মার্চ মাসকে আমরা স্বাধীনতার মাস বলে গর্ব করি। প্রায় প্রতিটি মাসকেই মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন, নববর্ষ ও নানা কারণে বিশেষায়িত করেছি আমরা। এই আবেগ কি করতে পারে জানি না তবে আগামী প্রজন্মের মনে একটু হলেও দোলা দিয়ে যায়। এমনিতেই বড় অনৈক্য আর বিভ্রান্তি আমাদের। মার্চ মাসের যে চেতনা বা স্মৃতি একাত্তর ও মুক্তিযুদ্ধের আগুনে পুড়ে খাটি হয়ে উঠেছিল আমরা তার চাক্ষুস সাক্ষী। আমাদের কিশোর বেলার সে স্মৃতি পর্যন্ত ধাক্কা খেয়ে যায়। এতো অপপ্রচার এতো মায়াজাল আর বিরোধিতা অন্য কোন দেশ বা জাতির বেলায় সচরাচর চোখে পড়ে না।
সত্যকে মিথ্যা, মিথ্যাকে সত্য করার রাজনীতি আমাদের চোখে ঠুলি পরিয়ে রেখেছে। সে ঠুলি কখনো ধর্ম, কখনো জাতীয়তাবাদ, কখনো বা স্বার্থ হয়ে ক্রমাগত অন্ধ করে রাখছে। যে কারণে আজ আর কেউই কিছু ভালোভাবে দেখতে পায় না। দেখতে পেলে স্বাধীনতার মাসে মুক্তিযুদ্ধের গর্বে স্ফীত রাজনৈতিক শক্তি বিশ্বকাপের উদ্বোধনীতে নিজেদের চারিত্র ও স্বকীয়তা বজায় রাখতে ভুল করতো না। জানি এটা বিশ্বায়নের যুগ, আজকাল দূরত্ব বা ভৌগোলিক ব্যবধানও বড় কিছু নয়। তাছাড়া এক জাতি অন্য জাতি বা এক দেশ অন্য দেশ থেকে নেবে বা দেবে এটাই স্বাভাবিক। সেভাবেই বড় হয়ে উঠেছে সভ্যতা। ইউরোপ যখন আমাদের বিজ্ঞান প্রযুক্তি বা সভ্যতা দিয়েছে আমরা দিয়েছি প্রাকৃতিক ভালোবাসা, স্নিগ্ধতা ও সংস্কৃতি। আফ্রিকা যখন তার আপন প্রকৃতি, খনি, সম্পদ ও নিজের কালো বা বাদামি রং নিয়ে উজ্জ্বল, অন্যরা তাকে দিয়েছে শিক্ষা, জ্ঞান ও সামনে যাবার শক্তি কিন্তু কোন বিনিময়ই কোনকালে সীমানা ছাড়িয়ে সীমারেখা ছাড়িয়ে যায়নি। যেগুলো গিয়েছে সেগুলো বিনিময় বা লেনদেন হয়নি, হয়েছে আধিপত্য কিংবা জোর জবরদস্তি। বলাবাহুল্য, কোন জবরদস্তিই চিরকালীন কিছু নয় বরং এক সময় তা উভয়পক্ষের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। আমাদের জাতীয় চরিত্রের একটি বড় বৈশিষ্ট্য নিজেদের প্রতি সুবিচার না করা, ভাষা শহীদ থেকে বঙ্গবন্ধু, বায়ান্ন থেকে একাত্তর এমনকি সাম্প্রতিক সময়ের অর্থনৈতিক অর্জন কিংবা সমাজপ্রগতি কিছুই ঐক্যবদ্ধ রাখেনি আমাদের। সুবিচার দূরে থাক অন্তর্কলহে আত্মসম্মান বিসর্জনেও আমরা আছি এগিয়ে। নিজেদের ভেতর এই সংঘাত, অনৈক্য বা ফাটল থাকলে অন্যরা সুযোগ নেবে এটাই স্বাভাবিক। মুক্তিযুদ্ধ যত বড়, যত বিশাল ক্যানভাসই হোক না কেন বাংলাদেশিরা তার তলায় একত্রিত থাকতে পারেনি। কেউ বলেন ধর্ম, কারো মতে সম্প্রদায়গত বিভেদ, কারো অভিমত রাজনৈতিক বিদ্বেষে তা হয়নি। যে কারণেই হোক, না হবার দায় আমাদের সকলের। আশ্চর্য এই বিষয়ে কেউ কিছু বলে না, বললেও তা একপেশে। তেতাল্লিশ বছরে নিজেদের মেরুদণ্ড কেন বাঁকা বা কিভাবে তা সোজা করে চলা যায় সেটাই জানা হলো না আমাদের। যে কারণে আমাদের বিশ্বকাপ উদ্বোধনী অনুষ্ঠান মাতিয়ে যায় প্রতিবেশী। দুঃখজনকভাবে আমরা ভারত-পাকিস্তানের প্রভাব মুক্ত হতে শিখিনি। বঙ্গবন্ধু ও চার জাতীয় নেতার মৃত্যুর পর আত্মবিধ্বংসী রাজনীতি পাক-ভারতের দড়ি টানাটানিতে মত্ত হয়ে ওঠে। সে থেকে আজ অবদি এই রশি টানাটানি থামেনি। এক দিকে অন্ধ পাক উন্মাদনা অন্যদিকে ভারত প্রীতি। ঐতিহ্যগত কারণে পাকিস্তানিদের সাথে গান-বাজনা বা সংস্কৃতি মেলে না। মিললে এ বিষয়েও যুদ্ধ হতো, দু’ভাগে বিভক্ত হয়ে যেতাম আমরা। এ এক অদ্ভূত মানসিকতা। বাংলাদেশের দুর্ভাগ্য বড় মেধাশ্রমে মাটি ভিজিয়ে তার উত্থানের পরও আমরা নিজেদের চিনতে পারছি না।
ওয়ার্ল্ডকাপ বা বড় যে কোন আয়োজনের দুটো উদ্দেশ্য থাকে। একটি তার সার্থকতা অন্যটি এর ভেতর দিয়ে নিজেদের দেশ ও জাতির পরিচয় উন্মোচন। এতো বড় ইভেন্ট এ দেশে হবে ভাবা যেতো না একসময়। আজ হচ্ছে এটাই বাস্তবতা, এই বাস্তবতা কোন দেশ বা কারো দয়ার দানে তৈরি হয়নি। বাংলার মানুষের মেধা ও পরিশ্রমে তৈরি ক্ষেত্রটি কেন অন্যদের দেয়া হবে। কেন নিজেরা তার ফসল ঘরে তুলতে ব্যর্থ হবে? মেঘে মেঘে বেলাতো কম হয়নি। আমাদের পরে স্বাধীন হওয়া দেশগুলোও এখন নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে। শক্তি কম বা বেশি সেটা বড় কথা নয়, বড় ব্যাপার আত্মমর্যাদা বোধ।
পৃথিবীর ক্ষুদ্রতম দেশ ভাটিক্যান। ক্ষুদ্র একটি রাষ্ট্র ভুটান, পর্বতবেষ্টিত জনপদ মঙ্গোলিয়া অথচ দেখুন বিশ্বময় নিজেদের সম্মান ও প্রতীক নিয়ে ঘুরে বেড়ায় তারা। কেউ তাদের গৈরিক ভুষণ বিশেষ বিশেষ বাদ্যযন্ত্র বা ক্রুশ বাদ দেয়নি। এই যে স্বাতন্ত্র্যবোধ এতেই তারা বিশ্বপরিচিত। সে জাতীয় চেতনা ও আত্মপরিচয় দেয়ার জন্যই এ দেশ স্বাধীন হয়েছিল। তিরিশ লাখ শহীদের সংখ্যাটিও বিতর্কের বাইরে রাখিনি আমরা। সংখ্যা যাইহোক আত্মদান আর ত্যাগের মহিমা কখনো ম্লান হয় না। ম্লান হয় তাদের প্রতি অপমান আর তাচ্ছিল্যে। এই মার্চ মাস শুধু স্বাধীনতা নয় বঙ্গবন্ধুর জন্মের মাসও বটে। সতের মার্চ জন্মেছিলেন ইতিহাসের অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই বাঙালি। তার জন্মদিনকে সামনে রেখে প্রতিবেশি দেশ বা সংস্কৃতির তোষণে তিনি যে আনন্দিত হতেন না সেটা উদ্যোক্তরাও জানেন। তবু তারা অন্য দেশ ভজনায় ব্যস্ত। এর যতগুড় বা মর্মার্থ থাকুক না কেন আসলে আমরা আমাদের অর্জন ও তার বিস্তারে ঐক্যবদ্ধ নই। কেউ এদেশ কেউ ওদেশের হয়ে নিজেদের আখের গোছানোয় ব্যস্ত, পৃথিবীতে মাথা উঁচু করে বাঁচার জন্য পারমাণবিক শক্তি বা অর্থের প্রয়োজন পড়ে না। যাদের তা আছে তাদের দিকে তাকালেই উত্তর মিলবে। সাহিত্য সংস্কৃতি আচার ও উন্নয়ন যাদের ভরসা তাদের মধ্যেই আকাশচুম্বি। সে সামর্থ্য থাকার পরও ভিক্ষাবৃত্তি কিংবা অন্যের দ্বারস্থ হওয়া ব্যক্তির জন্য যতটা ক্ষতির জাতির জন্য তার চেয়ে ভয়ানক, ভয়াবহ রাষ্ট্র ও তার ভবিষ্যতের জন্য। এবোধ বা বিবেক না থাকলে কি করে আগে গড়বে বাংলাদেশ!
( সিডনি থেকে)
