মানসম্পন্ন প্রাথমিক শিক্ষা প্রসঙ্গে

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৫
প্রতি বত্সরের ন্যায় এইবারও দেশব্যাপী পালিত হইতেছে জাতীয় প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ। জাতীয় দৈনিকগুলিতে এই সংক্রান্ত বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশিত হইয়াছে। জাতীয় ও আঞ্চলিক ভিত্তিতে ইহার উদযাপনে নানা কর্মসূচি গৃহীত হইয়া থাকে । এইবারের প্রতিপাদ্য হইলো ‘শিক্ষাই জীবনের মূল,ঝরে পড়া বিরাট ভুল’। শিক্ষাজীবনের মূল ভিত্তি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে বর্তমান সরকার গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ,সফলতাসহ আরও নানান দিক উঠিয়া আসিয়াছে ইহাতে। সন্দেহ নাই প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলিতে শিক্ষার্থীর উপস্থিতির হার আগের যেই কোনো সময়ের তুলনায় বাড়িয়া গিয়াছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হইলো কোনোমতেই শিক্ষার্থীদের ঝরিয়া পড়া রোধ করা যাইতেছে না। পাসের হার ব্যাপকভাবে বাড়িয়া গেলেও শিক্ষার গুণগত দিকটি রহিয়াছে উপেক্ষিত। এমনকি সাবেকি আমলের প্রাথমিক শিক্ষার সহিতও ইহার তুলনা করিলে দেখা যাইবে বর্তমান প্রাথমিক শিক্ষার গুণমান অনেকক্ষেত্রেই নিম্নমুখী। ঐ সময়ে প্রাথমিক স্তরেই শিক্ষার্থীগণ বাংলা, গণিত এবং ইংরেজি বিষয়ের ধারণা ছিল পক্ত যাহা বর্তমান সময়ে অনেকাংশেই অনুপস্থিত। ফলে শিক্ষার উচ্চস্তরে ইহা নেতিবাচক প্রভাব ফেলিতেছে। বৈষয়িক মৌলিক ধারণা দুর্বল হইবার কারণে কোন কোন ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী পড়াশোনায় আগ্রহ হারাইয়া ফেলিতেছে। অভিভাবকের সদিচ্ছা থাকিলেও ছাত্রের অনাগ্রহের দরুন মাধ্যমিক স্তর পার না হইতেই শিক্ষা জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে। পত্রিকান্তরে জানা যায়, দেশের ৭৫ শতাংশ শিক্ষার্থী প্রাথমিক স্তরে ‘ভালো শিক্ষা’ পাইতেছে না। মাতৃভাষা বাংলাও সঠিকভাবে পড়িতে পারে না অনেক শিক্ষার্থী। ইংরেজি ও গণিতের অবস্থা আরও হতাশাব্যাঞ্জক। শহরাঞ্চলের তুলনায় গ্রামাঞ্চলে ইহার অবস্থা আরও প্রকট। দেশীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে শিক্ষার উন্নয়নে অসংখ্য পদক্ষেপ লওয়া হইয়াছে। প্রাথমিক শিক্ষা কার্যক্রমকে প্রসারিত করিবার লক্ষ্যে উপবৃত্তি, খাবারের ব্যবস্থাসহ অনেক সহশিক্ষা কর্মসূচি গৃহীত হইয়াছে সরকারি ও বেসরকারিভাবে। বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় যেমন আছে বৈষম্য তেমনি উপস্থিত নানান বিশৃঙ্খলা।একদিকে সাধারণ প্রাথমিক ও এবতেদায়ি শিক্ষা; অন্যদিকে, কিন্ডারগার্টেন এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা। ইহার মধ্যে সাধারণ এবং এবতেদায়ি শিক্ষা ব্যতীত অন্যান্য শিক্ষা ব্যবস্থা সরকার স্বীকৃত নহে, এই সকল শিক্ষা কার্যক্রমগুলির নিজস্ব কারিকুলাম রহিয়াছে। ফলে নানামুখী ‘ব্যবস্থায়’ প্রাথমিক শিক্ষা এখন জটিলতার আবর্তে। ইহাতে একটি সমন্বিত এবং সুশৃঙ্খল শিক্ষাব্যবস্থা চরম প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন। ইহার উপর রহিয়াছে দাতাগোষ্ঠী প্রদত্ত বিভিন্ন নির্দেশনা যাহা অবশ্য পালনীয়। প্রকল্পের আওতায় প্রদত্ত নির্দেশকগুলি পূরণ হইবার পর প্রকৃত অর্জন হইলো কিনা তাহা বিচার করিবার সুযোগ এই ক্ষেত্রে নাই বলিলেই চলে। ব্যাপারটি অনেকটাই ‘পায়ের মাপে জুতোর পরিবর্তে জুতোর মাপে পা বানাইবার ন্যায়’। কাজেই নব্বইয়ের দশকে পরিকল্পিত ‘সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা’র অর্জনে একমুখী প্রাথমিক শিক্ষার কোন বিকল্প নাই। শহর এবং গ্রামের প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থায় একইরকম কারিকুলাম গ্রহণ করা বাঞ্ছনীয় বলিয়া আমরা মনে করি। আলাদা করিয়া নহে, বর্তমান শিক্ষালয়ই হইতে পারে ‘আনন্দ স্কুল’। তবে তাহার জন্য সর্বাগ্রে যাহা প্রয়োজন তাহা হইলো বিদ্যালয়ে গুণগত শিক্ষার নিশ্চয়তা।প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকগণকে শিক্ষার গুণগত মান উন্নয়নকল্পে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করিতে হইবে। সমপ্রতি প্রাথমিক শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় হইতে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীতকরণে সরকারি ঘোষণা সাধুবাদ পাইবার যোগ্য। কাজেই শুধু শিক্ষা নহে, প্রয়োজন মানসম্পন্ন শিক্ষা ।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন