দায়িত্বহীনতার বলি

আপডেট : ১৩ মার্চ ২০১৪, ২১:১৫
আবারও রেলওয়ের লেভেল ক্রসিং-এ দায়িত্বহীনতার বলি হইয়াছে চারটি তরতাজা প্রাণ। আহত হইয়াছেন আরও ৭ জন। হতাহতদের সকলেই পোশাক কারখানার শ্রমিক। কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তাহারা এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনার শিকার হন। ঘটনাটি ঘটিয়াছে গত মঙ্গলবার সকালে বন্দরনগরী চট্টগ্রামের চান্দগাঁও-এর আউটার সিগন্যাল রেলক্রসিংয়ে। সিগন্যালটি অবৈধ বা অননুমোদিত হইলে হয়তো কিছু একটা অজুহাত দেখানো যাইত। কিন্তু রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট সূত্র ইত্তেফাককে ইহা নিশ্চিত করিয়াছেন যে সিগন্যালটি ছিল অনুমোদিত। কিন্তু সেইখানে একাধিক পদ থাকা সত্ত্বেও কোনো গেটম্যানই নিয়োগ দেওয়া হয় নাই। চট্টগ্রামের এতো ব্যস্ততম একটি অনুমোদিত লেভেল ক্রসিংয়ে কেন গেটম্যান নিয়োগ দেওয়া হয় নাই—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই তাহা ভালো বলিতে পারিবেন। অতএব, যাহা হইবার তাহাই হইয়াছে। ট্রেন আসিতেছে জানিয়াও শ্রমিকবাহী মিনিবাসটি তাড়াহুড়া করিয়া অরক্ষিত লেভেলক্রসিং পার হইতে গিয়া নিরপরাধ মানুষগুলিকে ঠেলিয়া দিয়াছে নিশ্চিত দুর্ঘটনার মুখে। বিপর্যয়টি আরও ভয়াবহ হইতে পারিত। তবে সদ্য জান আলী হাট স্টেশন ছাড়িয়া আসা দোহাজারী হইতে চট্টগ্রাম অভিমুখী ট্রেনটির গতি কম থাকায় তাহা এড়ানো গিয়াছে। দুর্ঘটনার কারণ সম্পর্কে পাওয়া গিয়াছে পরস্পরবিরোধী বক্তব্য। বাসটির চালক দায়ী করিয়াছেন রিকশাকে। আর যাত্রীরা জানাইয়াছেন যে চালক তখন কানে হেডফোন লাগাইয়া গান শুনিতেছিলেন। ফলে ট্রেনের চালক বারবার হুইসেল দেওয়া সত্ত্বেও তিনি তাহা শুনিতে পান নাই। আর স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বলিয়াছেন যে রেললাইনে মাটি না থাকায় এই ক্রসিংয়ে প্রায়শ গাড়ি আটকাইয়া যায়। মিনিবাসটির ক্ষেত্রেও তাহাই ঘটিয়াছে। যেইভাবেই দেখা হউক না কেন, ইহা যে সম্মিলিত দায়িত্বহীনতারই অনিবার্য পরিণতি তাহাতে বিন্দুমাত্র সন্দেহ নাই। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ কিংবা বাসের চালক—কেহই এই দুর্ঘটনার দায় এড়াইতে পারেন না। অতএব, শুধু একাধিক তদন্ত কমিটি গঠনই যথেষ্ট নহে, প্রয়োজন অনুরূপ দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাহাতে না ঘটে জরুরি ভিত্তিতে তাহা নিশ্চিত করা। বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে লেভেল ক্রসিংগুলিতে প্রায়শ প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। অধিকাংশ দুর্ঘটনার মূলেই রহিয়াছে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের দায়িত্বহীনতা। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে শুধু পূর্বাঞ্চলেই বৈধ-অবৈধ মিলাইয়া প্রায় এক হাজার লেভেল ক্রসিং রহিয়াছে যেইখানে কোনো গেটকিপার ও পয়েন্টস ম্যান নাই। আরও লক্ষণীয় বিষয় হইল, তন্মধ্যে ৮৪১টিই হইল অবৈধভাবে নির্মিত। ইহা সত্য যে এইসব লেভেল ক্রসিং-এর দায়-দায়িত্ব রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের নহে। কিন্তু কোনো না কোনো কর্তৃপক্ষকে তো ইহার দায়িত্ব লইতে হইবে। হয় যত্রতত্র এই ধরনের লেভেল ক্রসিং নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করিতে হইবে, অথবা যাহারা এই ধরনের ক্রসিং নির্মাণ করিবেন তাহাদিগকেই ইহার নিরাপত্তা বিধানের দায়িত্ব গ্রহণে বাধ্য করিতে হইবে। কিন্তু অনুমোদিত প্রায় দেড়শত লেভেল ক্রসিংই যেইখানে অরক্ষিত, সেইখানে বিড়ালের গলায় ঘণ্টা বাঁধিবে কে? অবিশ্বাস্য হইলেও সত্য যে সর্বশেষ দুর্ঘটনাটি যেইখানে সংঘটিত হইয়াছে সেই ক্রসিংটিতেই গেটকিপারের দুইটি পদ প্রায় অর্ধযুগ যাবত্ শূন্য পড়িয়া আছে। আবার গেটকিপার থাকিলেই যে দুর্ঘটনা বন্ধ হইয়া যাইবে—তাহাই-বা আমরা বলিব কিভাবে? দেখা গিয়াছে যে রাজধানীর মহাখালী, মগবাজার ও সায়েদাবাদসহ বহু ব্যস্ত লেভেল ক্রসিং-এ ট্রেন আসিবার পূর্বে সতর্ক সংকেত বাজাইয়া একাধিক গেট ব্যারিয়ার বা প্রতিবন্ধকতা ফেলিয়াও অধৈর্য যানবাহন ও পথচারীদের থামাইয়া রাখা যায় না। সব সতর্কবার্তা অগ্রাহ্য করিয়া লেভেল ক্রসিং পার হওয়ার এই যে বেপরোয়া প্রবণতা—তাহা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা বা চিত্র নহে। সমাজের সর্বক্ষেত্রে নিয়ম-কানুন তোয়াক্কা না করিবার যে-মানসিকতা চলিয়া আসিতেছে দীর্ঘদিন যাবত্—ইহা তাহারই বহিঃপ্রকাশ মাত্র। এই মানসিকতার পরিবর্তন না ঘটিলে, স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হিসাবে সকলেই স্ব স্ব ক্ষেত্রে দায়িত্বশীলতার স্বাক্ষর রাখিতে না পারিলে, আমরা কেবল হতাহতদের জন্য শোক ও সমবেদনাই প্রকাশ করিয়া যাইব। কিন্তু অপঘাত মৃত্যুর মিছিল থামাইতে পারিব না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন