স্মরণ

আরজ আলী মাতুব্বর

আপডেট : ১৪ মার্চ ২০১৪, ২১:১২
আরজ আলী মাতুব্বরের জীবন যেমন ছিল সাদামাটা তেমনি লেখাও ছিল জৌলুসহীন। কাব্যিক অলঙ্কারে হয়তো তাত্ক্ষণিকভাবে কোনো সচেতন পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে পারেনি। তাই আধুনিক পাঠক সমাজকে তাঁকে চিনে নিতে অনেক সময় নিতে হয়েছিল। অনেক বিলম্বে জীবনের প্রায় সায়াহ্নকালে এই লৌকিক দার্শনিকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় হয়েছিল। আরজ আলী মাতুব্বর ছিলেন অপ্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষিত ও মুক্তবুদ্ধির চর্চায় অগ্রসর এক অসাধারণ মানুষ। তাঁর চেতনা ছিল লোকায়ত অথচ বিজ্ঞানসম্মত। তাঁর লেখনীতে নেই শব্দের কোনো ফুলঝুরি কিম্বা ভাষার কোনো অলঙ্কার। কিন্তু প্রাঞ্জল কথনে এবং সরল উপস্থাপনায় তাঁর লেখা ছিল মহিমান্বিত। তিনি অত্যন্ত সরল ও সহজ ভাষায় প্রাণের আর্তিগুলোকে প্রকাশ করে গেছেন তাঁর রচনাসম্ভারে। আরজ আলী মাতুব্বরের জন্ম হয়েছিল বরিশাল শহর থেকে ১০/১২ কি. মি. দূরে লামচরি গ্রামে ১৩০৭ বঙ্গাব্দের (১৯০০ সাল) ৩রা পৌষ। জন্মের চার বছরের মাথায় পিতা এন্তাজ আলী মাতুব্বর মৃত্যুবরণ করেন। আরজ আলীরা ছিলেন পাঁচ ভাইবোন। আরজ আলীর মা লালমন্নেসা বিবি স্বামী হারিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়লেন। অনাহারে অর্ধাহারে দিন কাটতে লাগলো তাঁদের। আরজ আলীর মা মানুুষের বাড়ি কাজ করে কোনোমতে ছেলেমেয়েদের নিয়ে বাঁচার চেষ্টা করতে লাগলেন। এই পরিস্থিতির মধ্যেও আরজ আলী হাল ছাড়েননি। সামান্য অক্ষরজ্ঞানকে সম্বল করেই এবার তিনি ভর্তি হলেন পৃথিবীর মুক্ত পাঠশালায়-যে পাঠশালায় বই কিনতে হয় না, বেতন দিতে হয় না আর ছুটির ঘণ্টাও বাজে না কখনো। আর সেটা হলো বরিশালের পাবলিক লাইব্রেরি, মিশনারিদের দ্বারা পরিচালিত বরিশাল শহরের অন্য একটি লাইব্রেরি এবং বরিশাল বিএম কলেজের লাইব্রেরি। আরজ আলী এই সব লাইব্রেরির নিয়মিত পাঠক হয়ে গেলেন। বিশেষ করে বিএম কলেজের সমৃদ্ধ লাইব্রেরি আরজ আলীকে ভীষণভাবে মুগ্ধ করেছিল। এখানেই এসে পরিচয় হয় কলেজের অধ্যাপক কাজী গোলাম কাদিরের সঙ্গে। এই গোলাম কাদির সাহেব আরজ আলীকে সারাজীবনের সকল ক্রিয়াকর্মেই সহযোগিতা করেছেন। আরজ আলী মাতুব্বর ছিয়াশি বছরের জীবনে প্রায় সত্তর বছর জ্ঞান সাধনা করেছেন। কৈশোরের একটি ঘটনা তাঁকে সত্যসন্ধ করে তোলে। তাঁর মায়ের মৃত্যুর পর মায়ের ছবি তোলার দায়ে মৃতদেহ কেউ জানাজা পড়ে দাফন করতে রাজি হয়নি। শেষে বাড়ির কয়েকজন লোক মিলে তাঁর মায়ের সত্কার করেন। আরজ আলী সামাজিক এই আঘাতের পর সত্য অনুসন্ধানে ব্যাপৃত হন। ধর্মের নামে কুসংস্কার সত্য, না বিজ্ঞানলব্ধ জ্ঞান সত্য? এই জিজ্ঞাসার উত্তর খুঁজতে গিয়ে আরজ আলী বিপুলভাবে ধর্ম, দর্শন ও বিজ্ঞানের গ্রন্থ অধ্যয়ন করেন। বাংলা ভাষায় লিখিত এবং প্রাপ্ত অধিকাংশ গ্রন্থাদি অধ্যয়ন তাঁর জীবদ্দশায় প্রায় বাদ পড়েনি। অভাবের সংসারে বেঁচে থাকার জন্য আরজ আলী এক সময় আমিনের কাজও (জমি জরিপকারী) করেন। লোকের জমি মেপে যে পয়সা পেতেন তা সংসারের খরচ মিটিয়ে বাকি টাকা দিয়ে নিয়মিত বই কিনতেন। এভাবেই তিল তিল করে বই কিনে ১৩৮৬ সালে প্রতিষ্ঠা করেন ‘আরজ মঞ্জিল পাবলিক লাইব্রেরি’। আরজ আলীর রচিত পাণ্ডুলিপির সংখ্যা মোট ১৫টি। এর মধ্যে তাঁর জীবদ্দশায় প্রকাশিত হয়েছিলো ৪টি। এই বইগুলো হলো-সত্যের সন্ধান, অনুমান, সৃষ্টি রহস্য ও স্মরণিকা। এই স্বশিক্ষিত জ্ঞানমনীষা বরিশাল মেডিক্যাল কলেজকে তাঁর মরণোত্তর চক্ষু ও দেহদানের কিছুকাল পরেই ১৩৯২ সালের ১লা চৈত্র আজকের এই দিনে শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করেন। আরজ আলী মাতুব্বরের আজ ২৮তম মৃত্যুবার্ষিকী এ উপলক্ষে তাঁর প্রতি রইলো আমাদের গভীর শ্রদ্ধাঞ্জলি। লেখক :গবেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন