[ অ র্থ নী তি ]

আমাদের কী এতগুলো রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক প্রয়োজন?

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৪, ২১:৪০
গেলো বছরের আগষ্ট মাসে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনে কর্মরত বিশ্বব্যাংকের এক কর্মকর্তার সাথে আমার আলাপ হয়। তার সাথে মূলত হলমার্ক কেলেংকারি তথা রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের ওপর প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপ নিয়েই কথা হয়। তাঁর মধ্যে প্রধানত বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের উন্নয়ন, বিশেষ করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে দক্ষ ও গতিশীল করে তোলার বিষয়েই বেশি আগ্রহ লক্ষ্য করি। আমি দৃঢ়ভাবেই বিশ্বাস করি, সরকার সবচেয়ে ভালো অর্থনীতিবিদ, বেসামরিক আমলা, ব্যবসায়ী বা রাজনীতিকদের পরিচালক বা চেয়ারম্যান পদে বসালেও এদেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর সেবায়-দক্ষতায় উল্লেখযোগ্য উন্নতি ঘটবে না। কারণ এখানে কাঠামোগত ইস্যু বা প্রক্রিয়াকেই আগে ঠিক করতে হবে। আমাদের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা কার্যক্রম, তথ্য-উপাত্ত তৈরি ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, মুনাফা ও বিতরণ ব্যবস্থাপনা এবং নিয়োগ ও পদোন্নতি—সব প্রক্রিয়াতেই সর্বপ্রথম আমূল সংস্কার বা উন্নয়ন ঘটাতে হবে। আমরা দু’জন বিশেষ করে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে তথ্যপ্রযুক্তির সমতা বৃদ্ধির বিষয়ে একমত হই। বাংলাদেশে রাষ্ট্রমালিকানাধীন চারটি বাণিজ্যিক ব্যাংক আছে—সোনালী ব্যাংক, জনতা ব্যাংক, অগ্রণী ব্যাংক ও রূপালী ব্যাংক। বিশেষায়িত ব্যাংক হিসেবে রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি ব্যাংক (বিকেবি), রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক (রাকাব) ও বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (বিডিবিএল)। আরো আছে প্রবাসী কল্যাণ ব্যাংক, আনসার-ভিডিপি ব্যাংক ও কর্মসংস্থান ব্যাংক। এছাড়াও রয়েছে বেসিক ব্যাংক। তবে এসব ব্যাংকের মার্কেট শেয়ার বা বাজার হিস্যা ও কার্যকারিতা দিন দিন কমছে। অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকগুলোই ক্রমান্বয়ে ব্যাংক খাতের বাজার দখল করে নিচ্ছে। স্বাধীনতা অর্জনের ৪২ বছর পরে এসেও দেশের রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ও উন্নয়ন ব্যাংক তথা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নয়ন ও সংস্কারের জন্য বিদেশি উন্নয়ন অংশীদারদের অনেক পরামর্শ নিতে হচ্ছে। কারণ এসব ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোয় এখনো নিত্যসঙ্গী হয়ে আছে অদক্ষতা, দুর্নীতি, বিপুল অংকের খেলাপি ঋণ, স্বল্প মুনাফা, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, অদক্ষ মানবসম্পদ, অপ্রতুল সেবা এবং সাধারণ মানুষকে পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন সেবা প্রদানে ব্যর্থতা ইত্যাদি। যেহেতু রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো অদক্ষ ও দুর্নীতিগ্রস্ত, সেহেতু এগুলো আর জনগণের কষ্টার্জিত আয়ের বিপরীতে দেয়া করের টাকায় পরিচালিত হতে পারে কি-না, তা আমাদের ভেবে দেখতে হবে। একই সাথে অর্থ মন্ত্রণালয়েরও জনগণের করের টাকা অন্য প্রাধিকার খাতে সরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে ভাবা দরকার। ব্যবসায়ে সুখ্যাতিসম্পন্ন কোনো ভালো ঋণগ্রহীতা এখন আর ঋণ নিতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংকের শরণাপন্ন হন না। আর রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোও প্রায় সব সরকারের আমলেই প্রভাবশালীদের হস্তক্ষেপে বা চাপে একের পর এক অনিয়ম-দুর্নীতি করে চলেছে। অর্থনীতির যেসব খাতে অর্থের প্রবল চাহিদা আছে সেখানে এবং অগ্রাধিকারমূলক খাতগুলোতে অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর জন্য এসব প্রতিষ্ঠানের সুদের হার কমানো হয়েছে। অথচ সেই টাকা ব্যবহূত হচ্ছে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, রাজনৈতিক আনুকূল্যপ্রাপ্ত ব্যক্তিবর্গকে অযাচিত সুযোগ-সুবিধা প্রদানে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন এসব বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান কখনোই পরিপূর্ণ সমতার মডেল হয়ে কাজ করতে পারেনি। বরং এগুলো অতিরিক্ত ব্যয়, চরম অদক্ষতা ও দুর্নীতিগ্রস্ত লোকদের প্রতিষ্ঠান হয়েই রয়ে গেছে। এসব প্রতিষ্ঠানের কোনোটাই অন্তর্ভুক্তিমূলক আর্থিক কর্মকাণ্ডে কিংবা দরিদ্র জনগণকে ব্যাংক সেবার আওতায় নিয়ে আসার ক্ষেত্রে কাঙ্ক্ষিত ভূমিকা পালন করতে পারেনি। বিপুল অংকের খেলাপি ঋণের কারণে এসব ব্যাংকে রক্তক্ষরণ চলছেই। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্পদমূল্যও নেতিবাচক হয়ে উঠছে। অভ্যন্তরীণভাবে নগদ অর্থ আহরণের পরিমাণ কম হওয়ায় বা সম্পদ ও দায়ের মধ্যকার অসঙ্গতির কারণে বাংলাদেশ ব্যাংক এসব ব্যাংক ও প্রতিষ্ঠানে পুনঃঅর্থায়ন চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ও বার বার বাজেটীয় বরাদ্দ বা থোক বরাদ্দ প্রদানের মাধ্যমে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে মূলধনের জোগান দিতে বাধ্য হয়েছে, এখনও হচ্ছে। স্বাধীনতা লাভের পর থেকে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও গোষ্ঠীসমূহ জনপ্রিয়তা অর্জনের আশায় রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর দেয়া কৃষি ঋণ বা এর সুদ মওকুফ করেছে এবং প্রভাব খাটিয়ে রাজনৈতিক অনুগতদের বিধি-বহির্ভূতভাবে শিল্পঋণ পাইয়ে দিয়েছে। কিন্তু তা দেশের কৃষি খাতে ও শিল্পায়নে উল্লেখযোগ্য কোনো সুফল দেয়নি, বরং ব্যাংকগুলোর মেরুদণ্ড ভেঙ্গে দিয়েছে। অন্যদিকে এ ধরনের প্রবণতা অজনপ্রিয় সরকার ও দুর্নীতিগ্রস্ত সাংসদদের ক্ষমতায় থাকতে সাহায্য করেছে এবং এতে রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় হয়েছে। ক্ষুুদ্রঋণ প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানসমূহ (এমএফআই) বা বেসরকারি সংস্থাগুলোকেও (এনজিও) কখনোই তাদের যথাযথ ভূমিকা পালন করতে দেয়নি সরকারগুলো। তারা রাজনৈতিক চাপের মধ্যে থাকতে বাধ্য হয়েছে। অন্যদিকে যারা এই ব্যবস্থার সমালোচনা করেছেন তাদের কখনোই ভালো চোখে দেখা হয়নি। রাষ্ট্রমালিকানাধীন নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংককে করপোরেট প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা বা বেসরকারিকরণের পরামর্শকে অনেক নীতিনির্ধারকও রাষ্ট্রবিরোধী বলে চিহ্নিত করেছেন। এতে আমরা চুপ থেকেছি এবং এসব রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকে সংঘটিত অপকর্মের জন্য ক্রমাগতভাবে জাতীয় কোষাগারের অর্থ ব্যয় হয়েছে। বিদেশি উন্নয়ন সাহায্যের অর্থও অগ্রাধিকারমূলক খাতের পরিবর্তে অবাঞ্ছিতভাবে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোতে চলে গেছে। ব্যাংকসহ আর্থিক খাতের উন্নয়নে সরকারের নেয়া সংস্কারের উদ্যোগ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছে। রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোকে ন্যূনতম দক্ষ করে তোলা ও করপোরেট প্রতিষ্ঠানে পরিণত করা এবং পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা প্রদানে বিশ্বব্যাংক সাহায্য করেছে, এখনও করতে চায়। এ কাজ পুরোপুরি সম্পন্ন হলে তা ব্যাংকগুলো সহজেই পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত হয়ে দীর্ঘমেয়াদে বাণিজ্যিকভাবে টিকে থাকতে পারবে। সব অর্থমন্ত্রী ও অর্থসচিবেরাই রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর উন্নতি সাধনের ধারণা সমর্থন করেছেন। কিন্তু এই প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেয়ার মতো যথেষ্ট কর্মতত্পরতা তারা দেখাতে পারেননি বা সেই শক্তি তাদের ছিল না। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও তাদের ঘনিষ্ঠজনদের বাধা এবং এমনকি দুর্ভাগ্যজনকভাবে বুদ্ধিজীবী ও অর্থনীতিবিদদের একাংশের বিরোধিতার কারণেই মূলত তারা অসহায় হয়ে পড়েন। এক্ষেত্রে অবশ্য অন্তর্বর্তীকালীন সরকার মোটামুটি অগ্রগতি অর্জন করে। তারা রাষ্ট্রমালিকানাধীন বৃহত্ ব্যাংকগুলোকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করেছে। সেই সাথে এসব প্রতিষ্ঠানে করপোরেট সংস্কৃতি চালুর উদ্যোগ শুরু হয়। তখন চীনের ব্যাংক খাত পুনর্গঠনের মতো এসব ব্যাংকে পুনরায় মূলধনের জোগান দিতে কৌশলগত বিনিয়োগকারী খোঁজার প্রক্রিয়া নিয়েও কথাবার্তা শুরু হয়। কিন্তু নতুন সরকারের দায়িত্ব নেয়ার সাথে সাথে সব উদ্যোগ-আয়োজন স্থগিত হয়ে যায়। নতুন পরিচালনা পর্ষদগুলো এসব ব্যাংককে আগের মতো তথাকথিত জনপ্রিয়তার কৌশল গ্রহণে বাধ্য করে। অথচ সমপর্যায়ের দেশগুলোর ব্যাংক খাতে কী ঘটছে সেদিকে তাকানোই হয়নি। জনপ্রিয়তা অর্জনের গতানুগতিক কৌশল গ্রহণের নামে এসব ব্যাংক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ, কমপ্লায়েন্স বা পরিপালনীয় কর্তব্য সম্পাদন এবং এমনকি ন্যূনতম সুশাসনের সম্ভাবনাটুকুও কাজে লাগানো যায়নি। রাজনীতিবিদ বা রাষ্ট্রের কর্ণধারদের পক্ষ থেকে যদি জোর গলায় না বলা হয় - ‘যথেষ্ট হয়েছে আর নয়’, তাহলে এটা নিশ্চিত যে রাষ্ট্রমালিকানাধীন বড় বড় বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে বার বার মূলধনের যোগান দেয়া হবে এবং নতুন সরকারগুলো এসেও একই প্রবণতা অব্যাহত রাখবে। আমাদের অর্থমন্ত্রীরা রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে দলীয় লোকদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। আর ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষকেও রাজনৈতিক অনুগতদের দেউলিয়া প্রতিষ্ঠানের নামে ঋণ বিতরণ করতে বলা হয়। পরিণতিতে রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাংকগুলোর মূলধন যেমন কমে যায় তেমনি তাদের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও তথ্যপ্রযুক্তিগত অবকাঠামো দুর্বলই থেকে যায়। এসব ব্যাংকের সব ক’টির মালিক রাষ্ট্র এবং এগুলো পরিচালনাও করে রাষ্ট্র। শোনা যাচ্ছে রাষ্ট্রীয় মালিকানায় আরো কিছু ব্যাংক আসছে। পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, উইমেন্স ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক ও ফ্রিডম ফাইটারস ব্যাংক চালু নিয়েও আলোচনা চলছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, আমাদের কী রাষ্ট্রমালিকানাধীন এতগুলো ব্যাংকের দরকার আছে? উত্তর অবশ্যই ‘না’। আবার যেসব ব্যাংক আছে সেগুলোও কী সবসময় সাধারণ মানুষের জন্য আর্থিক অন্তর্ভুক্তিমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করেছে? এই প্রশ্নের জবাবও বাস্তবিক পক্ষে না। এসব ব্যাংক কী ভবিষ্যতে আমাদের বিরাট রকমের সাহায্য করবে? তা-ও না। সুতরাং আমরা যে পথে হাঁটছি সেটি পাল্টাতে হবে। আমাদের অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাওয়াই বাঞ্ছনীয়। লেখক :ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন