প্রদর্শনী

‘তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা’

আপডেট : ১১ মার্চ ২০১৪, ২০:৪২
শহিদ কবীরের চোখে কোনো কিছুই এড়িয়ে যায় না। তাই তার আঁকা পোড়া রুটিতে দেখা যায় কত রকমের রঙ—কিংবা নারীর ঘর্মাক্ত ঘাড়ে রঙের উজ্জ্বল ঝিলিক। একইভাবে তার আঁঁকা আকাশ নেমে আসে মাটিতে। এভাবে তার একের পর এক এঁকে যাওয়া দৃশ্য দেখে আমরা বিস্মিত হই। আমরা আরো অবাক হই, যখন দেখি টুলে বেঁধে রাখা ফুলগুলো প্রাণে বাঁচতে ছটফট করছে। আবার মুগ্ধভাবে নত হই আদাবরের বস্তিতে স্নানরত রমণীর কাছে। তিনি সেই শিল্পীদের একজন—যারা এভাবে প্রতিনিয়ত আমাদের শিল্পের সুধা পান করার সুযোগ করে দিচ্ছেন। তার জন্ম বরিশালে। বড় হয়েছেন নদী-নদীর পাড়ের মানুষের সাথে—আর হারিয়ে গিয়েছিলেন মাটির কাছে। হয়তো এ কারণেই চল্লিশ বছরের বেশি সময় ধরে ছবি আঁকার পরও নিজের একক চিত্র প্রদর্শনীর শিরোনাম দিয়েছেন ‘তোমার পরে ঠেকাই মাথা’। শিল্প-শিক্ষা নিয়েছেন ঢাকার আর্ট কলেজে। ঢাকায় এসে নিজ গুণে সুযোগ করে নিয়েছেন শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার সংস্পর্শ পাওয়ার। গুরুর কারণে নয়, নিজের প্রাণ শক্তিকে শাণিত করতেই তিনি গিয়েছিলেন গুরুর কাছে। শিল্প-শিক্ষার কারণে শহরে এসেও তিনি ভুলে যাননি মাটির কথা। তাই তো তিনি এই শহরেও ঠিকই মাটিতে থাকা তথাকথিত সমাজের কাছে অস্পৃশ্য মানুষদের খুঁজে নিয়েছেন। একের পর এক এমন মানুষদের এঁকে নিজের ইন্দ্রিয়কে করেছেন জর্জরিত। আবার এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেতে এঁকেছেন লালন সিরিজ। একইভাবে জুতার ক্ষয়ে যাওয়া তলি আঁকতে গিয়ে জেনেছেন—‘জীবন বোধ হয় অন্য কোথাও থাকে’। সেই জীবন খুঁজতে তিনি গিয়েছেন স্পেনে। সেই দেশ সম্পর্কে শিল্পী বলেন, স্পেন আমার দ্বিতীয় জন্মভূমি। সেখানেও তিনি মানুষের শরীরে লেপে দিয়েছেন রোদে পোড়া মাটি। এক মাটির যে কত রঙ থাকতে পারে তা দেখতে হলে শহিদ কবীরের কাজ দেখতে হবে। স্পেনের সূত্রে পুরো পশ্চিমের আদ্যোপান্ত দেখে তিনি জেনেছেন—তুচ্ছ পান্তা ভাতের থালা আর পোড়া রুটি বদলে দিতে পারে শিল্পের ভাষা। তাই তিনি জীবনানন্দ দাশের মতো আবার ফিরে এসেছেন নদী আর নদীর পাড়ের মানুষের কাছে—জীবনের কাছে। নদীর পানি ধোয়া মাটি তার কাছে হয়েছে অমূল্য সম্পদ। সেই সম্পদের খোঁজ করতে গিয়ে তার আঁকা পথ হয়নি কখনো শেষ। পথের খোঁজ না পেলেও তিনি আবার আঁকেন মানুষের শরীর—তাদের জীবন। তাই বৃদ্ধ মানুষের দাড়ি আঁকতে গিয়ে ক্যানভাসে লাগিয়ে দেন খড়। যে খড় তার আঁকা ছবিতে মিশে গেছে নদীর পাড়ের মাটির সাথে। এভাবেই শহিদ কবীর নিজের কাছে থাকা একের পর এক পাপড়ি মেলেছেন। জীবনের এমন দৃশ্য শহিদ কবীরের ছবিতেই পাওয়া যায়। ২০০৮ সালে শেষ একক প্রদর্শনী করেছেন। প্রায় ছয় বছর পর আজ বুধবার শুরু হচ্ছে ধানমণ্ডির বেঙ্গল শিল্পালয়ে ‘তোমার ’পরে ঠেকাই মাথা’ শীর্ষক শিল্পীর একক প্রদর্শনী। ১ এপ্রিল পর্যন্ত এ প্রদর্শনী চলবে। আসুন, জীবনের অন্য মানে দেখতে শিল্পী শহিদ কবীরের প্রদর্শনী দেখা থেকে যেন নিজেদের বঞ্চিত না করি। লেখক :প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন