশ্চয়ই কেহ করিতে পারিবেন না। বিভিন্ন প্রকল্প ফাঁদিয়া ও প্রকল্পের প্রয়োজন দেখাইয়া বহু দামি দামি গাড়ি আমদানি করা এইখানে যেন রেওয়াজে পরিণত হইয়াছে। আবার সেইসব গাড়ি প্রকল্পের কাজে ব্যবহারের চাইতে প্রকল্প কর্মকর্তা বা কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক কাজেই অধিক ব্যবহূত হইতে দেখা যায়। সরকারি গাড়ি বা প্রকল্পের গাড়ি যেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ব্যক্তিগত গাড়ি। সকল সময়েই এই ধরনের সরকারি দফতরের দামি ও ভাল গাড়িগুলিকে কর্মকর্তাগণ পিকনিকে, আত্মীয়-পরিজনদের বিমানবন্দর হইতে আনা-নেওয়ার কাজে কিংবা এই প্রকার নানান পারিবারিক কাজে ব্যবহার করেন। এই ক্ষেত্রে তাহারা এতটুকু বিবেক বা নীতি নৈতিকতার কথা চিন্তাও করেন না। এই ধরনের চিত্র সেই পাকিস্তান আমলেও দেখা যাইত। সরকারি পরিবহন পুলের গাড়ি প্রকৌশলী ও বিভিন্ন ধরনের কর্মকর্তারা যেইভাবে করায়ত্ত করেন তাহা ধিক্কারযোগ্যই বটে! কিন্তু তদারকির জন্য সারাদেশে সরকারি বেতনভুক অজস্র কর্মচারী থাকিলেও প্রকৃতপক্ষে এইসব দেখিবার যেন কেউই নাই।
নির্বাচনী প্রচারণায় এইসব অ্যাম্বুলেন্স ব্যবহূত হইতে পারিল কি করিয়া এই প্রশ্নের সদুত্তরের উপরই এই জাতীয় অব্যবস্থার কারণ চিহ্নিতকরণ এবং উহার প্রতিকারের উপায় নির্ভর করে। যাহারা এই সকল যানবাহনের দায়িত্বে থাকেন তাহারা কেন, কোন্ উদ্দেশ্যে বা কিসের বিনিময়ে ঐ যানবাহন অপরকে অবৈধভাবে ব্যবহারের সুযোগ করিয়া দেন? এইখানে যে কিছু ‘বিনিময়’ ঘটে উহাতো বলাই বাহুল্য! নচেত্, তদারকের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তি এত আহ্লাদিত হইয়া গাড়িগুলিকে এইভাবে ব্যবহারের সুযোগ সৃষ্টি করিয়া দেয় কেন? এই গাড়িগুলি যখন অন্যেরা ব্যবহার করে, কেবল তখনই উহা আমাদের চোখে পড়ে, এবং ইহা লইয়া আমরা খানিক উষ্মা প্রকাশ করিতে থাকি! সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়ম-নীতি ও বিধি-বিধান মানিয়া চলিতে বাধ্য। কিন্তু তাহারা উহার থোড়াই পরোয়া করেন।
আমরা সরকারি যানবাহনের দায়িত্বে নিয়োজিত ব্যক্তিদের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন করাইয়া দিতে চাই এবং সুস্পষ্ট ভাষায় বলিতে চাই যে, দায়িত্ব পালনে অনীহা কিংবা কর্তব্য পালনে অবহেলা যাহারা করে তাহারা নিশ্চিতরূপেই শাস্তিযোগ্য অপরাধ করিয়া থাকে। সরকারি গাড়ি সরকারি কাজে ব্যবহূত হইবে, সরকারের বা বাহিরের কোন হোমরা-চোমরার মনোরঞ্জনের জন্য জনগণের ট্যাক্সের বা বিদেশি সাহায্যলব্ধ অর্থ-ব্যয়ে এইসব গাড়ি আনা হয় না। ব্যক্তিগত বা পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহার না করিয়া যেই কাজের জন্য এইগুলি আনা হইয়াছে শুধুই সেই কাজে উহা ব্যবহারের মানসিকতা সৃষ্টি করিতে না পারিলে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা এই জাতীয় দায়িত্বহীনতারই পরিচয় দিয়া যাইবে কেবল—যাহা কোনভাবেই অভিপ্রেত নহে নিশ্চয়ই! আর যাহারা এই দায়িত্বে অবহেলা করেন তাহাদেরকেও আইনের আওতায় আনাটাও অত্যন্ত জরুরি।
