প্রতিছর নারী দিবস এলে সবার নতুন করে মনে পড়ে নারী অধিকারের কথা। তারপর নারী দিবসে বলা ভাল ভাল কথাগুলো অনেকেরই আর মনে থাকে না। কিন্তু অধিকারের প্রশ্নটি থেকেই যায়। বাংলাদেশে নারীরা দু’ভাবে অধিকার ভোগ করার কথা। রাষ্ট্রীয় অধিকার ও সামাজিক অধিকার। সংবিধানে নারী-পুরুষের সমান অধিকারের কথা বলা হয়েছে। বাস্তবে এখানে ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে নারী ঘরে-বাইরে নির্যাতন ও বৈষম্যের শিকার হয়। নারী নেত্রী আয়শা খানম বলেন, নারীদের নাগরিক দায়িত্বের পাশাপাশি সন্তান পালন করতে হয়। এক্ষেত্রে নারীরা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। নারীদের লড়াইটা রাজনৈতিক, সামাজিক, মানসিক। তাই যার যার জায়গা থেকে লড়াই করতে হবে। আসলে সব নারীর অবস্থান এক রকম নয়। তাই সব নারীকে নিজের অবস্থান বোঝার মত ক্ষমতা গড়তে হবে। এযুগের নারী অনেকটাই সচেতন তার পরেও বলা হয় ধরন পাল্টালেও নারীর পিছু ছাড়েনি নির্যাতন। মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছে দেশের সিংহ ভাগ নারী। একারণে বাড়ছে আত্মহত্যার প্রবণতা। ২০১৩ সালে আত্মহত্যা করেছে ৩৮৬ জন। নারীতো সমাজের একজন। সে একা এগিয়ে যাবে কি করে অন্যরা যদি চলার পথ সহজ করে না দেয়। এ প্রসঙ্গে কবি জীবনান্দ’র ব্যক্তি জীবনের কথা এসে যায়। তার স্ত্রী লাবণ্য রবীন্দ্রনাথের “ঘরে বাইরে” নাটকে অভিনয়ের সুযোগ পেলে সমালোচনা হয়। অনেকে বলে জীবনান্দ বউকে কি স্টেজে নামাবে? তখন তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, স্ত্রীর স্বাধীনতা রক্ষা করবেন এমন কি সিনেমাতেও অভিনয় করতে দেবেন। প্রায় একশত বছর আগের উন্নত এই মানসিকতার পরিচয় এখনও মেলে না।
বাংলাদেশের সংবিধান রাষ্ট্রীয় ও জন জীবনে নারী ও পুরুষের সমানাধিকার আইন ঘোষণা করেছে। তারপরেও দেওয়ানী আইন ও ব্যক্তিগত আইনের মধ্যে বিস্তর পার্থক্য লক্ষ্য করা যায়। পর্যাপ্ত সুযোগ না থাকায় বাংলাদেশে নারী শিক্ষা, স্বাস্থ্য, চাকুরির প্রতিষ্ঠানিক-অপ্রতিষ্ঠানিক সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী গার্মেন্টস শিল্পে ৪০ লাখেরও বেশি শ্রমিক কাজ করে। তার মধ্যে ৮০ ভাগ নারী। সাক্ষাত্কারে জানা যায়, দুই বছরের বেশি চাকরি হলে ওদের ছাঁটাই করা হয় বিনা অপরাধে। বাচ্চা হবার সময় চাকরি থাকে না। কাজ ছেড়ে দেশে গিয়ে থাকতে হয়। দুর্ঘটনায় আহত বা নিহত হলেও শ্রম আইন অনুযায়ী ঠিকমত ক্ষতিপূরণ পায় না। তারা পায়না কোন ট্রেড ইউনিয়নের সুযোগ। ৩ মার্চ পালিত হয় যৌন অধিকার দিবস। কেউ পেটের দায়ে, কেউ প্রতারণার কারণে, কেউ পরিস্থিতির শিকার হয়ে যৌনকর্মী হতে বাধ্য হয়। তাই ৩ মার্চের দাবী ছিল নিবর্তনমূলক আইন সংশোধনী ও আইনের অপপ্রয়োগ রহিত করা হোক। নারী সুযোগ পেলে কী না করতে পারে। রাজনৈতিক ক্ষেত্রে তার প্রমাণ। চাঁদপুরে মেয়ে জান্নাতুল মাওয়া রুমা হেঁটে গড়লেন রেকর্ড। ১১ ফেব্রুয়ারি কলকাতা প্রেসক্লাব থেকে সাংবাদিক সম্মেলন করে যাত্রা শুরু করেন। ১৯ ফেব্রুয়ারি বিকেল ৪টায় আমাদের জাতীয় প্রেসক্লাবে পৌঁছে জাতীয় পতাকা উড়িয়ে হাঁটার পরিসমাপ্তি করেন। ব্যক্তিগত অধিকারই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের আপন ঘরে মূল্যায়ন হয় না। সারাজীবন পুকুরের পানির মত আমাদের শ্রম বিফলে যায়। মানুষের দুটো হাতের মতই নারী ও পুরুষ। একটা হাত না থাকলে যেমন কষ্ট তেমনি একজন ছাড়া অন্যজনকে ভাবাই যায় না। দুজনকেই প্রতিষ্ঠিত করতে হবে সম মর্যাদায়। নির্যাতন কথাটার মৃত্যু কামনা করি। ঘরই হবে নারী নির্যাতন বন্ধের সুতিকাগৃহ। নারী শিক্ষিত হবে। বুদ্ধির পরিচর্যা করবে। হতে হবে স্বাবলম্বী। নারী নির্যাতন বন্ধ করতে হবে। তবেই গড়ে ওঠবে সমৃদ্ধ সমাজ ও সুখী পরিবার।
লেখক :কথাশিল্পী ও প্রবন্ধকার
