সিরিয়ায় যুদ্ধাবস্থা চলিতেছে প্রায় তিন বত্সর ধরিয়া। যুদ্ধ বা যুদ্ধাবস্থায় সর্বাধিক বিপদাপন্ন হয় ওই অঞ্চলের শিশুরা। সিরিয়ায় বিপন্ন শিশুর সংখ্যা গত এক বত্সরে দ্বিগুণেরও অধিক বৃদ্ধি পাইয়াছে। তিন বত্সরের যুদ্ধে সেইখানে ১২ হাজারের অধিক শিশু নিহত হইয়াছে এবং বিভিন্ন এলাকায় আটকা পড়িয়াছে অন্তত ১০ লাখ শিশু। তাহাদের জন্য সুরক্ষার ন্যূনতম বর্ম নাই, চিকিত্সা সেবা নাই। মনস্তাত্ত্বিকভাবেও তাহারা সহায়হীন। সব মিলিয়া বিপুল সংখ্যক শিশুর জন্য সিরিয়া এক্ষণে বিশ্বের অন্যতম বিপজ্জনক স্থানে পরিণত হইয়াছে। এই সকল তথ্য প্রকাশ করিয়াছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ। ইউনিসেফের তথ্যানুযায়ী, সিরিয়া যুদ্ধ ৫৫ লাখ শিশুর উপর ভয়ঙ্কর প্রভাব ফেলিয়াছে। তাহা ছাড়া, ব্রিটেনের গবেষণা সংস্থা দ্য অক্সফোর্ড রিসার্চ গ্রুপের একটি রিপোর্ট হইতে জানা যায়, সিরিয়ায় যুদ্ধে ব্যবহূত বিস্ফোরকে মৃত্যু হইয়াছে ৭০ শতাংশ শিশুর। এক-চতুর্থাংশ নিহত হইয়াছে ক্ষুদ্র অস্ত্রের হামলায়। ১০ হাজারেরও বেশি শিশু কেবল গুলি ও বোমার আঘাতেই প্রাণ হারাইয়াছে! তাহার মধ্যে কিছু ঘটনা অতি মাত্রায় নারকীয়। গত বত্সর ২১ আগস্ট রাসায়নিক অস্ত্রের হামলায় বিষক্রিয়ায় শ্বাসরুদ্ধ হইয়া নিহত হইয়াছিল ১২৮ জন শিশু।
ইহা স্পষ্ট যে, পরিস্থিতির আশু পরিবর্তন না ঘটিলে সেইখানকার শিশুদের পরিণতি উত্তরোত্তর আরও ভয়াবহ হইবে। জাতিসংঘ বলিতেছে, শিশুরা যেইসব এলাকায় আটকা পড়িয়াছে, সেইসব এলাকা হয় অবরুদ্ধ, নয়ত সেইখানে মানবিক সহায়তা পৌঁছানো যাইতেছে না। তাহা ছাড়া শিশুদের উপর যুদ্ধের যে ভয়াবহ প্রভাব পড়িয়াছে, তাহাতে প্রায় ২০ লাখ শিশুর জরুরি মনস্তাত্ত্বিক সহায়তা বা চিকিত্সা প্রয়োজন। শরণার্থী হিসাবে বসবাসকারী সিরীয় শিশুদের সব ধরনের শ্রমে নিয়োজিত করা হইতেছে, এবং আরও বিপদের কথা হইল, মেয়ে শিশুদের বেশির ভাগেরই অল্প বয়সেই বিবাহ দেওয়া হইতেছে। অন্যদিকে, যুদ্ধ কী জিনিস, তাহা বুঝিবার পূর্বেই ১২ বত্সরের ছেলে শিশুদের নিয়োজিত করা হইতেছে যুদ্ধক্ষেত্রে। যখন কোনো রাষ্ট্র বা অঞ্চল অস্বাভাবিক পরিস্থিতির ভিতর দিয়া চলিতে থাকে, তখন সময় যেন সেইখানে থমকাইয়া যায়। সিরিয়ার শিশুদের জন্যও গত তিন বত্সর যেন তাহাদের জীবনের দীর্ঘতম সময়। জীবনের বিকাশ নাই, কিন্তু যন্ত্রণার তীব্রতা সবসময় আঘাত করিয়া যাইতেছে তাহাদের স্নায়ুতন্ত্রে। সুতরাং এই ধরনের যুদ্ধাবস্থা ওই রাষ্ট্রের সুদূরপ্রসারি ক্ষতিসাধন করে।
শুধু সিরিয়া নহে, চিরকালই যুদ্ধের সময় নারী এবং শিশুদের উপর নরক নামিয়া আসে। তাহাদের হত্যা করা ছাড়াও, হরহামেশাই যৌন নির্যাতন বা ধর্ষণ করা হয়। যুদ্ধবাজদের মনস্তত্ত্বে দেখা গিয়াছে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ধর্ষণকে তাহারা যুদ্ধের একটি অস্ত্র হিসাবে ব্যবহার করিতে পছন্দ করে। বিশ্বের অনেক দেশে এমনকি ইউরোপেরও কোথাও কোথাও দেখা গিয়াছে, যুদ্ধের সময় অনেক পুরুষ মনে করে ধর্ষণ একটি বৈধ অস্ত্র। এই প্রবণতা এক্ষণে আফ্রিকার অস্থিতিশীল অঞ্চলেও দেখা যাইতেছে। অথচ যুদ্ধের সময় নারী ও শিশুদের উপর যৌন নির্যাতন বিশ্বের অন্যতম ঘৃণ্য অপরাধ হিসাবেই বিবেচনা করা হয়। আমরা নাকি দিন দিন সভ্য তথা মানবিক হইতেছি! কিন্তু যুদ্ধের সময় সমীকরণ নিজের দিকে লইতে সকল নিয়ম বদলাইয়া ফেলা হয়! আমরা তাহা হইলে আর কীসের ‘সভ্য’! শিশুরা দেশ জাতি—সবার; সেই শিশুদের রক্ষা করিতে না পারিলে আমরা কীসের ‘মানুষ’?
