সাবেক রাষ্ট্রপতি হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলিয়াছেন যে, রাজনীতিতে এখন সত্ ও দেশপ্রেমিক নেতার বড় বেশি প্রয়োজন। তাঁহার মতে, রাজনীতির ক্ষেত্রে এই ধরনের নেতার অংশগ্রহণ যত বেশি হইবে, দেশও তত দ্রুত সুষ্ঠু শাসনব্যবস্থার দিকে আগাইয়া যাইবে। কথাটির যৌক্তিকতা লইয়া কেহ প্রশ্ন তুলিবেন বলিয়া মনে হয় না। তবে নানাভাবে আলোচিত-সমালোচিত সাবেক এই স্বৈরশাসকের মুখে এমন সুবচন শুনিয়া অনেকে বিস্মিত হইতে পারেন বৈকি। খুঁজিতে পারেন এই বক্তব্যের অন্তর্নিহিত নানা অর্থও। বিষয়টিকে অন্যভাবেও দেখা যাইতে পারে। ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে শুধু বয়সের হিসাবেই প্রায় পুরো একটি শতাব্দীর তিনি জীবন্ত সাক্ষী। তদুপরি, তিনি তাহার নীরব দর্শকমাত্র ছিলেন না। সেনাপ্রধান হিসাবে দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। সর্বাপেক্ষা ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসাবে দেশ শাসনও করিয়াছেন দীর্ঘ সময়। ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় বিশেষ প্রভাব খাটাইয়া রাজনৈতিক দল গঠন করিয়াছেন। আবার গণআন্দোলনের মুখে ক্ষমতাচ্যুত হইবার পর আবির্ভূত হইয়াছেন রাজনীতিকের ভূমিকায়। সব মিলাইয়া, সত্ রাজনীতি বা রাজনীতিকের পৃষ্ঠপোষক হয়তো তাহাকে বলা যাইবে না, তবে দীর্ঘ এই পথপরিক্রমায় তিনি যাহা দেখিয়াছেন ও উপলব্ধি করিয়াছেন—উপর্যুক্ত বক্তব্যে হয়তো তাহারই প্রতিফলন ঘটিয়াছে।
রাজনীতি সম্পর্কে যিকঞ্চিত্ খোঁজখবর রাখেন এমন ব্যক্তিমাত্রই স্বীকার করিবেন যে, রাজনীতি কখনোই শতভাগ বিশুদ্ধ বা কলুষমুক্ত ছিল না। পাশাপাশি, ইহাও অনস্বীকার্য যে কয়েক দশক আগেও রাজনীতির অঙ্গনে সততা, আদর্শনিষ্ঠা ও ত্যাগী মানসিকতার যে একচ্ছত্র প্রাধান্য পরিলক্ষিত হইয়াছে—তাহা ক্রমশ বিলুপ্ত হইতে চলিয়াছে। এই উপমহাদেশেই এমন সব নেতার জন্ম হইয়াছে—যাহাদের নাম এখনও শ্রদ্ধার সাথে উচ্চারিত হয় বিশ্বব্যাপী। কী ত্যাগে, কী সততায়, কী আদর্শনিষ্ঠায় স্মরণীয় হইয়া আছেন—বাংলাদেশেও এমন নেতার সংখ্যা একেবারে কম নহে। রাজনীতিতে অসততা, আদর্শহীনতা ও দুর্নীতিপরায়ণতা কম-বেশি আগেও ছিল। এখনও আছে। হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ নিজেও হয়তো এমন দাবি করিবেন না যে তাহার শাসনামলে এইসব ছিল না এবং তখন রাজনীতিকরা সকলেই সত্ ও নিষ্কলুষ ছিলেন। তবে সময়ের সাথে সাথে সামগ্রিক পরিস্থিতিতে যেই মাত্রাগত পরিবর্তন ঘটিয়া গিয়াছে, তাহাই হয়তো সাবেক এই স্বৈরশাসককে বিচলিত করিয়া থাকিবে। উপর্যুক্ত মন্তব্যটি সম্ভবত সেই বিস্ময়েরই বহিঃপ্রকাশ মাত্র।
পরিবর্তনই সত্য। ইহার অমোঘতাকে অস্বীকার বা অগ্রাহ্য করিবার ক্ষমতা কাহারও নাই। পরিবর্তনের ধারায় বর্তমানে সত্ ও দেশপ্রেমিক রাজনীতিকের অভাব পরিলক্ষিত হইতেছে ইহা যেমন সত্য, তেমনি গত কয়েক দশকে সমাজ ও অর্থনীতির নানা ক্ষেত্রে যে বিস্ময়কর অগ্রগতি সাধিত হইয়াছে—তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। দৃষ্টান্ত হিসাবে শুধু এইটুকু বলাই যথেষ্ট যে একাত্তরের ১৬ ডিসেম্বর যেই বাংলাদেশ আমরা পাইয়াছিলাম আর বর্তমানে যেই বাংলাদেশে আমাদের বসবাস—উভয়ের মধ্যে ব্যবধান কী বিপুল তাহা অনুধাবন করিবার জন্য পরিসংখ্যান ঘাঁটিবার প্রয়োজন পড়ে না। অতএব, পরিবর্তনের ভালোমন্দ দুইটি দিকই রহিয়াছে। এই বাস্তবতাকে আমাদের মানিয়া লইতে হইবে। তদুপরি, শুধু যে রাজনীতির ক্ষেত্রেই সততা ও দেশপ্রেমের অভাব ঘটিয়াছে এমনও নহে। নীতি-আদর্শ ও মূল্যবোধের এই সংকটকে যদি ব্যাধি হিসাবে চিহ্নিত করা হয় তাহা হইলে আমরা বলিতে বাধ্য যে গোটা সমাজই এখন এই ব্যাধিতে আক্রান্ত। এমনকী উন্নয়নশীল দেশগুলির বাস্তবতাও খুব একটা ভিন্ন নহে। ইহাতে হতাশ হইবার কিছু নাই। কারণ কিছুই অপরিবর্তনীয় নহে। সময় নিজের প্রয়োজনে নীতি-আদর্শ, এমনকী মূল্যবোধেরও পরিবর্তন ঘটাইয়া থাকে। যাহা চিরকালীন ও প্রয়োজনীয় তাহা গ্রহণ করে, আর যাহা অপ্রয়োজনীয় তাহা বর্জন করে। বস্তুত গ্রহণ-বর্জনের নিরন্তর এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়াই সভ্যতা আগাইয়া চলিয়াছে।
