প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ ২০১৪ পালন ও প্রাসঙ্গিক কিছু কথা

আপডেট : ১০ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৭
আমাদের জন্য এটি একটি আনন্দের সংবাদ যে, শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার শিক্ষাকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেয়ার পক্ষে। শিক্ষাক্ষেত্রে গৃহীত সরকারের বিভিন্ন পদক্ষেপ যেমন বিনামূল্যে পাঠ্যপুস্তক বিতরণ, উপবৃত্তি, বিভিন্ন শিক্ষা প্রকল্প যেমন সেকায়েপ, এস ই এস ডিপি গ্রহণ তারই প্রমাণ। সারাদেশে গত ৯ মার্চ শুরু হয়েছে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহ্। দু্ই বছর পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবার এ সপ্তাহ পালন করছে। ঝরে পড়ার হার রোধ, শ্রেষ্ঠ শিক্ষকদের সম্মাননা দেয়াসহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয় এ সপ্তাহে। মন্ত্রণালয়ের ও প্রাথমিক শিক্ষা অধিদফতরের নিয়মিত অনুষ্ঠান হলেও এবারের শিক্ষা সপ্তাহ শিক্ষকদের জন্য অন্য ধরনের এক আনন্দ নিয়ে এসেছে। আর সেটি হচ্ছে সরকারের পক্ষ থেকে প্রাথমিক শিক্ষা সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণ এবং তাদের পদমর্যাদা বৃদ্ধির ঘোষণা আসা। আর এ ঘোষণা এসেছে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে, এতে প্রাথমিক শিক্ষক সমাজের স্বভাবতই উত্ফুল্ল হওয়ার কথা। পূর্বের ৩৭ হাজার ৬৭২ সরকারি বিদ্যালয়ের পাশাপাশি নতুন সরকারি হওয়া প্রায় ২৬ হাজার বিদ্যালয়ের শিক্ষকরা নূতন এ সুবিধা পাবেন। আমরা সরকারের এ ঘোষণাকে স্বাগত জানাই। কারণ প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক এবং অবৈতনিক হওয়া সত্ত্বেও এ গুরুত্বপূর্ণ স্তরটির অবস্থা খুব একটা ভাল নেই বিভিন্ন কারণে। এর প্রধান একটি কারণ হচ্ছে গুণগত ও যুগোপযোগী শিক্ষা প্রদান করা হয় না সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে কারণ মানসম্পন্ন শিক্ষক আমরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই নিয়োগ করতে পারি না এ স্তরে। প্রধান শিক্ষক ও শিক্ষকদের বেতন স্কেল উন্নীতকরণের ফলে আমরা আশা করি মেধাবীরা প্রাথমিক শিক্ষায় শিক্ষকতা পেশা গ্রহণ করার জন্য উত্সাহী হবেন। আর মেধাবীরা যখন এ স্তরে শিক্ষাদান শুরু করবেন তখন আমরা নিশ্চিতভাবে গুণগত শিক্ষাদান নিশ্চিত করতে পারবো এ স্তরে। আমরা সরকারের কাছে আরও একটি আবেদন জানাতে চাই আর সেটি হচ্ছে প্রাথমিক শিক্ষায় মেধাবী এবং উচ্চশিক্ষিত তরুণদের শুধু প্রাথমিক শিক্ষক বিবেচনায় বেতন কাঠামো ঠিক না করে তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী বেতন স্কেল নির্ধারণ করা এবং ভবিষ্যতে তাঁরা যাতে মাধ্যমিক এবং কলেজ পর্যায়ে শিক্ষকতা প্রদান করার সুযোগ পান। এ ধরনের প্রাকটিস অনেক দেশে আছে, আমরাও করতে পারি। এটি করা হলে নিশ্চিতভাবে মেধাবীরা এ পেশায় আকৃষ্ট হবেন। সরকার প্রাথমিক শিক্ষাকে পঞ্চম শ্রেণিতে উন্নীত এবং অষ্টম শ্রেণি পর্যায়ে শিক্ষাকে অবৈতনিক ও বাধ্যতামূলক করার পরিকল্পনা করেছে। রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে প্রাথমিক সপ্তাহ -২০১৪ এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির ভাষণে প্রধানমন্ত্রী এ কথা বলেন। এটি শিক্ষার জন্য আর একটি প্রশসংনীয় উদ্যোগ। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরকারের এই ঘোষণা বাস্তবায়ন করা উচিত বলে আমরা মনে করি। তিনি বলেন তার সরকার প্রাথমিক স্তরে কম্পিউটার শিক্ষা বাধ্যতামূলক ও নারী শিক্ষার অগ্রগতির জন্য উপবৃত্তি কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে। সরকার এখানে একটি ভাল নজির স্থাপন করেছে। আমাদের দেশে সাধারণত পূর্ববর্তী সরকারের নেয়া যত ভাল পদক্ষেপই হোক না কেন পরবর্তী সরকার তা বাতিল করে দেয়। এখানে তার ব্যত্যয় ঘটেছে। এটি প্রশংসার দাবিদার। তিনি বলেন, শতভাগ স্বাক্ষরতা অর্জনের লক্ষ্যে বয়স্কদের জন্য উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়নের অঙ্গীকার পূরণে ইতিমধ্যে তার সরকার একটি প্রকল্প অনুমোদন করেছে। প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ে আয়োজিত এ অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী সরকারি কর্মকর্তা, শিক্ষক, স্থানীয় নির্বাচিত প্রতিনিধি এবং শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ সম্মাননা ও পদক প্রদান করা হয়। প্রধানমন্ত্রী সেই সঙ্গে জাতীয় পর্যায়ে খেলাধুলা ও সাংস্কৃতিক অনষ্ঠানে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্থান অধিকারী ২৫০ জন শিক্ষার্থীর মাঝে মেডেল ও সনদ বিতরণ করেন। তিনি আরও বলেন, তার সরকার ইতিমধ্যে ৯৯ হাজার ১৮১ জন শিক্ষক-কর্মচারী নিয়োগ দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণার পর প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে এক প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। তাতে বলা হয় যে, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকদের গ্রেড-১১ অনুযায়ী মূল স্কেলের বেতন হবে ছয় হাজার চারশত টাকা এবং প্রশিক্ষণ বিহীন শিক্ষকদের গ্রেড-১২ তে মূল বেতন স্কেল হবে পাঁচ হাজার নয়শত টাকা। সহকারী শিক্ষকদের গ্রেড-১৪ অনুযায়ী মূল বেতন স্কেল হবে পাঁচ হাজার দুইশত টাকা এবং প্রশিক্ষণবিহীনদের গ্রেড-১৫তে চার হাজার নয়শত টাকা। প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নে এটি একটি মাইলফলক। সরকারের এত কিছু পদক্ষেপ গ্রহণ করার পরেও আমরা শতভাগ শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে নিয়ে আসতে পারিনি। সম্প্রতি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয় যে, ২০১৩ সালে ২৬.২ ভাগ প্রাথমিক শিক্ষার্থী ঝরে পড়েছে মূলত দারিদ্র্যের কারণে। এ অবস্থা থেকে বের হওয়ার জন্য সবাইকে কার্যকরি পন্থা গ্রহণ করতে হবে।  লেখক :প্রোগ্রাম ম্যানেজার: ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচি এবং ভাইস-প্রেসিডেন্ট: বাংলাদেশ ইংলিশ ল্যাংগুয়েজ টিচার্স এসোসিয়েশন (বেল্টা)