শি ক্ষা

শিক্ষাক্ষেত্রে অব্যাহত সাফল্য

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৬
প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার যোগ্য ও কল্যাণমুখী নেতৃত্বে বর্তমান সরকার শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য অব্যাহত রেখেছে। এরই ধারাবাহিকতায় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকদের পদমর্যাদা তৃতীয় শ্রেণী থেকে দ্বিতীয় শ্রেণীতে উন্নীত করার ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। রোববার সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ ঘোষণা দেন। অনুষ্ঠানে প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরেপড়া রোধে স্বপ্রণোদিত হয়ে প্রত্যেকটি স্কুলকে ফান্ড তৈরির তাগিদ দেন প্রধানমন্ত্রী। একইসঙ্গে শিক্ষার মানোন্নয়নে বিত্তশালীদের এগিয়ে আসারও আহ্বান জানান তিনি। প্রধানমন্ত্রী যথার্থই বলেছেন যে, প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ঝরেপড়া অনেকাংশে হ্রাস পেয়েছে। তবে এটিকে শূন্যের কোঠায় নিয়ে আসতে হবে। প্রত্যেকটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে স্বপ্রণোদিত হয়ে স্কুল ফান্ড গঠন করতে হবে। খাবারের নিশ্চয়তা পেলে কোনো শিশুই আর স্কুল ছেড়ে দেবে না। শিক্ষার পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টি সরবরাহ করে দেশের ভবিষ্যত্ জনগোষ্ঠীকে সুশিক্ষিত, আধুনিক, সুস্বাস্থ্যবান করার এ মহতী উদ্যোগ জনমুখী রাজনীতির প্রকাশ। মুক্তিযুদ্ধের মহান চেতনা, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ, সুশাসনের প্রচেষ্টার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উদ্যোগ গভীরভাবে সম্পর্কিত। কারণ, প্রাথমিক ভিত্তিতে শিক্ষার বিকাশ মূলত দেশে উন্নত মানবিক ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশের অতি জরুরি পূর্বশর্তকেই পূরণ করবে। কেবল প্রাথমিক স্তরেই নয়, উচ্চশিক্ষাক্ষেত্রেও সাফল্যের ধারাবাহিকতা ক্রমেই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বাংলাদেশে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সামপ্রতিক সময়ে সীমিত পরিসর থেকে ক্রমেই বিকশিত হচ্ছে। বর্তমান সরকারের শাসনামলে অনেকগুলো পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মাধ্যমে কলেজগুলোও উচ্চশিক্ষা বিস্তারে কাজ করছে। অনেকগুলো প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয় চালু হয়েছে। এতে উচ্চশিক্ষাঙ্গনে ভর্তির বেশ কিছু সুযোগ উন্মোচিত হয়েছে। তবে দেশের জনসংখ্যার দিক এবং চাহিদার প্রসঙ্গটি মনে রেখে এ সুযোগ আরও বাড়ানো দরকার। এ পরিস্থিতিতে স্ব স্ব বিশ্ববিদ্যালয় নিজস্ব সম্পদের সর্বোচ্চ ব্যবহারের দিকে নজর দিচ্ছে। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আসন বৃদ্ধি, নতুন বিভাগ স্থাপন, আবাসিক হল নির্মাণসহ বিভিন্ন দিক দিয়ে যথাসাধ্য প্রচেষ্টা চালানো হচ্ছে। তরুণ, মেধাবী, যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণদের শিক্ষকতার পেশায় আসতে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এতে উচ্চ শিক্ষাঙ্গনের অতীত অচলাবস্থার অবসান ঘটেছে এবং প্রাণাবেগের সৃষ্টি হয়েছে। বাংলাদেশের ক্যাম্পাসগুলো এখন স্বাধীনতার দীপ্ত চৈতন্যে উদ্ভাসিত। মুক্তিযুদ্ধে শ্বাশত শপথে উজ্জীবিত। গণতন্ত্র, সুশাসন, অসামপ্রদায়িকতা, সাংস্কৃতিক বর্ণালী ও বহুমাত্রিকতায় মুখরিত। যার প্রমাণ চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ প্রায়-সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-ঋদ্ধ শিক্ষকদের নিরঙ্কুশ নির্বাচনী বিজয় এবং অদম্য ঐক্যের মাধ্যমে চিহিত হয়েছে। আদর্শিক পুনর্গঠনের পাশাপাশি বর্তমান সরকার শিক্ষাকে গণমুখী ও পূর্ণাঙ্গতর করতেও বদ্ধপরিকর। ফলে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে উচ্চশিক্ষার প্রতিষ্ঠানিক দায়িত্ব কেবলমাত্র পাঠদানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই। জাতির প্রয়োজন ও চাহিদাকে সামনে রেখে মানব সম্পদ বিকাশ, শিক্ষার্থীদের মনন, মানবিকতা, সাংস্কৃতিক চেতনা বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের ভাবাদর্শ ও জাতীয় ইতিহাসের পরম্পরায় গড়ে তোলাও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের অন্যতম কর্তব্য-কর্ম পালনেও সচেষ্ট। তাছাড়া ছাত্র-ছাত্রীদের সামগ্রিক চরিত্র গঠন, মূল্যবোধ, ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলার দায়িত্বও উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানকে পালন করতে তত্পর রয়েছে। ফলে আর পাঁচটা পেশার থেকে শিক্ষকতার একটা মৌলিক ও সম্মানজনক পার্থক্য আছে, এটা এখন সকলের কাছেই সুস্পষ্ট। শিক্ষকতা পেশার সঙ্গে ভবিষ্যত্ প্রজন্মকে সুস্থভাবে গড়ে তোলার দায়িত্ব অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘শিক্ষাসমস্যা’ প্রবন্ধে লিখেছেন, “আমাদের এখনকার প্রয়োজন যদি আমরা ঠিক বুঝি তবে এমন ব্যবস্থা করিতে হইবে যাহাতে বিদ্যালয় ঘরের কাজ করিতে পারে। বিদ্যাশিক্ষাটা যেন কেবল দিনের মধ্যে কয়েক ঘণ্টা মাত্র সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র হইয়া উঠিয়া বাস্তবিকতা সম্পর্কশূন্য একটা অত্যন্ত গুরুপাক অ্যাবস্ট্রাক্ট ব্যাপার হইয়া না দাঁড়ায়।” এই সতর্কবাণী অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করি এবং এ কারণেই জীবন ও কর্মমুখী শিক্ষা বিকাশের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের মধ্যে আলোকিত জীবনবোধ নির্মাণের কাজে শিক্ষকসমাজ তত্পর রয়েছেন। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে শিক্ষার পাশাপাশি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড বিকাশকে আমরা যেমন গুরুত্ব দিচ্ছি, তেমনিভাবে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কলা-কৌশলকে আত্মস্থ করার মাধ্যমে একবিংশ শতাব্দীর উপযুক্ত মানব সম্পদে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রেও আমরা শিক্ষার্থীদের প্রতিনিয়ত উদ্বুদ্ধ করছি। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের উদাহরণ দিয়ে বলতে পারি, এখানে ইন্টারনেট সুবিধা, বিদেশি রিসোর্স সেন্টার ও লাইব্রেরির সঙ্গে সংযোগ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এখানে বসেই একজন শিক্ষার্থী যাতে বিশ্বমানের তথ্য, প্রযুক্তি ও জ্ঞান আহরণ, শিক্ষা গ্রহণ ও গবেষণা করতে পারে, প্রশাসনের পক্ষে সেই প্রচেষ্টা নেয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সকল পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ই ডিজিটাল যুগের চাহিদা অনুযায়ী নিজেদেরকে সমৃদ্ধ করছে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি বেশ আশাব্যঞ্জক। তবে পাবলিক-প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের তুলনামূলক আলোচনায় দেখা যাচ্ছে যে, নানা কারণে প্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানে পার্থক্য হওয়া স্বাভাবিক। প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক, শিক্ষা সামগ্রী ও শিক্ষা সহায়ক পরিবেশের কারণে এমনটি হয়। যত দ্রুত সম্ভব এই পার্থক্য দূর করা উচিত। বাংলাদেশের বাস্তবতায় এখন উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালগুলোও কাজ করছে। সকলের মান যে সমান, সেটা বলা যাবে না। কিন্তু প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে হলে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সামগ্রিক মানের বিকাশ ঘটাতেই হবে। অবকাঠামোসহ নানাবিধ ক্ষেত্রে নজর দিতেই হবে। সরকারের নিদের্শনার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন (ইউজিসি) যোগ্য নেতৃত্ব ও দক্ষতায় এ ব্যাপারে উন্নয়ন সাধনের লক্ষ্যে আশানুরূপ কাজ করে যাচ্ছে। ক্রমেই সে কাজের পরিধি ও ক্ষেত্র সমপ্রসারিত হচ্ছে সময়ের প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনায় রেখে। দর্শনগত বিবেচনায় উচ্চশিক্ষা কেবল ডিগ্রি দেবে, তা নয়। শিক্ষার্থীদের জীবন মানের অগ্রগতির বিষয়টিও লক্ষ্য রাখবে। শিক্ষার্থীর মধ্যে জ্ঞান, যুক্তি, নান্দনিক বোধকে বেগবান করবে। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো কর্মক্ষেত্রে তাদের শিক্ষার্থীদের এমন যোগ্যতাসম্পন্ন করে পাঠাবে, যাতে শিক্ষার্থীরা জীবন, সমাজ ও জগতের নানামুখী চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে উচ্চশিরে টিকে থাকতে পারে। মূল কথায়, শিক্ষার্থীদের মেধা, যোগ্যতা ও দক্ষতা ইত্যাদি নানা গুণাবলীর বিকাশ ও চর্চার ক্ষেত্র হিসাবে কাজ করবে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান। উচ্চশিক্ষা একজন ছাত্র বা ছাত্রীর সামনে পৃথিবীর বহু জানালা খুলে দেবে। নিজের মতো করে পুরো বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে আত্মস্থ, অবলোকন ও পর্যবেক্ষণ করে একজন শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠক্রম শেষে একজন স্বাধীন, স্বাবলম্বী, যোগ্য ও পরিপূর্ণ মানুষে পরিণত হয়ে সাহসের সঙ্গে কর্মজীবনে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারবে। বাংলাদেশের অতীত অগণতান্ত্রিকার প্রেক্ষাপটে উচ্চশিক্ষার দার্শনিক দিকটিকে যথাযথভাবে বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা বাধা কাজ করছে। সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যে ঘাপটি-মারা প্রগতিবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল-অগণতান্ত্রিক অপশক্তি সব সময়ই চায় শিক্ষার প্রসার ও মানবিক উন্নতিকে রোধ করতে। সন্ত্রাস, সংঘাতের হিংস্র দানবও উচ্চশিক্ষার মাধ্যমে মানব সম্পদের মানবিক-আলোকিত উত্থানকে মেনে নিতে পারে না। ফলে বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষাঙ্গনের নিবেদিতপ্রাণ ছাত্র-শিক্ষক-অভিভাবকদের সব সময়ই উচ্চশিক্ষাবিরোধী নানা ধরনের নেতিবাচক অপশক্তির বিরুদ্ধে লড়তে হচ্ছে। এই লড়াই কখনও আদর্শিক, কখনও রাজনৈতিক। এই লড়াইয়ের এক পক্ষে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা প্রবাহের শক্তিসমূহ আর অন্যদিকে আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসের পরাজিত পক্ষ। এই লড়াই-সংগ্রামের বিজয়ের মধ্য দিয়ে যেভাবে বাংলাদেশের রাজনৈতিক গতিপথ তৈরি করতে হচ্ছে, তেমনিভাবে উচ্চশিক্ষার ধারাকেও এগিয়ে নিতে হচ্ছে। প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও প্রগতিচিন্তার সম্মিলনে জাতিসত্তার যে নবযাত্রা সূচিত হয়েছে, তার আলোকে উচ্চশিক্ষা দর্শনের পুনর্গঠন তথা তাত্ত্বিক ও বাস্তব প্রতিফলন ঘটানোর মধ্যেই উচ্চশিক্ষার সাফল্য নিহিত। বাংলাদেশের সকল উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানই এখন এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্তব্য-কর্ম সফলতার সঙ্গে সম্পাদন করছে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনায় আজকের আধুনিক বাংলাদেশকে জ্ঞান, প্রগতি ও প্রযুক্তিমুখী ধারায় এগিয়ে নিয়ে আলোকিত মানব সম্পদেও যোগ্য নেতৃত্বে পৃথিবীর মানচিত্রে উন্নততর স্তরে উপনীত করাই এখন উচ্চশিক্ষার চ্যালেঞ্জ। আর এভাবেই সমাজ ও রাজনীতির গুণগত রূপান্তর সাধন করে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা-লালিত বাংলাদেশের স্বপ্নযাত্রা সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছাতে পারবে। বর্তমান সরকার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার প্রাজ্ঞ নেতৃত্বে শিক্ষাক্ষেত্রে সাফল্য অব্যাহত রেখে জাতি গঠন ও মানব সম্পদ উন্নয়নের মাধ্যমে বাংলাদেশকে বিশ্বের দরবারে উচ্চাসনে নিয়ে যেতে সঙ্কল্পবদ্ধ। দলের রূপকল্প এবং সরকারের কর্মপরিকল্পনায় শিক্ষা ও উন্নয়ন যথাযথ গুরুত্ব পাওয়ায় সমগ্র জাতি একটি ইতিবাচক পরিবর্তন ও অগ্রগতির স্পন্দন অনুভব করছে। সে স্পন্দন দেশের প্রতিটি অঞ্চল ও প্রতিটি নাগরিকের মধ্যেও সূচনা করেছে ব্যাপক প্রণোদনা। এখন প্রয়োজন হলো প্রতিটি ক্যাম্পাসে কুসংস্কার-কূপমণ্ডূকতা-সামপ্রদায়িকতা-জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে ছাত্র-শিক্ষকের মিলিত শক্তিতে স্বাধীনতা-গণতন্ত্র-প্রগতির বিজয়ধারাকে অব্যাহত রাখা। লেখক : মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, উপাচার্য, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন