রাশিয়ার ক্রিমিয়া জবরদখলের দায় কি প্রেসিডেন্ট ওবামার উপর বর্তায়? নিশ্চয়ই না, ঠিক যেমনি ন্যাটোর সম্প্রসারণবাদী মনোভাব বা বলকান ও লিবিয়ায় পশ্চিমা শক্তির মোড়লিপনা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উঠেনি। কিন্তু ক্রিমিয়ায় আগ্রাসনের জন্যে ভ্লাদিমির পুতিনকেই সর্বাগ্রে দায় করা যায় তার ঔপনিবেশিক মানসিকতার জন্য। কিন্তু ব্যাপকভিত্তিতে লক্ষ্য করলে দেখা যায়, ক্রিমিয়ায় প্রেসিডেন্ট ওবামার অধীনে মার্কিন পররাষ্ট্রনীতিতে বাস্তবতাবিবর্জিত মনোভাবের প্রকাশ ঘটেছে। বর্তমান বিশ্ব প্রেক্ষাপটে এমন মারাত্মক রাষ্ট্রীয় দুর্বলতার দরুন পরিবর্তন অনিবার্যই বটে।
গত পাঁচ বছর ধরে আমেরিকার জনগণকে এমন ধারণা দেওয়া হচ্ছে যে, দেশের ক্ষুদ্র স্বার্থের জন্য হলেও যে কোন ধরনের যুদ্ধ এড়িয়ে যাওয়াই শ্রেয়। এই বক্তব্য জনমানসেও যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতারই প্রতিচ্ছবি এঁকে দিয়েছে যা পুতিনের মত নেতা যুক্তরাষ্ট্রের দুর্বলতা ব্যতীত অন্যকিছু দেখছেন না। সার্বিক অবস্থার বিবেচনায় পুতিন তার পররাষ্ট্র নীতিতে স্পষ্টতই ‘পুনর্গঠন নীতি’র আবির্ভাব ঘটিয়েছেন বা ঘটাতে যাচ্ছেন।
নতুন যে কৌলশগত চুক্তিগুলো সম্পাদিত হয়েছে সেখানে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র অস্ত্র হ্রাসের ক্ষেত্রে একরকম বাধ্য হলেও রাশিয়া নিজের জায়গায় রয়েছে অটল। কোন কোন ক্ষেত্রে অস্ত্রের ব্যবহার এবং উত্পাদন হ্রাস করণে রাজি হলেও তা ছিল যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় অনেক কম। কিন্তু ওবামা তাঁর হ্রাসকরণ এবং নমনীয় নীতিতে রয়েছেন অবিচল।
অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে ওবামা তাঁর পররাষ্ট্রনীতি ইউরোপের বাইরে বাস্তবায়ন করতে ব্যর্থ। আফগানিস্তানে এবং ইরাক থেকে ক্রমাগত সৈন্য প্রত্যাহার, প্রতিরক্ষা বাজেটের ঘাটতি, মিশনে সফলতার চেয়ে যবনিকাপাত ঘটানোকেই শ্রেয় মেনে নিয়েছেন প্রেসিডেন্ট ওবামা। ফলে চীন এবং ইরান কোন ক্ষেত্রেই আমেরিকাকে ছেড়ে কথা বলেনি। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের ‘রেড লাইন’ অতিক্রমও ছিল মার্কিন নীতির দুর্বলতার ফল।
ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার আগ্রাসন দৃশ্যমান কারণেই ঘটেছে। প্রেসিডেন্ট পুতিন স্বচক্ষে সোভিয়েত ইউনিয়নের পতন দেখেছেন। রাশিয়ার পার্শ্ববর্তী ইউক্রেনকে তিনি ‘সীমান্ত প্রতিবেশী’ বিবেচনা করেন। তিনি যে কোন মূল্যেই প্রতিবেশী দেশগুলোর উপর প্রভাব রাখতে চাইবেন, এটাই যৌক্তিক।
পুতিনের ক্রিমিয়া আগ্রাসনের সবচেয়ে বিপজ্জনক দিক হলো এটা ক্রমবর্ধমানভাবে বিশ্বরাজনীতিতে আমেরিকার প্রভাবকে ক্ষুণ্ন করবে। আগ্রাসী অন্যান্য পক্ষও নতুন উদ্যম পেতে পারে। এক্ষেত্রে চীনের জাতীয়তাবাদী, আল কায়দার সন্ত্রাসী গোষ্ঠী এবং ইরানের ধর্মীয় তাত্ত্বিকগণ সবচেয়ে বড় উদাহরণ। ক্রিমিয়াই হওয়া উচিত মার্কিন নেতৃত্ব পুনরুদ্ধারের ক্ষেত্র। এক্ষেত্রে মূলত দুই ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ বাঞ্ছনীয়। প্রথমত, সংকট নিরসন যা খুবই জরুরী। পূর্ব ইউরোপ এবং বাল্টিক রাষ্ট্রগুলির মধ্যে আমাদের বন্ধুদের সহায়তায় রাশিয়াকে আমাদের সামর্থ্যের জানান দেওয়া, যাতে অবস্থা আরও প্রকট না হয়। তবে এর মানে এই নয় যে সামরিক শক্তি রাশিয়ার বিরুদ্ধে প্রেরণ, এটা বরং ঐ অঞ্চলে ন্যাটো সদস্যদের উপস্থিতি বাড়ানো এবং গ্রুপ-৮-এর সম্মেলন বয়কট করারই নামান্তর। রাশিয়াকে বাদ দিয়ে গুপ ৭ নামে অন্য কোথাও এ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হতে পারে।
ইউক্রেনের দেশপ্রেমিক নাগরিকদের পাশে দাঁড়াতে হবে আমাদের। সামরিক এবং বেসামরিক নাগরিকদের, যারা তাদের দেশকে অন্য রাষ্ট্রের আগ্রাসী ভূমিকায় আক্রান্ত হতে দিতে চায় না, তাদের সহায়তা করতে হবে, পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে দ্রুত। বিদ্যমান অবস্থাটি ইউক্রেনের জন্যও পূর্ণ স্বাধীনতার সুযোগ এনে দিয়েছে, এনে দিয়েছে রাশিয়ার প্রভাবমুক্ত হওয়ার। ইউক্রেনের নেতৃবৃন্দকে সার্বিক ঐক্যের ডাক দিতে হবে। এক্ষেত্রে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের পক্ষগুলোর পদক্ষেপ মার্কিন সহায়তার চেয়েও বেশি জরুরী।
পক্ষান্তরে, ইউক্রেনে পুতিনের মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনার অপচেষ্টা রোধে নিজেদের নৈতিক ও কৌশলগতভাবে অস্ত্রসজ্জিত করা উচিত। প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার কণ্ঠে ধ্বনিত হয়েছে যে, আমেরিকা কোনরূপ প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নেই। কিন্তু পুতিন এটাকে স্পষ্টতই একটি প্রতিযোগিতা বিবেচনা করেছেন। তিনি হয়তো ভাবছেন, একটি রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি পরিবর্তিত বিশ্বে কি করে বাস্তবতা বিসর্জন দেয়?
প্রেসিডেন্ট পুতিন ক্ষমতায় বা ক্ষমতার বাইরে সবসময় মার্কিন বিরোধী ছিলেন এবং থাকবেন। পুতিনের অধীনে রাশিয়া মহাক্ষমতাধর নয়। তাছাড়া তার অধীনে সেখানে চলছে একনায়কতন্ত্র। শেষ পর্যন্ত তার অবস্থা ভিক্টর ইয়ানকোভিচের মত হয়ে যায় কিনা সেটাও দেখার বিষয়। জনগণই একসময় তার বিরুদ্ধাচরণ করবে। আমরা সেইদিনের অপেক্ষায় রয়েছি। রাশিয়ার জনগণকে আমরা বোঝাতে সক্ষম হবো যে পুতিনের ক্ষমতাকালে দেশের সবচেয়ে দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তারা আঞ্চলিক অর্থনৈতিক জোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে।
সম্ভব সকল কিছুই করতে সচেষ্ট থাকতে হবে আমাদের। ইউক্রেনের গণতান্ত্রিক ধারা যে জনকল্যাণ বয়ে নিয়ে আসবে তা এখন ঐ অঞ্চলের সবাই বিশ্বাস করেন। পুতিনের রাশিয়া যেন কোনভাবেই তার ঔপনিবেশিক স্বপ্ন পূরণ করতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে আমাদের।
আমেরিকার সবচেয়ে বড় শক্তি হলো, দেশটি সর্বদা সার্বিক সহায়তা এবং মানবিক উন্নয়নে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছে। কাজেই কোনভাবেই কোন অপশক্তি যেন মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে সক্ষম না হয় তা দেখভালের দায়িত্ব আমাদের সকলের। তবে এক্ষেত্রে প্রয়োজন বাস্তববাদী চিন্তার প্রসার, দরকার নেতৃত্বের সাবলীলতা। যদি ক্রিমিয়া আমাদের জাগাতে না পারে তাহলে ভবিষ্যত্ ঠিক কি হতে পারে, তা ভেবে আমি শঙ্কিত।
দ্য নিউইয়র্ক টাইমস থেকে ভাষান্তর: সোহেল রানা
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের সাবেক প্রেসিডেন্ট পদপ্রার্থী এবং অ্যারিজোনা রাজ্যের রিপাবলিকান সিনেটর।
