দারিদ্র্য হটাও পরিবেশ বাঁচাও

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৪, ২০:৪২
পরিবেশ দূষণের খবরে নিত্যদিনই পত্রিকার পাতাগুলি সয়লাব। ইলেকট্রনিক মিডিয়ায়ও এই ধরনের খবরের ছড়াছড়ি। নদী-নালা-খাল-বিল, কল-কারখানা, রাস্তা-ঘাট, বন-জঙ্গল সবকিছুই দূষণের শিকার এবং সেই কারণে সর্বত্রই পরিবেশ বিপন্ন হইতেছে এমন অভিযোগ এন্তার দেখা যাইতেছে ঐসব প্রতিবেদনে। এইসব অভিযোগ মিথ্যা এমনটা নিশ্চয়ই কেউ বলিবে না। কিন্তু প্রশ্নটি হইতেছে পরিবেশ দূষণের প্রতিকার কি? প্রতিকারের যেই সকল পন্থাসমূহ আমাদের দেশি-বিদেশি পরিবেশবিদগণ বা পরিবেশ বিষয়ক সংস্থাসমূহ বাতলাইয়া থাকেন উহা কি আদৌ গ্রহণযোগ্য বা আদৌ কি তাহা বাস্তবসম্মত? পরিবেশ দূষিত হইতেছে এই কথা সত্য কিন্তু যেই সকল কারণে এই অবস্থার সৃষ্টি হইয়াছে উহা কি আমরা তলাইয়া দেখিতে আগ্রহী? গত সোমবার একটি জাতীয় দৈনিকে দূষণ সম্পর্কিত এক দীর্ঘ প্রতিবেদনে এই ব্যাপারে অনেক তথ্য-উপাত্ত হাজির করা হইয়াছে। শিল্পবর্জ্য হইতে শুরু করিয়া পরিবেশ দূষণকারী নানা বিষয় ইহাতে তুলিয়া ধরা হইয়াছে। দূষণে জনজীবন বিপর্যস্ত কিন্তু দূষণরোধে বিদেশি সাহায্যের দিকে হা করিয়া তাকাইয়া থাকা এক প্রকার অর্বাচীনতা ছাড়া আর কি হইতে পারে। আন্তর্জাতিক মহলের মতে, বাংলাদেশের পরিবেশ দূষণরোধে ৭ শত কোটি ডলারের প্রয়োজন। কিন্তু কথাটি হইল, এই বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশিরা আমাদেরকে দিবে আর আমরা আমাদের পরিবেশ রক্ষা করিব, এহেন চিন্তা বালখিল্যতা ছাড়া আর কিইবা হইতে পারে। পরিবেশ অবশ্য একটি বিশাল ও মারাত্মক সমস্যা। কিন্তু প্রকৃতির নিজের যে চলার গতি উহার বিপরীতে দাঁড়াইয়া পরিবেশ বাঁচাইবার চিন্তা অর্বাচীনতা নহে কি? পরিবেশ বাঁচাইতে হইলে তাহা আমাদেরকে আমাদের মতো করিয়া অর্থাত্ আমাদের সামর্থ্য অনুযায়ীই করিতে হইবে। অন্যের দ্বারস্থ হইয়া এতবড় সংকট নিরসনের যাহারা বুদ্ধি দেয় তাহারা শুভাকাঙ্ক্ষী নাকি বিশেষ কোন উদ্দেশ্য সাধনের নিমিত্তে নিয়োজিত উহাও চিন্তা করা দরকার বৈকি। আমরা মনে করি, পরিবেশের মতো এতবড় বিষয় মোকাবেলার জন্য আমাদের নিজেদেরকেই সবিশেষ উদ্যোগী হইতে হইবে। দারিদ্র্যই যে পরিবেশ দূষণের অন্যতম কারণ এই কথা নিশ্চয়ই সকলেই মানিবেন। সুতরাং সম্পদ বৃদ্ধির মাধ্যমে দেশের মানুষের জীবনের মান উন্নত করিতে তথা সার্বিকভাবে দারিদ্র্য দূরীকরণে সমর্থ হইলে পরিবেশ দূষণের ঘটনাও বহুলাংশে কমিয়া যাইবে। নিজের পায়ে দাঁড়াইতে শিখিলে যে কোন প্রতিকূলতা মোকাবিলার সামর্থ্যও সৃষ্টি হইবে। আমরা বর্তমানে আমাদের সামর্থ্য মোতাবেক এই ক্ষেত্রে যতটুকু ও যাহা করণীয় তাহা আন্তরিকভাবে করিলে কিছু লাভ অবশ্যই হইবে। আর পাশাপাশি দারিদ্র্যের ন্যায় দানবটিকে খাঁচাবন্দী করিতে সকল পর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণ করিলেই এই এতবড় সংকটও ক্রমান্বয়ে লাঘব হইবে। বিদেশিরা তাহাদের দেশের পরিবেশ দূষণরোধে যেইভাবে চিন্তা করে আমাদের ন্যায় দরিদ্র দেশও যদি ঠিক ঐভাবে নিজেদের দূষণ মোকাবিলার চেষ্টা করে তাহা হইলে উহাতে হিতে বিপরীতই হইবে মাত্র। আর অতীতে উহাই হইয়াছে এই দেশে। কবি বলিয়াছেন, দাও ফিরে সে অরণ্য লও এ নগর-আজিকার পরিবেশের দূষণজনিত বাস্তবতায় আমাদের সকলের মনের গহীনে এই আকাঙ্ক্ষাই যেন মূর্ত হইয়া ওঠে। কিন্তু আমরা অপ্রয়োজনীয়ভাবে এবং কেবলই স্বার্থমগ্নতায় আচ্ছন্ন থাকিয়া নদী-নালা, পাহাড়-জঙ্গল, বন-বাদাড়, ঘর-বাড়ি, রাস্তা-ঘাট ও জীববৈচিত্র্যের যে সমূহ-ক্ষতি ইতোমধ্যেই সাধন করিয়াছি উহা ফিরাইবার মতো অবস্থা এখন আদৌ আছে কি? আমরা এই ক্ষেত্রে সন্দেহাতীতভাবে অনেক বিলম্ব করিয়া ফেলিয়াছি। মোদ্দাকথা, পরিবেশ দূষণ ঠেকাইতে হইলে নিজ সামর্থ্যের উপর ভর করিয়া এবং সুচিন্তিত পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমেই উহা প্রাথমিকভাবে শুরু করিতে হইবে। মনে রাখা দরকার যে, দেশে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর দুর্বলতা এত প্রকট যে, বিদেশিরা এইসব ক্ষেত্রে সাহায্য দিতে আগ্রহী হইলেও উহার সদ্ব্যবহার হইবে এমন ভরসা পায় না। তাহা ছাড়া, বিদেশি সাহায্যের উপর এতদবিষয়ে নির্ভরতা ও তাহাদের মতো করিয়া সংকট সমাধানের চেষ্টা সফল হইবে এমন মনে করার কোনই কারণ নাই। তাই নিজেদের মতো করিয়াই ইহার মোকাবিলা অপরিহার্য, দারিদ্র্য হটাও পরিবেশ বাঁচাও—ইহাই হওয়া উচিত আমাদের প্রত্যয় ও অঙ্গীকার।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন