একটি বাস্তব ঘটনা বলি। আমি তখন নবম শ্রেণির ছাত্র। আমাদের ক্লাসে বাচ্চু ব্যতিরেকে সবাই আদব-লেহাজ মেনে চলি। শিক্ষকগণও বাচ্চুর ব্যাপারে উদাসীন— সালাম-ভক্তি করলো কি করলো না তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই। টাইটেল পাস একজন নতুন মাওলানা এলেন ইসলাম ধর্মের শিক্ষক হয়ে। তিনি বাচ্চুকে নিয়ে চিন্তিত এবং বাচ্চুর বাবা অন্য একটি হাইস্কুলের শিক্ষক জেনে বাচ্চুর উপর কিছুটা বীতশ্রদ্ধ। হাটবারে বাজার করার সময় একদিন বাচ্চুর বাবাকে পেয়ে তিনি অভিযোগ করলেন, আপনি একজন শিক্ষক অথচ আপনার ছেলে এতোই বেয়াদব হয়েছে যে পথে-ঘাটে দেখা হলে একটা সালাম পর্যন্ত দেয় না। বাচ্চুর বাবার খুব রাগ হলো এবং তিনি বাড়ি গিয়ে বাচ্চুকে বিষয়টা খুলে বললেন। আর ভুল হবে না বলে বাচ্চু ওর বাবাকে আশ্বস্ত করলো। পরের হাটবারে বাচ্চু বাজারে গিয়ে হুজুরকে দেখামাত্র বললো, হুজুর আসসালামু আলাইকুম। হুজুর সালামের জবাব দিয়ে কুশলাদি জিজ্ঞেস করে বাজার করতে লাগলেন। মাছ কেনার সময় ভিড় ঠেলে মাথা ঢুকিয়ে বাচ্চু আবার সালাম দিলো চিত্কারের ভঙ্গিতে। হুজুর চমকে উঠলেন এবং একটু ইতস্তত করে সালামের জবাব দিলেন। তরকারি কেনার সময় আবার হঠাত্ করে দীর্ঘ সালাম দিয়ে হুজুরের দিকে তাকালো। এভাবে হুজুর যতোক্ষণ বাজারে থাকলেন বাচ্চু ঘুরে ফিরে একটু পর পর সালাম দিতে লাগলো। হুজুর শেষে বিরক্ত হয়ে বললেন, আজ যথেষ্ট হয়েছে বাচ্চু, তুই আবার কাল সালাম দিস, কিংবা সারাজীবন না দিলেও চলবে। হুজুর অবশ্য আবারও বাচ্চুর বাবাকে নালিশ করেছিলেন এবং সে ঘটনা আরও হাস্যকর।
যে কথা বলার জন্য ঘটনাটার অবতারণা তা হলো শ্রদ্ধাবোধ শেখানোর কোনও কৌশল থাকে না। যারা শেখার চারপাশ দেখেই শিখে নিতে পারে। আচার-ব্যবহার এমনই একটি বিষয় যা পারিপার্শ্বিক ও সামাজিক রীতিনীতির অংশ। এটা বুঝিয়ে বলার কিছু নেই। আমাদের রাজনীতিতে এই আচরণ বেশ আগে থেকেই আত্মকেন্দ্রিক ও দোষাক্রান্ত হয়ে পড়েছে। কে কাকে কখন কীভাবে কথা দিয়ে ঘায়েল করবে সেই প্রতিযোগিতাই মুখ্য। তাতে নিজের সম্মান বিসর্জিত হতে পারে সেদিকে ভ্রূক্ষেপ করারও অবসর নেই। কিছুদিন আগে বিএনপি চেয়ারপার্সন একজন পুলিশ অফিসারকে মিডিয়ার সামনে ‘গোপালী’ বলে সম্বোধন করেছেন। সেই পুলিশ অফিসারের লাভ-ক্ষতির হিসেব কেউ করেনি কিন্ু্ত প্রকাশ্যে অনেকেই বিএনপি নেতার সমালোচনা করেছেন এবং কেউ কেউ তাঁকেই ‘গোলাপী’ আখ্যায়িত করেছেন। বেগম জিয়া এখনো সভা-সমাবেশে সরকার পতনের কথা বলছেন এবং এই সরকারকে অবৈধ বলছেন। সকলের সামনে একটি নির্বাচন হলো এবং সরকার গঠিত হলো তারপর ‘অবৈধ’ বলার সুযোগ থাকে কী করে? মানলাম দেশের সব লোক ভোট দিতে যায়নি, মানলাম খুবই কম সংখ্যক ভোট কাস্ট হয়েছে, কিন্ু্ত নির্বাচন তো হয়েছে। যে বা যারা এই নির্বাচনে অংশ নেয়নি, এটা তাদের ব্যর্থতা। নিজের ব্যর্থতাকে অন্যের ঘাড়ে চাপিয়ে আবার দেশকে অশান্তির দিকে ঠেলে দেবার পাঁয়তারা চলছে। আমরা যারা সাধারণ মানুষ রাজনীতি করি না, রাজনীতির খাই-পরি না, তাদের জন্য এটা খুবই অশুভ সংবাদ।
যারা রাজনীতি করেন তারা আমাদের কথা কতটা ভাবেন বুঝতে পারি না। কোন মন্ত্রী বলছেন উপজেলা নির্বাচনে বিএনপি কেন অংশ নিচ্ছে যারা জাতীয় নির্বাচনে অংশ নেয়নি? কোন মন্ত্রী বলছেন চাঁদা তুলে টি-২০ বিশ্বকাপের খরচ সঙ্কুলান করা হবে। একজন প্রাক্তন মন্ত্রী বলেছেন নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি বলে তিনি জিততে পারেননি, পাশাপাশি তিনি জিয়াউর রহমানেরও প্রশংসা করেছেন অথচ মন্ত্রী থাকাকালে বলেছিলেন জিয়াউর রহমান কোন্ সেক্টরে যুদ্ধ করেছেন তা তাঁর জানা নেই। সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদ সাহেব কখন কী বলেন তা তিনি নিজেও জানেন কি না সন্দেহ— এ বিষয়ে মন্তব্য নিষ্প্রয়োজন। বিএনপি নেতাদের কেউ কেউ যে-ভাষায় সরকারের সমালোচনা করছেন সেই ভাষাটাকে কদাকার বলবো নাকি অমার্জনীয় বলবো ভেবে পাই না।
রাজনীতিতে নাকি শেষ কথা বলে কিছু নেই। শেষ কথা না থাক— যতো কথা হোক সবই সৌন্দর্যমণ্ডিত হতে পারে, চিত্তাকর্ষক হতে পারে, মঙ্গলজনক হতে পারে। কিন্তু আমরা তা শুনতে পাই না। বিশ্ব নারী দিবসে মহিলা দলের দিবস পালনে বাধা দেয়া হলো কেন সেটাও বুঝা গেলো না। মুখের ভাষা এ রকম থাকে, সন্ত্রাসী যে দলেরই হোক তাকে গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনা হবে। কিন্ু্ত সরকারি দলের ক্যাডাররা যখন প্রকাশ্যে অস্ত্র হাতে রাস্তায় নামে তখন পুলিশেরও নীরব ভূমিকা পালন করতে দেখা যায়। কিছুদিন আগে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনা দেখেছি, আবার দেখলাম গাজীপুরের শ্রীপুরে। জাতীয় দৈনিকগুলোতে অস্ত্রসহ ছবি ছাপা হয়, টিভিতে সচিত্র সংবাদ পরিবেশিত হয় অথচ কার্যকর ভূমিকা নিতে দেখা যায় না। এ ব্যাপারে অবশ্য সরকারের দায়িত্ব অনেক বেশি। কথা না বলেও জনগুরুত্বপূর্ণ এই কাজগুলো করা সম্ভব। তাদেরকে আইনের আওতায় নিতে প্রধানমন্ত্রীর প্রচ্ছন্ন ইঙ্গিতই যথেষ্ট বলে মনে করি। ছাত্রশিবির হোক, ছাত্রদল হোক, ছাত্রলীগ হোক আর জঙ্গি হোক, সন্ত্রাসী হলে কাউকে ছাড় না দেয়া সরকারের দায়িত্ব।
আমাদের বাংলাদেশকে আমরা অনেক উচ্চে দেখতে চাই বলে অনেক সময় আমরা আবেগে কথার খেই হারিয়ে ফেলি। যারা রাষ্ট্র পরিচালনা করেন সেইসব রাজনীতিবিদদের প্রতি কোন ক্ষোভ নেই, কোন হিংসা নেই, ঈর্ষা নেই— শুধু দেশাত্মবোধের জায়গাটিতে আরো সচেতন হওয়ার ব্যাপারে ছোটখাট ত্রুটিগুলো শোধরানোর কথা বলা হচ্ছে। আমরা এমন একটি ভিত ও ভিত্তি চাই যেখানে দাঁড়িয়ে বুকের ছিনা টান করে বলতে পারি, ‘আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি’।
লেখক : শিশু সাহিত্যিক ও কবি
