জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৪, ২১:৪০
জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৯২ সালে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম লক্ষ্য ছিল সেশন জট দূর করা। বর্তমানে যেইসব কলেজ এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত, ইহার আগে সেইগুলি ঢাকা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে ছিল। স্বাভাবিক কারণে সেইসব বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনিক চাপ ছিল অত্যধিক। তাহাছাড়া এই বিশ্ববিদ্যালয়গুলি রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে প্রায়শ বন্ধ থাকিত। ফলে সেশনজটের ঝক্কি-ঝামেলা ইহার অধিভুক্ত কলেজগুলিকেও পোহাইতে হইত। এই সমস্যা হইতে উত্তরণে ও মানসম্মত উচ্চশিক্ষার বাস্তবায়নে প্রতিষ্ঠিত হয় জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কিন্তু দীর্ঘ অভিজ্ঞতায় দেখা যাইতেছে, উল্লেখিত উদ্দেশ্য ও আকাঙ্খার তেমন বাস্তবায়ন হয় নাই। বরং সেশনজটসহ অনেক সমস্যা আরও গভীরতর হইয়াছে। বর্তমানে সেশনজটের কারণে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে চার বত্সরের অনার্স ও এক বত্সরের মাস্টার্স শেষ করিতে সাত-আট বত্সরেরও বেশি সময় লাগিতেছে। ইহাতে লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীর দুর্ভোগ বাড়িয়া গিয়াছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনস্থ কলেজগুলিতে মাস্টার্স সম্পন্ন করিতে একেজন শিক্ষার্থীর বয়স হইয়া দাঁড়ায় ২৭ কিংবা ২৮ বত্সর। যেহেতু সরকারি ও অধিকাংশ বেসরকারি চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩০, তাই চাকরির জন্য প্রস্তুতি ও প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের সময় থাকে খুব কম। এইভাবে তাহারা কর্মক্ষেত্রে প্রবেশসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পিছাইয়া পড়িতেছে। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রমাগত উদাসীনতা বা অক্ষমতায় এবং যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ ও বাস্তবায়নের অভাবে কলেজগুলির শিক্ষার মানও পড়িয়া যাইতেছে। তাই সার্বিকভাবে এই বিশ্বদ্যািলয়ের উন্নয়ন ও অগ্রগতি লইয়া নূতন করিয়া চিন্তা-ভাবনা করিবার প্রয়োজনীয়তা দেখা দিয়াছে। উল্লেখ্য, খোদ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন স্বীকার করিয়াছে যে জাতীয় বিশ্বদ্যািলয়ের সেশনজট ‘গুরুতর’ পর্যায়ে উপনীত হইয়াছে। প্রতি শিক্ষাবর্ষেই দুই বত্সরের বেশি সেশনজট। পাস কোর্সের অবস্থা আরও শোচনীয়। সেশনজটের মূল কারণ সবার শেষে ও দেরিতে ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণ এবং বিভিন্ন শিক্ষাবর্ষের পরীক্ষা গ্রহণ ও ফল প্রকাশে কালক্ষেপণ। তবে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের মন্তবও এইখানে প্রণিধানযোগ্য। তাহার মতে, মানোন্নয়ন পরীক্ষার কারণে একসঙ্গে বিভিন্ন বর্ষের পরীক্ষা নেওয়া যায় না। একই শিক্ষকেরা বিভিন্ন বর্ষের খাতা দেখিবার কারণে তাহারা কুলাইয়া উঠিতে পারেন না। তাহাছাড়া কেন্দ্রের সমস্যাসহ প্রশ্নপত্র ছাপাইতেও দেরি হয়। এই সমস্যাগুলি যথাসম্ভব সমাধান করিয়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে সেশনজটমুক্ত করিবার উদ্যোগ অবিলম্বে গ্রহণ করিতে হইবে। আমাদের ভুলিয়া গেলে চলিবে না যে, স্নাতক পর্যায়ে দেশের মোট শিক্ষার্থীর প্রায় ৪৮ শতাংশ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে পড়াশুনা করে। তাহাদের অধিকাংশই এই দেশের মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্তের সন্তান। তাহাদের সামগ্রিক উন্নয়নের কথা বেমালুম ভুলিয়া গেলে তথা তাহাদের হতাশা দূর না করিলে দেশে অস্থিরতা দেখা দেওয়াটা অস্বাভাবিক নহে। জনসম্পদ গড়িবার দৃষ্টিকোণ হইতেও বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত কলেজের সংখ্যা প্রায় আড়াই হাজার। আর ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা প্রায় ১৩ লক্ষ। আমরা যতদূর জানি, ইহা বিশ্বের পঞ্চম বৃহত্তম বিশ্ববিদ্যালয়। তাই এই বিশ্ববিদ্যালয়কে অবহেলার চোখে দেখিবার অবকাশ নাই। কাজের ক্ষেত্র ও পরিধি বাড়িয়া যাইবার কারণেও জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় সঠিকভাবে কাজ করিতে পারিতেছে না। কলেজগুলি তদারকিতে জনবল সংকটসহ নানা সমস্যায় জর্জরিত এই বিশ্ববিদ্যালয়টি। তাই লক্ষ লক্ষ শিক্ষার্থীকে আমরা গভীর অন্ধকারে ঠেলিয়া দিতে পারি না। তাহাদের উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা আমাদের অবশ্যই চিন্তা করিতে হইবে। এই লক্ষ্যে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়কে বিকেন্দ্রীকরণ কিংবা ইহার সক্ষমতা বৃদ্ধি একান্ত জরুরি। আমাদের মনে রাখা প্রয়োজন যানজট যেমন অর্থনীতির ভয়াবহ ক্ষতিসাধন করিতেছে, তেমনি সেশনজট শিক্ষার্থীদের জীবনকে পঙ্গু করিয়া দিতেছে। তাই শুধু জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ই নহে, অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সেশনজট দূরিকরণেও সচেষ্ট হইতে হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন