তবে আমরা খাব কী

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৪, ২১:৪১
মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পঞ্চম শ্রেণীতে পড়ুয়া এক ছাত্রের প্রশ্ন ছিলো এমন- “বাবা কচুতে মাছি, আঙ্গুরে নেই কেন”? বাবার কাছে প্রশ্নটা করলেও উত্তরটা কিন্তু তার ঠিকই জানা। সে জানে বিষাক্ত ফর্মালিন আর কার্বাইডের কারণে মাছি নেই আঙ্গুরে। পত্রপত্রিকা আর টিভি দেখে সে এ ব্যাপারে সচেতন হয়েছে। তাই পিতার কাছে ছেলের এই প্রশ্ন! মাছের বাজারেও মাছি নেই! প্রতিদিন আমরা যে খাবার খাচ্ছি তাতে বিষও মেশানো আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। যে কমবেশি হাসপাতালগুলোতে গেলেই বুঝা যায় কত প্রকার রোগই না এখন মানবদেহে ভর করে আছে। আসলে আমরা জেনে-শুনেই বিষ খাচ্ছি। না খেয়ে উপায়ইবা কি? তবে উপায় একটা আছে। না খেয়ে থাকলে এ থেকে যেন নিস্তার মিলবে। কিন্তু তাতো হবার নয়। তাই আমে, মাছে, সবজিতে বিষ মেশানো আছে জেনেও তা কিনে নিচ্ছি। আর সেই বিষ মেশানো খাবারগুলোই স্বপরিবারে গিলে চলেছি দিন-রাত। পকেটের টাকা খরচ করে যা কেনা হচ্ছে, তার বেশির ভাগই প্রকৃতপক্ষে বিষ। আর বিষাক্ত এ খাবার গ্রহণের ফলে দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকিতে আছে দেশবাসী। বিশেষ করে শিশুরাই এর প্রধান শিকার। চিকিত্সকরা শিশুদের নানা রোগের জন্য ভেজাল ও রাসায়নিকযুক্ত খাবারকেই দায়ী করছেন। অধিক মুনাফার আশায় ব্যবসায়ীরা ক্রেতাদের হাতে বিষ তুলে দিচ্ছেন। হাতেনাতে ধরা পড়ার পাশাপাশি ব্যবসায়ীরা নিজ মুখেই বলছেন রাসায়নিক মেশানোর কথা। শুধু নিজের দায়টুকু স্বীকার করছেন না। পাইকারি ব্যবসায়ী দুষছেন খুচরা বিক্রেতাকে। আর খুচরা বিক্রেতা বলছেন, আড়ত থেকেই চলছে এসব। ভেজাল রোধে সরকারি-বেসরকারি নানা চেষ্টা সত্ত্বেও চলছেই এ কারবার। মাছে মিলছে বিষাক্ত ফরমালিন, ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম (পিপিটি) পাউডার, বিস্কুটসহ বেকারি দ্রব্যে রয়েছে বিষ সমতুল্য রং আর মুড়িতে মেশানো হচ্ছে কৃষিকাজে ব্যবহূত ইউরিয়া সার। এর বাইরেও রয়েছে নানা রাসায়নিক সংমিশ্রণের কারসাজি। ল্যাবে পরীক্ষায় দেখা গেছে ফলের মধ্যে আঙ্গুর, আপেল ও নাশপাতিতে ফরমালিন মেশানো হচ্ছে। এতে ফলটি দীর্ঘদিন দোকানে রাখার পরও নষ্ট হয় না, ঝরে পড়ে না। এসব ফল খেলে গ্যাস্ট্রিক-আলসারের সমস্যা বেড়ে যায়। এসব ফল লিভারের জন্য খুবই ক্ষতিকর। শিশু ও বৃদ্ধদের ক্ষতি হয় সবচেয়ে বেশি। গর্ভের শিশুরও ক্ষতি হতে পারে। ফুসফুসে ব্যাধি ও ক্যান্সারের ঝুঁকিও রয়েছে। আম, পেঁপে ও আনারস পাকানো হয় ক্যালসিয়াম কাবাইড দিয়ে। কেমিক্যাল মেশানো এসব ফল একটু ভালো করে দেখলেই বোঝা যায়। প্রাকৃতিকভাবে পাকা আম বা পেঁপের মুখের দিকটা হলুদ হয়ে নিচে আস্তে আস্তে রঙ বদলায়। পেকে যাওয়ার পরও নিচের দিকটায় সবুজ থাকার প্রবণতা থাকে। কিন্তু কেমিক্যাল মেশানো ফলে ছাকড়া ছাকড়া রং থাকে। স্বাভাবিক গন্ধও থাকে না। অর্গানিক এসিড মিশে ফলকে একটি মিষ্টি স্বাদ এনে দেয়, খোসাতেও মিষ্টি একটা ভাব চলে আসে। আরও কেমিক্যাল মেশালে তা হয়ে যায় তেতো। এসব কার্বাইড মেশালে ফলের কোনো পুষ্টিগুণই থাকে না। এসব ফল খেলে হজমের সমস্যাও হতে পারে। খাবারে রং মেশানো আমের জুস বিক্রি হচ্ছে ১৫ টাকায়। এতে আছে ফলের গন্ধ মেশানো কেমিক্যাল এবং কাপড়ে ব্যবহার করা রং। এসব রং শরীরের জন্য ক্ষতিকর। খাবারের রঙের দাম বেশি বলে ব্যবসায়ীরা কাপড়ের রং ব্যবহার করছেন। দুধেও ফরমালিন দেয়া হয়। ওই দুধের স্বাদ কখনোই ঠিক থাকে না। ভেজাল দেয়া বা ভেজাল খাদ্য ও পানীয় বিক্রির কারণে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও চলছে ভেজাল। আগেই বলেছি, কোনো সভ্য সমাজে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি কল্পনাও করা যায় না। আমাদের দেশে ভেজালের যে সর্বগ্রাসী আগ্রাসন তাতে মনে করা যেতেই পারে এ একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সভ্যতার মাপকাঠিতে এদিক থেকে জংলী যুগের চেয়েও পিছিয়ে আছি। কারণ আর যাই হোক জংলী যুগের অধিবাসীরাও ভেজালের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। প্রশ্ন ওঠে দেশে সরকার, পুলিশ প্রশাসন, আইন আদালত থাকা সত্ত্বেও ভেজালের দৌরাত্ম্য কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না। কেন এই ভেজালকারীদের দাপট? খাদ্যে ভেজালের অপরাধে দেশে কঠিন শাস্তিযোগ্য আইন থাকলেও তার কার্যকারিতা নেই। এ অবস্থাই ভেজালকারীদের উত্সাহিত করছে। আর এ থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে হবে। ভেজালের বিরুদ্ধে দেশব্যাপী আমজনতা, প্রশাসন, সংশ্লি¬ষ্ট বিভাগের সবাই মিলে হাতে হাত মিলিয়ে কাজ করতে হবে। জনস্বাস্থ্য নিয়ে অবহেলা প্রদর্শনের কোনই সুযোগ নেই। এ অবস্থায় সর্বতোভাবে তত্পর হতে হবে বিএসটিআইসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান গুলোকে। সর্বোপরি গণমাধ্যমসহ ব্যাপক জনসচেতনতাও প্রত্যাশিত। তবেই হয়তো ভেজাল থেকে রেহাই মিলবে। লেখক: সাংবাদিক [email protected])

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন