পদ্ধতিগত শিক্ষার বেড়াজালে আবদ্ধ মৌলিক শিক্ষা

আপডেট : ১৬ মার্চ ২০১৪, ২২:১৪
শিক্ষা হলো শিক্ষার্থীর সমাজ কাঙ্ক্ষিত আচরণের তুলনামূলক স্থায়ী পরিবর্তন যার মাধ্যমে সে পরিবর্তিত সামাজিক পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে চলতে পারে। অর্থাত্ নিজেকে সুন্দরভাবে উপস্থাপন হলো এক ধরনের শিক্ষা। আর এই উপস্থাপনের নিজস্ব কিছু বিচক্ষণতা থাকতে হবে, নিজস্ব কিছু সক্রিয়তা থাকতে হয়, নিজস্ব কিছু কৃত্রিমতা থাকতে হয়। আর এগুলোই হলো সৃজনশীলতা। এই বিচক্ষণতা বা সক্রিয়তা বা কৃত্রিমতা অর্থাত্ সৃজনশীলতা এদের বেশির ভাগই আয়ত্ত করতে হয় বা অর্জন করতে হয়। আর এই অর্জন পুঁথিগত বিদ্যায় হয় না। অর্জন করতে হয় প্রকৃতি থেকে, অর্জন করতে হয় আকাশের বিশালতা দেখে, অর্জন করতে হয় ফুলের সুরভিত শোভা থেকে, অর্জন করতে হয় ইতিহাস থেকে, অর্জন করতে হয় স্মৃতিচারণ শুনে,অর্জন করতে হয় একে অন্যের সাথে শেয়ার করে, অর্জন করতে হয় পরিদর্শন করে সর্বোপরি অর্জন করতে হয় বাস্তবতা দেখে। আর এই অর্জনের বেশির ভাগ উপাদানই শিক্ষার্থীদের স্ব স্ব শিখনের অন্তর্ভুক্ত নাও হতে পারে। আর তাই সিলেবাসের বাইরে থেকে শিক্ষা নিয়ে বা অর্জন করে সিলেবাসের সাথে একত্রীভূত করে যে অর্জন সেটাই হলো মৌলিক শিক্ষা। অর্থাত্ শিক্ষার সবগুলো উপাদান এখানে উপস্থিত থাকা জরুরি। তাই আমরা উপলব্ধি করতে পারলাম অর্জনের সকল উপাদান শিক্ষার সহ-উপাদান হিসাবে পরিগণিত। এসব উপাদানই হলো সহশিক্ষা কার্যক্রম। যা শিক্ষার্থীকে সৃজনশীল হতে শেখায়, নিজে নিজে সৃষ্টি করতে শেখায়, নেতৃত্ব দিতে শেখায়, কিছু অজানাকে জানতে উদ্বুদ্ধ করে, নতুন নতুন সৃষ্টিতে আকৃষ্ট করে। আর সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত সকল শিক্ষাই হলো পদ্ধতিগত শিক্ষা। যা পড়ে পড়ে আয়ত্ত করতে হয় বা চর্চা করতে হয়। এসব শিক্ষা কার্যক্রম ছাত্রছাত্রীদের স্কুল বা কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রত্ব থাকা অবস্থায় অর্জন করতে হয়। আমাদের বর্তমান শিক্ষা ব্যবস্থা সৃজনশীল হলেও এই সহশিক্ষা কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করতে ছাত্রছাত্রীদেরকে আমরা কতটুকু উদ্বুদ্ধ করি। ছোটবেলায় আমরা দেখেছি বেশির ভাগ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশাল মাঠ ছিল, বড় বড় পুকুর ছিল, পুকুরের পাড়ে সারি সারি গাছ ছিল, মুসলিম ছাত্রছাত্রীদের নামাজ পড়ার জায়গা ছিল, দূর-দূরান্তের ছাত্রছাত্রীদের পায়ে হেঁটে স্কুলে আসার অভ্যাস ছিল। পাশাপাশি বিভিন্ন জাতীয় ও আন্তর্জাতিক অনুষ্ঠানাদি পালন করার একটি রেওয়াজ ছিল। বিশেষ করে ২১ ফেব্রুয়ারি মাতৃভাষা দিবস এখন আন্তঃমাতৃভাষা দিবস, বিজয় দিবস, শহীদ দিবস। এসব দিবসসমূহ ঢাকঢোল পিটিয়ে আয়োজন করা হতো। আলোচনা অনুষ্ঠান ছিল, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ছিল। এসব অনুষ্ঠান থেকে ঐসব দিবসের তাত্পর্য উপলব্ধি করা যেত। সকালবেলায় পিটিতে দাঁড়িয়ে রাখা হতো। তা থেকে শৃঙ্খলাবোধ শিখা যেতো। সারি সারি গাড়ির বহর সাজিয়ে শিক্ষা সফরে যাওয়া হতো। ছাত্রছা্ত্রীরা নিজেরা তা আয়োজন করত। তা থেকে ভ্রমণের উপকারিতা, দর্শনীয় স্থান পরিদর্শন, নেতৃত্ব দেয়ার ক্ষমতা, অল্প অল্প চাঁদায় বিশাল আয়োজনের আন্তরিকতা সবই শিখা যেতো। বিভিন্ন ধর্মীয় ও জাতীয় দিবসে রচনা প্রতিযোগিতা ও কুইজ প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হতো। এ সবকিছু ছিল সহশিক্ষা কার্যক্রমের অংশ। তাই আজ আমাদের কোমলমতি ছেলেমেয়েরা প্রযুক্তির অপব্যবহার করে নৈতিক অবক্ষয়ের দিকে ধাবিত হচ্ছে। প্রযুক্তিগত বিষয় বাধ্যতামূলক বিধায় অভিভাবকরা এর থেকে ছেলে-মেয়েদের সরিয়ে আনতে পারছেন না। তাই আমাদের যত সীমাবদ্ধতা থাকুক না কেন সহ-শিক্ষা কার্যক্রমের প্রতি নজর দিতে হবে। তবেই আমরা পাবো আমাদের হারিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের। যাদের মধ্যে থাকবে নৈতিকতা, ন্যায়পরায়ণতা, শৃঙ্খলা, নিয়মানুবর্তিতা, একে অন্যের সাহায্য করার আকাঙ্ক্ষা, সর্বোপরি শিক্ষার পরিপূর্ণ বিকাশ। তাই সহশিক্ষা কার্যক্রম বা বাস্তব শিক্ষার উপর আমাদের আরো বেশি জোর দেয়া উচিত যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দেশকে জানতে পারবে, নিজেদের সংস্কৃতিকে জানতে পারবে, বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিবসসমূহের তাত্পর্য উপলব্ধি করতে পারবে বা তাত্পর্য বুঝতে পারবে। তবেই সমাজ, সভ্যতা, সংস্কৃতি, জাতীয়তা সর্বোপরি স্বাধীনতা ইতাদির উপর আত্মবিশ্বাস প্রতিষ্ঠিত হবে। আর আত্মবিশ্বাস থেকে আত্মোপলব্ধি আসতে পারে। তাই আমরা শিক্ষার ক্ষেত্রে বিচরণ করবো সর্বত্র। জানবো সবকিছু , পড়ব বাস্তবতার সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে। তবেই পাবো সৃজনশীলের সার্থকতা। বাংলাদেশের শিক্ষাবিষয়ক বিশ্বব্যাংকের এক পর্যালোচনা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “উর্বর মাঠে বীজ বোনো”। প্রতিবেদনে আরো বলা হয়েছে যে, শিক্ষার গুণগত ঘাটতিতেই শিক্ষার্থীর দক্ষতার কমতি। তাই যখন সেটা প্রয়োজন তখন সেটা করা জরুরি। অর্থাত্ মৌলিক শিক্ষার আগে পদ্ধতিগত শিক্ষা ছাত্রছাত্রীদের মূল শিক্ষাকে সংক্ষিপ্ত করে তোলে। তাই আগে মৌলিক শিক্ষা, পরেই হবে পদ্ধতিগত শিক্ষা। আর মৌলিক শিক্ষার মূল উপাদান হলো সহ-শিক্ষা কার্যক্রম। যা থেকে শুধু মৌলিক শিক্ষাই নয়, মনের ভিতর এক ধরনের আনন্দ সৃষ্টি হয়। যা উদ্দীপনা যোগায়। আর এই উদ্দীপনা থেকে খুব সহজেই উদ্দীপক হয়ে যাবে। William Shakespeare বলেছেন, “The miserable have no other medicine but only hope”. অর্থাত্ হতভাগ্যদের জীবনে অন্য কোন ওষুধ নেই শুধু আশা ছাড়া। যদিও আমরা হতভাগ্যদের দলে অন্তর্ভুক্ত নই। যুগের সাথে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার অনেক পরিবর্তন হলেও গুণগত মান নিয়ে আমরা এখনো আশাবাদী। যার স্বাক্ষর আমরা অনেক আগেই রেখেছি। তাই মৌলিক শিক্ষাকে উপেক্ষা করে পদ্ধতিগত শিক্ষার গুণগত মান কতটুকু বুদ্ধি পাবে তা এখনই ভাববার বিষয়। তবে সভ্যতার উন্নতিতে পদ্ধতিগত শিক্ষাও জরুরি।  লেখক :প্রভাষক, ব্যবস্থাপনা বিভাগ, নিকুঞ্জ মডেল কলেজ, খিলক্ষেত, ঢাকা