ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের ২৫ বছর

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৬
গত ১২ মার্চ ২৫ বছর পূর্ণ হয়েছে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের। ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডাব্লিউ (www) নামেই সকলের নিকট পরিচিত এই প্রযুক্তি। এই প্রযুক্তির কল্যাণেই এখন গোটা বিশ্বে অবাধ তথ্যপ্রবাহের সূচনা হয়েছে। বিশ্বকে বদলে দেওয়া এই প্রযুক্তির উদ্ভাবকের নাম টিম বার্নস-লি। সার্নের ল্যাবে তার উদ্ভাবিত এই প্রযুক্তিকেই পরবর্তী সময়ে উন্মুক্ত করে দেওয়া হয় বিশ্ববাসীর জন্য। অভাবনীয় এই প্রযুক্তির ২৫ বছর পূর্তি নিয়ে লিখেছেন তরিকুর রহমান সজীব আজকে আমরা যে বিশ্বে বসবাস করছি, তাতে নানা ধরনের ডিজিটাল ডিভাইস আর প্রযুক্তিরই জয়জয়কার। তবে গোটা বিশ্বকে সংযুক্ত করে তথ্যপ্রবাহকে সকলের নাগলের মধ্যে নিয়ে আসতে যে প্রযুক্তিটি মূল ভূমিকা পালন করে বিশ্বকে একসূত্রে গেঁথে ফেলেছে, তার নাম ‘ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব’ বা ‘ডাব্লিউ ডাব্লিউ ডাব্লিউ (www)’। আজ থেকে ২৫ বছর আগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। অথচ মাত্র ২৫ বছর বয়সেই এই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব বদলে দিয়েছে পৃথিবীর চিত্র। যারা এই লেখাটি এখন অনলাইনে পড়ছেন, ২৫ বছরের এই প্রযুক্তি ছাড়া তাদের জন্য সেটা অসম্ভব ছিল। ওয়েব সাইটের অস্তিত্ব না থাকা নয়, অনলাইনে তথ্য সকলের মাঝে ছড়িয়ে দেওয়ার মূল প্রযুক্তিগত কৌশল না থাকাই ছিল তার মূল কারণ। সেই দৃশ্যপট বদলের কাজটি যার মাধ্যমে সূচিত হয়েছে, তিনি হলেন টিম বার্নস-লি। ১৯৮৯ সালে তত্কালীন সার্নের (CERN) গবেষক টিম বার্নস-লি এমন একটি প্রস্তাবনা নিয়ে হাজির হন, যার মাধ্যমে কোনো সংস্থার ইনফরমেশন সিস্টেম পরস্পরের সাথে সংযুক্ত থাকতে পারে এবং ওই প্রতিষ্ঠান যাবতীয় তথ্যকে ট্র্যাক করতে পারে। এই প্রস্তাবনাটি আজকের ওয়েবের মতো পূর্ণাঙ্গ না হলেও এই ওয়েবের মৌলিক কাঠামোই ছিল সেই প্রস্তাবনায়। প্রথম প্রস্তাবনাটি সার্নে গৃহীত না হলেও বার্নস লি হাল ছেড়ে দেননি বরং তিনি এতে নানা ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসে একে এইচটিএমএল (ওয়েবপেজে ব্যবহূত ভাষা), ইউআরএল (অনলাইন রিসোর্স সনাক্তের স্ট্রিং) এবং এইচটিটিপি’র (ওয়েব সার্ভারের যোগাযোগ প্রটোকল) সাথে ব্যবহারের উপযোগী করে তোলেন। বছর খানেকের মধ্যে তিনি একটি মৌলিক ওয়েব ব্রাউজার এবং প্রথম ওয়েব সার্ভারও তৈরি করেন। বেলজিয়ামের কম্পিউটার বিজ্ঞানি রবার্ট কাইলিয়াউয়ের সহায়তায় ১৯৯০ সালের নভেম্বরে সংশোধিত প্রস্তাবনা উত্থাপন করেন লি। সংশোধিত প্রস্তাবনাটি সার্নের সমর্থনে কার্যকরী হয়ে ওঠে এবং ১৯৯১ সালে সার্নের বাইরের ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবকে উন্মুক্ত করা হয়। ওয়েবের বিপুল সম্ভাবনার কথা বুঝে শুরু থেকেই লি ছিলেন একে বিশ্বব্যাপী সকলের জন্য বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেওয়ার পক্ষে। সার্নও একই উপলব্ধি থেকেই শেষ পর্যন্ত ১৯৯৩ সালে রয়্যালিটি-ফ্রি হিসেবে বিনামূল্যে উন্মুক্ত করে দেয় ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব। তা না হলে হয়ত আজকের এই হাতের মুঠোয় পাওয়া বিশ্বের চিত্রটাই ভিন্ন হতো। ওয়েবকে সকলের জন্য উন্মুক্ত করে দিলেও ওয়েবের নিরন্তর উন্নয়নের জন্য ১৯৯৪ সালে টিম বার্নস লি গড়ে তোলেন ওয়ার্ল্ড ওয়াইড দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছে এবং বিভিন্ন ওয়েব স্ট্যান্ডার্ড উন্নয়র্নে ভূমিকা রেখে চলেছেন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের পূর্বেও কম্পিউটার নেটওয়ার্ক আবির্ভূত হলেও যেকোনো তথ্য সকলের সাথে শেয়ার করার জন্য যে কারও ব্যবহারের উপযোগী অবকাঠামো মূলত তৈরি করে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব। এই উন্মুক্ত বৈশিষ্ট্যই একে সার্বজনীন করে তুলেছে যার ফলে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষ এখন এর উপরে নির্ভরশীল। ১৯৯৩ সালে যেখানে মাত্র ১৩০টি ওয়েবসাইট ছিল, সেখানে এখন ওয়েবসাইটের সংখ্যা ৬০০ মিলিয়নেরও বেশি। ১৯৯৮ সালে যেখানে প্রতিদিন গুগল সার্চ হতো ১০ হাজারেরও কম, সেখানে ২০১২ সালের হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন ৩০০ কোটিরও বেশি সার্চ হয় গুগলে। তবে আজকের দিনের অপরিহার্য ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের ভবিষ্যত নিয়ে শঙ্কিত বিশেষজ্ঞরা, এমনকি খোদ টিম বার্নস-লিও। যেভাবে ওয়েবকে নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যেভাবে ওয়েবকে ব্যবহার করে নজরদারী তত্পরতা চালু রয়েছে, তাদে করে এর মৌলিক প্রস্তাবনাই হুমকির মুখে পড়ছে। যে কারণে সেই ১৯৯৩ সালে সকলের জন্য উন্মুক্ত ওয়েবকে সব ধরনের অপতত্পরতা থেকে রুখতে এতদিন পরে এসেও লড়াই চালিয়ে যেতে হচ্ছে খোদ নির্মাতা টিম বার্নস লিকে। ওয়েব উই ওয়ান্ট (https://webwewant.org) সাইটের মাধ্যমে সেই লড়াই জারি রেখেছেন তিনি এবং উন্মুক্ত ওয়েবের পক্ষেকার সবাই। মুক্তমনা সকলেই ওয়েবের উন্মুক্ততা বজায় রাখতে যোগ দিতে পারেন অনলাইনে। আজ ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের ২৫তম জন্মবার্ষিকী। ১৯৮৯ সালের আজকের এই দিনে তথ্য প্রবাহের উন্নয়নে আমি একটি প্রস্তাবনা রেখেছিলাম, যাতে ছিল ‘‘বিভিন্ন নোটের পরস্পর সম্পর্কিত একটি জাল (ওয়েব)’’। যদিও একটি পদার্থ বিজ্ঞানের গবেষণাগার হিসেবে সার্নে (CERN) এমন একটি সাধারণ সফটওয়্যার প্রজেক্ট নিয়ে কাজ করার সুযোগ ছিল না, তবু আমার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মাইক সেন্ডাল একে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অনুমোদন দিয়েছিলেন। ১৯৯০ সালে সার্নে বসেই আমি প্রথম ‘ব্রাউজার’ এবং ‘এডিটর’ তৈরি করি। পরে নানা তর্ক-বিতক্যের শেষে ১৯৯৩ সালে সার্ন এই ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব (www) প্রযুক্তিকে সকলের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত করে দেয় এবং কোনো ধরনের রয়্যালিটি প্রদান ব্যাতিরেকেই এই প্রযুক্তি সকলের জন্য ছেড়ে দেওয়া হয়। এই সিদ্ধান্তটিই হাজার হাজার আগ্রহী মানুষকে একসাথে কাজ করে ওয়েবকে সমৃদ্ধ করতে সক্রিয় করে তোলে। এরই ধারাবাহিকতায় বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ৪০ শতাংশ মানুষই অনলাইনে যুক্ত হয়েছে এবং নিজেদের সৃজনশীলতার মাধ্যমে একে আরও বেশি সমৃদ্ধ করে তুলছে। সময়ের পরিক্রমায় এখন ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনৈতিক কর্মযজ্ঞ পরিচালিত হচ্ছে ওয়েবকে ঘিরে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রভৃতি খাতেও জনগত অনেক রূপান্তর ঘটেছে এর মাধ্যমে। বাকস্বাধীনতা, গণতান্ত্রিক লড়াইয়ের হাতিয়ার হিসেবেও এটি ব্যবহূত হয়েছে অনেক ক্ষেত্রে। বিশ্ব ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক এসব পরিবর্তন সত্ত্বেও বলতে হবে, এর যাত্রার সূচনালগ্নেই রয়েছে ওয়েব। প্রশ্ন উঠতে পারে, এসব কী করে সম্ভব হলো। প্রশ্নটির উত্তর হবে— ওয়েবের ডিজাইন এবং একে সমর্থন করে যাওয়া ইন্টারনেট প্রযুক্তি। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের নন-হায়ার আর্কিয়াল, বিকেন্দ্রীকরণ এবং সহজাত উন্মুক্ত বৈশিষ্ট্যই এর পেছনে মূল ভূমিকা রেখেছে। ওয়েবকে ব্যবহার করে যেকোনো ধরনের তথ্য নিয়ে যেকোনো ডিভাইসে, যেকোনো সফটওয়্যার প্ল্যাটফর্মে এবং যেকোনো ভাষায় কাজ করা যায। এটি দিয়ে যেকোনো তথ্যকেই আপনি যুক্ত করতে পারবেন, যার জন্য প্রয়োজন হবে না কারও অনুমতির। একে ব্যবহার করে আপনি কী করতে পারবেন, তা কেবলই আপনার কল্পনা ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা দ্বারাই সীমাবদ্ধ হতে পারে। তাই বলতেই হয়, আজকের এই দিনটি উদযাপনের জন্যই। তবে সাথে সাথে পারস্পারিক ভাবনা, আলোচনা এবং কিছু করারও উপলক্ষ এই দিনটি। ওয়েবকে নিয়ন্ত্রণ এবং ইন্টারনেটের ভবিষ্যত বিষয়ক মৌলিক সিদ্ধান্তগুলো ক্রমান্বয়েই আশংকায় পরিণত হচ্ছে। ফলে ওয়েবের ভবিষ্যত নিয়ে আমাদের সকলের কথা বলা এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। এখনও বিশ্বের যে ৬০ ভাগ মানুষ অনলাইনে নেই, তাদের কী করে দ্রুত যুক্ত করা যাবে অনলাইনে, তা নিয়ে ভাবতে হবে। আমরা কী করে নিশ্চিত হব যে ওয়েব বিশ্বের তাবত্ ভাষা ও সংস্কৃতি সমর্থন করবে এবং নির্দিষ্ট কোনোটি প্রভাব বিস্তার করবে না—সেটিও ভাবতে হবে। আসছে ইন্টারনেট অব থিংসের যুগে একটি উন্মুক্ত স্ট্যান্ডার্ড সম্মিলিতভাবে তৈরি করা যায়—সেটিও একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন। আমরা কি আমাদের অনলাইন অভিজ্ঞতাকে খর্ব করার কর্তৃত্ব অনুমোদন করব? নাকি আমরা ওপেন ওয়েবের যে জাদুকরী ক্ষমতা উদ্ভাবন ও সৃজনশীলতা বিকশিত করে, তাকে রক্ষা করব? যারা অনলাইনে ব্যক্তি তথ্যের উপর নজরদারী করে থাকে, তাদের কী করে আমরা জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসব? এগুলোই এখন আমার মনে উদয় হওয়া কিছু প্রশ্ন। আপনারও কি এমন প্রশ্ন রয়েছে? ওয়েবের এই ২৫তম জন্মদিনে আমি সকলের নিকট আহ্বান জানাই একত্রিত হতে, যাতে করে আমরা ওয়েবের একটি ভবিষ্যত স্ট্যান্ডার্ড প্রস্তুত করতে পারি এবং একটি উন্মুক্ত ও বিনামূল্যের ওয়েব সকলের জন্য নিশ্চিত করতে প্রতিটি দেশে ‘ডিজিটাল বিল অব রাইটস’ উত্থাপন করতে পারি। www.webat25.org ওয়েবসাইটে এ বিষয়ে আরও তথ্য রয়েছে। দেখুন এবং আমরা ঠিক কেমন ওয়েব চাই, তা প্রতিষ্ঠার পক্ষে আওয়াজ তুলুন। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবের ২৫ বছর পূর্তিতে এর উদ্ভাবক টিম বার্নস-লি গুগল ব্লগে এই অতিথি পোস্টটি লিখেছেন।