ক্রিমিয়া নিয়ে চলমান সংকট ক্রমেই ঘনীভূত হচ্ছে। বার্তা সংস্থা সি. এন. এন. পরিবেশিত সর্বশেষ খবরে বলা হয়েছে শুক্রবার সকালে কৃষ্ণসাগরের কাজাছায়া উপকূলবর্তী সেভাস্তপল বন্দরে রুশ যুদ্ধ জাহাজ ইয়ামাল ১৫৬ থেকে সাঁজোয়া যান, এ.পি.সি., গোলাবারুদ বহনকারী ট্রাক ও সৈন্য নামানো হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, শক্তি বৃদ্ধির আসল উদ্দেশ্য ১৬ তারিখের গণভোট পরবর্তী পরিস্থিতি সামাল দেয়া। সংকটের শুরুতে রাশিয়া বলেছিল ক্রিমিয়া ইস্যুতে তারা কোন সংঘাত চায় না। তাদের লক্ষ্য ক্রিমিয়ায় বসবাসকারী রুশ নৃগোষ্ঠীর নিরাপত্তা বিধান করা। কিন্তু সময় যতই গড়াচ্ছে ততই বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, রাশিয়া ক্রিমিয়াকে তার মূল ভূখণ্ডের সাথে একীভূত করতে চায়। ইউক্রেনের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী মূল ভূখণ্ড এবং স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চলের মৌলিক কাঠামোগত যে কোন পরিবর্তনের জন্য শুধু সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে নয়, সারা দেশেই গণভোট আয়োজনের দরকার হবে। অর্থাত্ ক্রিমিয়ার ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য ইউক্রেনের জনগণেরও সন্মতি দরকার। রাশিয়ার দাবি হল সংবিধানে এই ধারা সংযোজনের ক্ষেত্রে স্বায়ত্তশাসনের মূল চেতনাকে পাশ কাটিয়ে যাওয়া হয়েছে।
ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট বিবেচনা করলে রাশিয়ার এই পরিকল্পনাকে অনৈতিক বলে আখ্যায়িত করা কঠিন। রাশিয়ার সাথে ক্রিমিয়ার নৃতাত্ত্বিক এবং ভূ-রাজনৈতিক সম্পর্ক অনেক পুরাতন। ১৮ শতকের মাঝামাঝি ক্রিমিয়া যখন স্বেচ্ছায় রুশ সাম্রাজ্যের শাসনাধীনে আসে। ১৯২১ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নে যোগ দেয় ক্রিমিয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাবার পর একটি স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসেবে ইউক্রেনের সাথে যুক্ত হয়। ছাব্বিশ হাজার বর্গ কিলোমিটার আয়তন ও কুড়ি লক্ষ জনসংখ্যা অধ্যুষিত এই উপদ্বীপে বসবাসকারী মানুষদের শতকরা প্রায় ৬০ জন রাশিয়ান নৃগোষ্ঠী থেকে আগত। ২৪ ভাগ ইউক্রেনিয়ান এবং ১২ ভাগ তাতার মুসলিম।
ক্রিমিয়ার পার্লামেন্ট রুশ বংশোদ্ভূত সদস্যদের নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে। ফলে কোনরকম বিরোধিতা ছাড়াই কয়েকদিন আগে সেখানে স্বাধীনতার প্রস্তাব পাস হয়েছে। বিপক্ষে ভোট দিয়েছেন মাত্র দুই জন সদস্য। কিন্তু সমস্যটা অন্যখানে। আন্তর্জাতিক আইনে রাষ্ট্রীয় অখণ্ডতা এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের বিষয় দুটি বেশ গোলমেলে। জাতিসংঘ সনদেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোন বিধি-বিধান নেই। কারণ কোন একটি নির্দিষ্ট অঞ্চলের মানুষ সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামতের ভিত্তিতে স্বাধীনতার দাবি তুললে সেটা যদি মেনে নেয়ার বিধান করা হয় তাহলে পৃথিবীব্যাপী এক অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে; আবার মানা না হলে জনআকাঙ্ক্ষার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করা হবে।
কসভোর স্বাধীনতা ঘোষণাকে আন্তর্জাতিক আদালত এইবলে বৈধ ঘোষণা করেছিল যে, এই ঘোষণায় ঐ অঞ্চলে বসবাসকারী সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের মতামত প্রতিফলিত হয়েছে। ধরে নেয়া যায় ১৬ মার্চের গণভোটে ক্রিমিয়ার জনগণ স্বাধীনতার পক্ষেই মতামত দেবে। যুক্তরাষ্ট্র ও তার ইউরোপীয় মিত্ররা এটা ভাল করেই জানে। তাদের যুক্তি হল যেহেতু ১৯৯৪ সালে রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের মধ্যে স্বাক্ষরিত বুদাপেস্ট সমঝোতা স্মারকে ক্রিমিয়াকে অন্তর্ভুক্ত করে ইউক্রেনের অখণ্ডতা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়া হয়েছে, সেহেতু এই গণভোটই অবৈধ। সংকট শুরুর প্রথম থেকেই তারা এই বিষয়টি বলে আসছে।
ইতোমধ্যে কয়েকবার অবরোধ আরোপের কথা বলা হয়েছে। এক্ষেত্রে পশ্চিমা বিশ্বকে মনে রাখতে হবে যে, রাশিয়া এবং লিবিয়া বা ইরানকে এক পাল্লায় মাপা যাবে না। অবরোধ আরোপ করলে দেশটি অর্থনৈতিকভাবে নাজুক অবস্থায় পড়বে তাতে সন্দেহ নেই।
তাহলে প্রকৃত পরিস্থিতিটা আসলে কী? কোনরকম সংঘাত-সংঘর্ষ ছাড়াই কী ক্রিমিয়া রাশিয়ার মধ্যে বিলীন হয়ে যাবে ? হ্যাঁ বাস্তব অবস্থা আসলে সেরকমই। তাহলে ইউরোপ-আমেরিকা এই ইস্যুতে এত সোচ্চার কেন? তারা যদি ক্রিমিয়ার পরিণতি মেনে নিয়েই থাকে তাহলে চুপ করে থাকলেই পারে! সে রকমটি ঘটছে না সম্ভবত একারণে যে, তাতে তাদের মিত্ররা নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে শুরু করবে। এরকম একটা আগ্রাসনকে (?)বিনা বাক্য ব্যয়ে মেনে নিলে তা একটা খারাপ উদাহরণ সৃষ্টি করবে। আঞ্চলিক পরাশক্তিগুলো ক্ষুদ্র প্রতিবেশীদের দিকে লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাতে শুরু করবে।
তাই পশ্চিমা বিশ্ব তাদের গলার স্বর ততটুকুই উঁচু করে রেখেছে যতটুকুতে তাদের সন্মান বাঁচে এবং কোন সামরিক সংঘাতে জড়াতে না হয়। অতএব ক্রিমিয়া নিয়ে যে রাজনৈতিক সংকট দেখা দিয়েছে তার একটা আপাত সমাধান আগামী কয়েক মাসের মধ্যেই হয়ে যাবে বলে আশা করা যায়। তবে এটাও ঠিক যে, খুব সহজে এর সমাপ্তি ঘটবে না। বরং এই ক্ষুদ্র বৈরিতাই দুই পরাশক্তির মধ্যে দ্বিতীয় স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা করতে পারে।
লেখক :কানাডা প্রবাসী গণমাধ্যম গবেষক
ইমেইল :hassangorkii¦yahoo.com
