রাজনৈতিক নেতাদের সুসম্পর্ক

আপডেট : ১৭ মার্চ ২০১৪, ২১:৪০
আদর্শগত মতপার্থক্য সত্ত্বেও রাজনৈতিক নেতাদের পারস্পারিক সুসম্পর্ক রাখা জরুরি । এই আপ্তবাক্য উচ্চারণ করিয়াছেন মহামান্য রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ। তাঁহাকে দেওয়া এক সংবর্ধনার জবাবে তিনি তাঁহার দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনের অভিজ্ঞতার কথা তুলিয়া ধরিয়া বলেন, ‘রাজনৈতিক ও আদর্শগত পার্থক্য থাকলেও আমি সারা জীবন চেষ্টা করেছি রাজনীতিবিদদের মধ্যে সুসম্পর্ক রাখার।’ রাষ্ট্রপতির এই বক্তব্যের তাত্পর্য ও গুরুত্ব অনস্বীকার্য। সমকালীন বাস্তবতায় রাজনৈতিক সম্প্রীতির প্রশ্নটি আরও বেশি প্রয়োজনীয় ও প্রাসঙ্গিক হইয়া যে দেখা দিয়াছে তাহাতেও কোনো সন্দেহের অবকাশ নাই। গণতান্ত্রিক সমাজে ব্যক্তিতে ব্যক্তিতে মত ও পথের ব্যবধান থাকিবে, ইহাই স্বাভাবিক। দেশকালের সকলেই যদি অভিন্ন মত পোষণ করিতেন তাহা হইলে ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শ এবং দল থাকিবার প্রয়োজন হইত না। মুক্ত গণতান্ত্রিক সমাজে এমনটি চিন্তাও করা যায় না। গণতান্ত্রিক সমাজ বিকাশেরও বহু আগে, এখন হইতে চার হাজার বত্সর পূর্বে গ্রিক নাট্যকার ইউরিপিডিস উপলব্ধি করিতে পারিয়াছিলেন যে, অবরুদ্ধ চিন্তার আরেক নাম দাসত্ব। এই উক্তিটি পাওয়া যায় তাঁহার বিয়োগান্তক নাটক ‘ফেনিসিয়ান উইমেন’-এ। দার্শনিক ভলটিয়ার এবং অস্কার ওয়াইল্ড প্রায় একই ভাষায় বলেন, ‘আপনার সহমত আমি পোষণ নাও করতে পারি। কিন্তু আপনার মত প্রকাশের স্বাধীনতার জন্য প্রয়োজনে জীবন দেবো।’ গণতান্ত্রিক বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের যত সমালোচনাই করা হউক না কেন, বাক ও ব্যক্তির স্বাধীনতা দেশটিকে দিয়াছে মহত্বের গৌরব। চিন্তাবিদ নোয়াম চমস্কি এইভাবেই আমেরিকার মহত্বের জায়গাটি চিহ্নিত করেন। চিন্তা তথা মত ও পথের বিভিন্নতার প্রতি সম্মানবোধের অভাব না ঘটিলে দুই বা ততোধিক ব্যক্তি বা রাজনৈতিক নেতার মধ্যেকার পারস্পারিক সম্পর্ক শত্রু মনোভাবাপন্ন হইয়া উঠিতে পারে না। কিন্তু তৃতীয় বিশ্বের সমকালীন বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই এই সত্য প্রতিপন্ন করে না। এইকালে মতাদর্শগত ব্যবধানের কারণে অনেকক্ষেত্রেই রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যে দেখিতে পাওয়া যায় অহি-নকুল সম্পর্ক। ক্ষেত্রবিশেষে একে অপরের মুখদর্শনেও বিব্রতবোধ করেন। বহুক্ষেত্রে পরস্পরের ব্যাপারে তাহারা উত্তপ্ত কড়াইয়ের মত স্পর্শকাতর, সামান্য তেলের ছিটা পড়িলেও ছ্যাঁত্ করিয়া ওঠে। এই পরিস্থিতিতে অল্পেই ভায়োলেন্ট হইয়া ওঠাই স্বাভাবিক। এই অবস্থাটি কিন্তু একদিনে সৃষ্টি হয় নাই। ইহার একটি ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট আছে। ১৯১৭ সালে সোভিয়েত সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব অতঃপর দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধোত্তরকালে স্নায়ু যুদ্ধ প্রবল হইয়া দেখা দেয়। গণতান্ত্রিক সহনশীলতা এবং ঔদার্যের জায়গার অনেকটা জুড়িয়া স্থান করিয়া নেয় সহিংসতা। রেজিমেন্টেড কমিউনিস্ট দেশে ভিন্নমত সহ্য করা হয় না। এবং ধরিয়া নেওয়া হয় যে, দেশের সকলেই সব বিষয়ে একমত পোষণ করেন। দেশে দেশে সেই চিন্তার বিপ্লব সাধন করিবার নিমিত্ত শ্রেণীসংগ্রাম, রক্তের বন্যায় ভেসে যাবে অন্যায়, খতম করো, উত্খাত করো—এই জাতীয় শ্লোগানের মধ্যদিয়া ক্রমান্বয়ে সহিংসতা রাজনীতির অনুষঙ্গ হইয়া দেখা দেয়। কালক্রমে তাহা ভাইরাসের ন্যায় ছড়াইয়া পড়ে। ইহার সংক্রমণ হইতে গণতান্ত্রিক রাজনীতি ও রাজনীতিকগণও রেহাই পান নাই। পরিণামে কেবল বাংলাদেশে নয়, তৃতীয় বিশ্বের প্রায় সকল গণতান্ত্রিক দেশেই বিপরীত মতের রাজনৈতিক নেতাদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক প্রীতিপূর্ণ থাকা প্রায়শই অসম্ভব বলিয়া প্রতীয়মান হয়। অথচ গণতান্ত্রিক সমাজের বড় সৌন্দর্যের জায়গাটিই হইল মত ও পথের ভিন্নতা। পরমত সহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের অহংকার। কিন্তু মত ও পথের ভিন্নতা যখন ব্যক্তিগত বৈরিতার কারণ হইয়া দেখা দেয় তখন গণতন্ত্রের সহজাত সৌন্দর্য ও অহংকার আর অমলিন থাকিতে পারে না। শত্রুতা যে হিংসার সদর দরোজা, তাহা কাহাকেও ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করিয়া বলিয়া বুঝাইবার দরকার পড়ে না। কাজেই সঠিকভাবে সকলে যখন গণতন্ত্রের পাঠগ্রহণ ও রপ্ত করিতে সচেষ্ট হইবেন তখন নানান মতের রাজনৈতিক নেতা ও অনুসারীগণ বৈচিত্র্যের মাঝেও খুঁজিয়া পাইবেন চিরকালীন মানবিক ঐকতান। মহামান্য রাষ্ট্রপতি যে সুসম্পর্কের প্রয়োজনীয়তার কথা বলিয়াছেন, তাহাও তখন আর সুদূরপরাহত হইয়া থাকিবে না নিশ্চয়।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন