[ খে লা ]

টি-টুয়েন্টির জাতীয়তাবাদ ও কর্পোরেট ফ্ল্যাশ মব

আপডেট : ১৮ মার্চ ২০১৪, ২১:৪৮
সেই মেলবোর্ন থেকে আজকের ঢাকা। ভাবতেই অবাক লাগে। ১৮৭৬ থেকে ২০১৪ ক্রিকেট বিশ্বের কত সময় গড়ালো। ছিলো পাঁচদিনের খেলা, হলো পাঁচ ঘণ্টার খেলা। লর্ডসদের খেলা ক্রিকেট। সেই ধীরগতির ধ্রুপদী ক্রিকেট জীবনের তাগিদে ‘ছোট হয়ে আসা পৃথিবী’র মত সংক্ষিপ্ত রূপ নিয়েছে। টি-টুয়েন্টি মানেই শর্টকার্ট খেলায় ব্যাটসম্যানদের মারমুখী ভূমিকার এক দুর্দান্ত প্রদর্শনী। ‘গ্রামারের’ বদলে ‘গ্ল্যামার’ই মুখ্য। ধ্রুপদী চর্চা নয়, ব্যাটসম্যানদের ব্যাটিং ঝলসানিই এখানে ব্যাটে-বলে উন্মাদনা ডেকে আনে। আমরাও উন্মাদ হই। কারণ, জাতি হিসেবে আমরা খুব দুঃখী। আনন্দের উপলক্ষ আমাদের বড় একটা নেই। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ইংল্যান্ড, নিউজিল্যান্ডের সাথে অর্থনৈতিক-বুদ্ধিবৃত্তিক পাল্লা দেয়ার সামর্থ্য যেহেতু নেই টি-টুয়েন্টির ক্রিকেট জাতীয়তাবাদ ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মেটানো’র সুযোগ দিয়েছে। গতবছর এই সময়টাতে চারপাশে স্লোগান শোনা গিয়েছিল-‘হৈ হৈ রৈ রৈ- জামায়াত শিবির গেল কই’। যুদ্ধাপরাধের বিচার দাবিতে দেশব্যাপী গড়ে ওঠা গণজাগরণ মঞ্চের স্লোগান ছিল এটি। আজ, বছর না ঘুরতেই সেই তারুণ্যের মুখে নতুন স্লোগান- ‘চার ছক্কা হই হই-বল গড়াইয়া গেল কই?’ আই.সি.সি. টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপকে সামনে রেখে এই নতুন স্লোগান। আগামী ১৬ মার্চ অনুষ্ঠিতব্য এই টুর্নামেন্টকে ঘিরে চলছে নানা ধরনের প্রচারণা। বিশেষ করে, তরুণ-তরুণীদের অংশগ্রহণে নতুন একধরনের প্রচারণা নজরে পড়ছে। এর নাম ‘ফ্ল্যাশ মব’! ২০০৩ সাল থেকেই পৃথিবীজুড়ে জনপ্রিয় হতে থাকে এই ফ্ল্যাশ মব। ফ্ল্যাশ মব বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যেই শুধু নয়, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি, শিল্পকর্ম, ব্যঙ্গ প্রতিবাদেরও ভাষা। এর অর্থ- আকস্মিক একটি স্থানে জড়ো হয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা। চকিত এই নর্তন-কুর্দনকে বিশ্বব্যাপী দেখা যায় প্রতিবাদেরই ধরন হিসেবে। নগরকেন্দ্রিক সংস্কৃতির একটি নবতর সংযোজন এই ফ্ল্যাশ মব। নগরের চলতি পথে হাজারো জনতার ভিড়ের মধ্য থেকে হঠাত্ করেই একদল তরুণ-তরুণী নাচ-গান শুরু করবে। ক্যানভাসের চারপাশে যেমন আগ্রহী দর্শক-শ্রোতারা গোল করে জমায়েত হয়, এখানেও নর্তন-কুর্দনরত তারুণ্যকে দেখতে গোল হয়ে ওঠে পথিকের জমায়েত। নাচাগানা শেষ, তো আবার ভিড়ের মধ্যে মিশে যায় ওরা। আই.সি.সি. ওয়ার্ল্ডকাপ টি-টুয়েন্ট টুথাউজেন্ড ফোরটিন-এর থিম সংয়ের ফ্ল্যাশ মবগুলো ইউটিউবে দেখে সত্যিই মুগ্ধ হচ্ছি। ১১টি বিশ্ববিদ্যালয়কে টার্গেট করে ফ্ল্যাশ মব করা হয়েছে। এই মবের ভিডিওতে দেখা যাচ্ছে শিক্ষার্থীরা হঠাত্ করে ব্যস্ত সড়কে দাঁড়িয়ে গানের সাথে তাল মিলিয়ে নাচছে। তাল-লয়-ছন্দ সবই আছে, আছে জনতার ভিড়। দুর্দান্ত এডিটিং, চমত্কার কম্পোজিং, গতিশীল ভিডিওগ্রাফি। ফ্ল্যাশ মব যেন নগরের ব্যস্ত সড়কে দৃষ্টি আকর্ষণের নতুন ভাষা! এই মবগুলোর যেকোন একটি হতে আই.সি.সির অফিসিয়াল ভিডিও। অনেকগুলো ভিডিও মবের মধ্যের কোনটি স্থান করে নেবে? অনলাইনে এ নিয়ে চলছে রীতিমতো গণউন্মাদনা, ধরে নিচ্ছি এগুলো সবই খেলার প্রতি আমাদের গভীর প্রেম। পুঁথিগত বিদ্যাকে সম্বল করে চার দেয়ালে আটকে না থেকে একদল প্রাণবন্ত উচ্ছল তরুণ-তরুণী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কিংবা তার কাছাকাছি শহরের বিভিন্ন মোড়ে জড়ো হয়ে নাচছে, ভাবতেই অবাক লাগছে। নারী-পুরুষের এই গণ-উন্মাদনায় একধরনের বিস্ময় জাগে, এই দেশেই একদল পিছিয়ে-পড়া মানুষ মনে করে ‘নারীরা তেঁতুলের মতো’, তাদের কার্যত গৃহবন্দী করে রাখতে হবে! এই প্রাণবন্ত তারুণ্যকে স্যালুট জানাই। খেলার প্রতি তাদের এই নবপ্রচারণায় সামিল হওয়াকে তারুণ্যের প্রতিনিধি হিসেবে আমিও মেনে নিই। কিন্তু, এর বাইরেও কিছু কথা থাকে! ক্রিকেট মানেই কি আজ শুধু চার-ছয়ের খেলা? না কি খেলার আড়ালে প্রকাশ পায় ক্ষমতার ভাষা? ক্রিকেট আজ কেবলই নিছক ব্যাট-বলের খেলায় আটকে নেই। ধর্ম-রাজনীতি-দেশপ্রেম-ব্যক্তিত্ব-জাতীয়তাবাদ ছাপিয়ে জুয়ার আসরেও ক্রিকেট পৌঁছে গেছে। সারাবছর লেখাপড়া না করে পরীক্ষার আগের রাতের প্রস্তুতিতে বাজিমাতে দক্ষদের কাছে শাহিদ আফ্রিদির মতো মারকুটেদেরও জয়জয়কার! ক্রিকেট আজ নিছকই ব্যাট-বল, চার-ছক্কা আর সময় কাটানোর খেলা নয়। এখানে নিত্য ফুটে উঠছে তারুণ্যের নানা প্রবণতা। ক্রিকেট খেলার ভোক্তা-পাঠক-দর্শক-শ্রোতার গড় বয়স তারুণ্যের কোঠায়। বাংলাদেশে এখন কর্মক্ষম তারুণ্যের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। সেই তরুণরা যখনই কোন কিছুতে হুজুগের মতো সামিল হয়, আমরা দেখি তাতেই ঝাঁপিয়ে পড়ে মুনাফালোভীরা। এরা তারুণ্যের উদ্যোগ, শক্তি, পরিকল্পনাকে বিজ্ঞাপন, নাটক, সিনেমায় নানান ভাষায় বেচাবিক্রি করে। এরা বিনোদন বেচা মুনাফালোভী ব্যবসায়ী। আমরা ক্রিকেটের উত্তেজনায় অঙ্গ ঘষাঘষি করছি, পুড়ছি ক্রিকেট উত্তেজনায়, কিন্তু ভুলে যাই আমরা স্রেফ দর্শকই। আমাদের ব্যস্ত গণশহরে নেই একচিলতে খেলার মাঠ। শিশু-কিশোরদের স্কুলে নেই একটুকরো মাঠ যেখানে দেহে-মনে বেড়ে ওঠার মতো বিশালতা পাবে ওরা। কাঁধে পাঠ্যবইয়ের বোঝা। নারী ক্রিকেটারদের সিরিজ জয়ের সংবাদ আর ছবিও সংবাদপত্রের প্রথম পাতায় আসে না। ক্রিকেট অনুরাগীদের আজ সত্যিই খারাপ দশা। আমরা খেলি না, আমরা শুধু দেখি আর হাততালি দিই। প্রিয় দলের পরাজয়ে জাতীয়তাবাদের পরাজয় অনুভব করি। কিন্তু বিনোদনের বাজারে ক্রিকেটকে কেন্দ্র করে মাল আপলোড-ডাউনলোড থেমে নেই; বাজার সর্বশক্তিমান, বাজারের ধর্মই মুনাফা। সমাজের মধ্যবিত্ত আয়ের পরিবার থেকে উঠে আসা ক্রিকেট ভোক্তা তারুণ্যের মধ্যে আজ একধরনের হুজুগ। সেভাবেই গাওয়া হয়েছে থিম সঙ্গীতটি- ‘তিন ঘণ্টার অ্যাকশন সিক্সটিন/ সিক্সটিন/ক্রিকেট ক্রেজি নেশনস,/হাউ এক্সাইটিং/স্টেডিয়াম ওয়েটিং, টেনশান টেনশান’! গণসমাজের গণআচরণের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো উন্মাদনা। উন্মাদনা হলো নিজের মানসিক শান্তির জন্য কোন দিকে ছুটে যাওয়া। কাঙ্ক্ষিত ক্রিকেট ম্যাচের একটিমাত্র টিকেটের জন্য দিন-রাত জেগে অপেক্ষার প্রহর শেষে অবেশে টিকেট হাতে পাওয়ার যে অনুভূতি আমরা মিডিয়ায় দেখি তা ক্রিকেটের প্রতি উন্মাদনাকে মনে করিয়ে দেয়। আরেকটি পর্যবেক্ষণ হলো গণবিকার! গণবিকার হলো তাই, একধরনের আবেগের বন্যায় ভেসে যাওয়া, যে আবেগে যুক্তির লেশমাত্র নেই। এই আচরণ একসঙ্গে বহু মানুষের মধ্যে দেখা যায়। সমস্যাসঙ্কুল এই সমাজে অপরাপর দায়দায়িত্ব ভুলে অহর্নিশি ক্রিকেট উত্তেজনায় ভোগাই গণবিকার। ক্রিকেটের জয়ে আমরা আলোকিত হই, আমরা উল্লসিত হই। পাকিস্তানের বিরুদ্ধে প্রতিটি ম্যাচে আমরা হয়ে উঠি ১৯৭১ সালের স্বাধীনতাকামী লড়াকু জাতিতে। ক্রিকেটই আজ আমাদের জাতীয়তাবাদ, আনন্দ, বেদনা, লাভ, ক্ষতির অন্যতম মাপকাঠি। ক্রিকেট মাঠের ফ্ল্যাশ লাইটের আলোতে দর্শক সারিতে থাকা আমরাও আলোকিত হই। কিন্তু সারা বিশ্বময় কর্পোরেট প্রচারের আলোর নিচে লুকিয়ে আছে ভয়াবহ দুঃখময় জীবনের আরো গহীন অন্ধকারময় হাজারো গলি-ঘুপচি। [লেখক: চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক] rajibndz¦gmail.com

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন