শহরের বড় রাস্তাগুলির পাশে পদব্রজে চলিবার জন্যে ফুটপাত নির্মাণ করা হয়। স্বল্প দূরবর্তী গন্তব্যে পৌঁছাইতে এইসব ফুটপাত ব্যবহূত হইয়া থাকে। আর্থিক সাশ্রয়তো বটেই, যানজটপূর্ণ রাস্তায় সময়ও বাঁচে এইসব রাস্তা ব্যবহারে। তাহাছাড়া স্বাস্থ্য ভালো রাখিবার জন্যেও একজন সুস্থ মানুষের প্রতিদিন অন্তত দুই কিলোমিটার হাঁটা প্রয়োজন। ফুটপাতের ব্যবহারে সেই প্রয়োজনটুকুও মিটিয়া যাইতে পারে। রাজধানী ঢাকার ফুটপাতগুলিও এইরকম জনকল্যাণার্থে তৈরি করা হইয়াছিলো, কিন্তু প্রায় সকল ফুটপাতেরই অবস্থা এখন বেহাল। জবরদখল করিয়া ব্যবসা পরিচালনা, আবর্জনা নিক্ষেপ, মোটরসাইকেল চালানো এবং একশ্রেণীর দায়িত্ব জ্ঞানহীন লোকের দ্বারা মলমূত্র ত্যাগ প্রভৃতি এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার হইয়া দাঁড়াইয়াছে রাজধানীর এই ফুটপাতগুলিতে। ফলে ঐসব দুর্গন্ধযুক্ত ফুটপাতগুলি দিয়া হাঁটিয়া যাওয়া অত্যন্ত অস্বস্তিকর। আশেপাশের পরিবেশও হইয়া পড়িয়াছে দূষিত। জনসাধারণকে পোহাইতে হইতেছে দুর্ভোগ। কোন কোন ক্ষেত্রে এইসব অবাঞ্ছিত পরিস্থিতি এড়াইতে খুব কাছের গন্তব্যে পৌঁছাইতেও রিকশা, অটোরিকশা এবং পাবলিক বাসের ব্যবহার করিতে দেখা যায় অনেককে। ফুটপাতের ব্যবহার যে নাগরিক অধিকার তাহা ভুলিতে বসিয়াছে নগরবাসী। নাগরিক সুবিধা সংহারী এই অবস্থা দিনে দিনে আরও প্রকট আকার ধারণ করিতেছে।
রাস্তার এইসকল অযাচিত ব্যবহার রোধে আইন প্রণয়ন করা হইলেও তাহার তোয়াক্কা করে না অনেকেই। রাস্তার পাশে ভ্রাম্যমাণ শৌচাগারের ব্যবস্থা করা হইলেও তাহা পর্যাপ্ত নহে। কোন কোন ক্ষেত্রে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারীগণের চোখের সামনে এইসব ঘটনা ঘটিলেও তাহাদের নিশ্চুপ থাকিতে দেখা গিয়াছে। সিটি কর্পোরেশনের উদ্যোগে কতিপয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইলেও তাহা বেশিদিন কার্যকর থাকে নাই বরং দূষণ মাত্রা ব্যাপকহারে বাড়িয়া গিয়াছে।সভ্যতার এই যুগেও পরিবেশের পক্ষে দূষণীয় এই সকল কর্মকাণ্ডে বিস্মিত না হইয়া পারা যায় না। পরিবেশ সচেতনতা লইয়া সারা বিশ্ব যখন সোচ্চার তখন আমরাই আমাদের পরিবেশ দূষণ করিতেছি পরিণাম না ভাবিয়া। আমাদের প্রাণের শহর ঢাকা এখন বিশ্বের শীর্ষ দশটি নোংরা শহরের একটি! ভাবিলেই কষ্ট হয়। অদূর ভবিষ্যতে ঢাকা হইয়া পড়িবে বসবাসের অনুপযোগী, আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পরিবেশবাদী সংস্থার গবেষণার অনুসিদ্ধান্ত ইহাই। ঢাকার বায়ুতে দূষিত পদার্থের মাত্রা দিন দিন বিপদজ্জনকভাবে বাড়িয়া যাইতেছে। অথচ আগামী প্রজন্মকে একটি দূষণমুক্ত, ভারসাম্য পরিবেশ নিশ্চিত করিয়া দেওয়া আমাদের একটি অত্যন্ত জরুরি নাগরিক ও জাতীয় দায়িত্ব। অথচ আমরা এইক্ষেত্রে নীরব ভূমিকায় অবতীর্ণ। আত্মঘাতী এই ‘সিভিক সেন্স’ এর অসারতা আমাদের নগর তথা জাতীয় জীবনকে করিয়া তুলিতেছে দুর্বিষহ।
ইহার সমাধানকল্পে পদক্ষেপ গ্রহণ করিতে হইবে এখনই। সর্বাগ্রে যাহা প্রয়োজন তাহা হইলো ‘সমন্বিত জনসচেতনতামূলক কর্মসূচি’। এইক্ষেত্রে আইণ প্রণয়নের চাইতে ‘নাগরিক বোধ’ জাগ্রতকরণকে দিতে হইবে অধিক গুরুত্ব। জনমানসে এই সংক্রান্ত মূল্যবোধ সৃষ্টির লক্ষ্যে কাজ করিতে হইবে আমাদের সকলের। পরিবেশ সচেতনতার গুরুত্বের বার্তা পৌঁছাইয়া দেওয়া এবং বিদ্যমান আইনের প্রতি সকলের শ্রদ্ধাশীলতা বাড়াইতে প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি ও ব্যক্তিগত উদ্যোগ। এইজন্য প্রয়োজন ব্যাপকভিত্তিক প্রচার-প্রচারণা। গণমাধ্যমগুলিকে এইক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্বের সহিত আগাইয়া আসিতে হইবে। বিচ্ছিন্নভাবে নহে বরং সকলের সমন্বিত উদ্যোগ সুফল বয়ে আনিবে বলিয়াই আমাদের ধারণা। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীকে পরিবেশ রক্ষার্থে কোন কোন ক্ষেত্রে কঠোর হইতে হইবে। আমাদের পরিবেশকে আমরাই রক্ষা করিতে পারি। এই নগরকে উপহার দিতে পারি সর্বপ্রকার দূষণ হইতে মুক্তি।
