[ রা জ নী তি ]

রাজনীতির জন্যে রাজনীতি না মানুষের জন্যে রাজনীতি!

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৭
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের গতি প্রকৃতি এমনই খাপছাড়া ঠেকছে যে, তাকে রাষ্ট্র বিজ্ঞানের কোনো ধ্রুপদী বয়ানের আওতায় আনা কষ্টকর। জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচন হয়ে গেলো একেবারে নিস্তরঙ্গ ভাবে। অথচ স্থানীয় প্রশাসনে নির্বাচন নিয়ে চলছে হুড়োহুড়ি। এই নির্বাচনকে সাবেক বিরোধী দল যে গুরুত্ব ও আন্তরিকতার সাথে নিয়েছে এবং তা যেভাবে তাদের জন্য অনুকূল ফলাফল বয়ে আনছে যে জাতীয় নির্বাচনে তা গৃহীত হলে হয়তোবা ঘটনাপ্রবাহ উল্টোস্রোতে বইতো। সে যাই হোক, ইফস-বাটস এর থিওরি দিয়ে পুরাঘটিত অতীতকে ব্যাখ্যা করতে যাওয়া কাজের কথা নয়। কাজের কথা হলো, তা থেকে শিক্ষাগ্রহণ করা। আশা করি সাবেক বিরোধী দল বিএনপি ইতোমধ্যে ঢের শিক্ষা পেয়েছে এবং তৃণমূল নেতাকর্মীর চাপে নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হচ্ছে। বিএনপির সেই নির্বাচন বর্জন ছিলো রাজনীতির জন্য রাজনীতি। মানুষের জন্য নয়। একথা এখন আর প্রমাণের অপেক্ষা রাখে না যে তৃণমূল নেতাকর্মীদের ইচ্ছা অনিচ্ছার তোয়াক্কা না করে গজদন্ত মিনারে বসে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন নেতৃবৃন্দ গণবিচ্ছিন্ন সেই সিদ্ধান্ত নিয়েছিলো। হাওয়া বলছে ১৯ সদস্যের উচ্চকক্ষের অনেকেরও নাকি নির্বাচনমুখী ভূমিকা ছিলো যা দাপুটে মিত্রদের জোরালো চাপ ভেদ করে প্রকাশিত হতে পারে নাই। একেই বলে রাজনীতির জন্যে রাজনীতি। রাজনীতির জন্য রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার জন্য রাজনীতি করতে করতে বিএনপির মতো একটি বড়ো দল রাজনৈতিক জীবাশ্মে পরিণত হতে বসেছে। স্থানীয় নেতাকর্মীদের ভেতর মাঝে মাঝে তাত্ক্ষণিক চাঞ্চল্য দেখা গেলেও স্থায়ী কমিটির কারুর মধ্যে (অবশ্য চেয়ারপারসন ব্যতিরেকে) তেমন কোনো নতুন আশার সঞ্চার হচ্ছে না। অনুল্লেখযোগ্য ব্যতিক্রম ছাড়া স্থানীয় কমিটির প্রায় সবাই সাবধানে পা ফেলছেন। অনেকেই পাদপ্রদীপের আলো থেকে সরে এসে অন্ধকারে গা বাঁচাবার চেষ্টা করছেন। কারণ সামনে আন্দোলন ছাড়া বিএনপির কোন পথ নেই। এদিকে টেকসই আন্দোলনের জন্য যে নিঃস্বার্থ আদর্শিক আনুগত্য এবং নেতৃপ্রেরণার প্রয়োজন তা বিএনপি কিংবা জাতীয় পার্টির মতো দলের ভেতরে খুব বেশি খুঁজে পাওয়া যায় না। বিএনপি যতোটুকু রাজনৈতিক স্থিতি পেয়েছে তার আংশিক দীর্ঘ সময় ক্ষমতাসীন থাকার কারণে, আংশিক আওয়ামী বিদূষণ মঞ্চ থেকে এবং একেবারে যত্সামান্য দলীয় স্থপতির ব্যক্তিত্ব আদর্শ থেকে। অথচ বিএনপির প্রতিপক্ষ আওয়ামী লীগের ব্যাপারে চিত্র একেবারে উল্টো। আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক অস্তিত্ব ও বিকাশের সিংহভাগ আসে বঙ্গবন্ধুর মতো একজন আন্তর্জাতিক মাপের মানুষের ব্যক্তিত্ব আদর্শ থেকে এবং মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনা থেকে। স্বাধীনতা-উত্তর বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ একুশ বছর ক্ষমতার করিডোর ঘেঁষতে পারেনি। তবুও তার অস্তিত্ব কখনো একেবারে বিপন্ন হয়নি। একই ঘটনা বিএনপির ক্ষেত্রে ঘটলে কী হবে তা সম্যক উপলব্ধি করা যায়। বিএনপির বিকাশের জন্য আরেকটি মস্ত বিপত্তি হলো দলটির জামায়াত সংশ্লিষ্টতা। ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তস্নাত স্বাধীন বাংলাদেশে যতোদিন লাল সবুজের পতাকা উড়বে, ততোদিন এদেশবাসীর মনে ও মগজে জামায়াত-শিবিরের ঠাঁই হবে না। ক্ষমতার জন্য রাজনীতির প্রয়োজনে হয়তোবা কখনো কখনো কারো কারো জামায়াত নির্ভরতার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে, দিচ্ছে কিংবা দিতে পারে, তবে এদেশের মানুষের জন্য রাজনীতির প্রয়োজনে, একটি অসাম্প্রদায়িক প্রগতিশীল বাংলাদেশ বিনির্মাণের রাজনীতির প্রয়োজনে স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির ওপর কখনোই নির্ভর করার প্রয়োজন হবে না। এই শিক্ষা বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দলের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য। যুদ্ধাপরাধ ইত্যাদি কারণে ইতোমধ্যেই জামায়াতের রাজনৈতিক অস্তিত্ব চিকন সুতোয় ঝুলছে। তাদের নিষিদ্ধ করার দাবি সরকারি অসরকারি বিভিন্ন মহল থেকে উঠছে। প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতিবিরোধী আন্দোলনের এই ব্যান্ড ওয়াগনে ঝাঁপিয়ে পড়ে বিএনপি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধপ্রেমী লক্ষকোটি জনতার কাতারে দাঁড়াতে পারে এবং দলটির প্রতিষ্ঠাতার নামের মহিমা বাড়াতে পারে। কিন্তু সেই সদিচ্ছার কোনো দৃশ্যমান প্রতিফলন এখনো বিএনপি শিবিরে দেখা যায়নি। বরং তাদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ডে জামায়াতের সাথে তাদের দীর্ঘবাহিত সম্পর্কের আঁচ অনুভব করা যাচ্ছে। ফলে জাতীয় রাজনীতিতে তো বটেই। আন্তর্জাতিক রাজনীতিতেও বিএনপির জন্য মাইনাসের পাল্লা ভারী হচ্ছে। অথচ খুব সহজেই তারা সরকারি কিংবা বিরোধী দল হতে পারতো। রাজনীতির জন্য রাজনীতি করার কারণে বিএনপি বর্তমানে একটি জতুগৃহ। প্রবল প্রতিকূল স্রোতে টালমাটাল। চেয়ারপার্সন দল গোছানোর কথা বললেও সক্রিয় সহযোগিতার অভাবে পুরোটাই বাচন সর্বস্ব হয়ে পড়েছেন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবকেও মনে হচ্ছে ভারবহনে ক্লান্ত। একটি অন্যতম মুখ্য রাজনৈতিক দলের এই ফসিলাইজেশ প্রক্রিয়া স্থায়ী হলে তা অবশ্যই সরকারি দলকে ক্রমাগত এককেন্দ্রিক হয়ে উঠতে সাহায্য করবে। তাছাড়া বিরোধী দলের ভূমিকায় এখন যারা অবতীর্ণ তাদের ভাগ্যে হয়তো শিঁকে ছিড়ে পড়েছে। কিন্তু একটি যোগ্যতর বিরোধী দল হিসেবে সরকারি কর্মকাণ্ডে চেক এ্যান্ড ব্যালান্স রক্ষা করা আপাতত তাদের কর্ম নয়। একটি যোগ্য বিরোধী দলের শূন্যতার খেসারত সবচেয়ে বেশি দিতে হবে বিএনপিকেই। আওয়ামী লীগকেও সবসময় মানুষের জন্যে রাজনীতি করতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির এক ঐতিহাসিক প্রয়োজনে এই দলের জন্য অনিবার্য হয়ে উঠেছিলো। বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য নেতৃত্বে নৌকায় চড়েই এসেছিলো এদেশের স্বাধীনতা। অথচ স্বাধীনতা উত্তরকালে, বিশেষ করে আগস্ট ট্রাজেডির পর এই দলেরই উদাসীনতা কিংবা মৌনতার সুযোগে দানা বাঁধতে পেরেছে প্রতিক্রিয়াশীল রাজনীতির ধারা। আওয়ামী লীগ ব্যর্থ হলে এদেশে ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি হবে। পতাকা খাঁমচে ধরবে সেই পুরনো শকুন। তাই আওয়ামী লীগকে সর্বদাই ব্রতী থাকতে হবে জাগ্রত প্রহরীর ভূমিকায়। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর রক্ত ও রাজনীতির উত্তরাধিকার। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের নিযুত জনতা বুকভরা প্রত্যাশা নিয়ে তাকিয়ে আছে তার মুখপানে। একটি আধুনিক, প্রগতিশীল, বিজ্ঞানমনস্ক, অসাম্প্রদায়িক সমাজ গঠনের লক্ষ্যে। একটি রাজাকার মুক্ত বাংলাদেশ গঠনের লক্ষ্যে। একটি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। রাজনীতির জন্যে রাজনীতি কিংবা ক্ষমতার জন্যে রাজনীতি করবার প্রয়োজন আওয়ামী লীগের থাকা উচিত নয়। তাই বাহাত্তরের সংবিধানে প্রত্যাবর্তনের প্রশ্নে, নারীর চূড়ান্ত ক্ষমতায়নের সহায়ক নারী নীতি বাস্তবায়নের প্রশ্নে কিংবা জামায়াতের রাজনীতি নিষিদ্ধকরণের প্রশ্নে নিরেট বাস্তবতার অজুহাতে আওয়ামী লীগকে কৌশলী ভূমিকা নিতে দেখলে দেশবাসী হতাশ হয়। দেশপ্রেম ও আন্তরিকতা নিয়ে মানুষের জন্যে রাজনীতি করে গেলে সাময়িকভাবে অনেক হোঁচট আসতে পারে। কিন্তু সময়ের পরীক্ষায় তা উত্তীর্ণ হতে বাধ্য। বিএনপির যেমন আত্মশুদ্ধির প্রয়োজন, আওয়ামী লীগেরও তেমনি আত্মোপলব্ধির প্রয়োজন। বহিঃশত্রুর চাইতে আভ্যন্তর শত্রুর দ্বারাই আওয়ামী লীগ বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাম্প্রতিক উপজেলা নির্বাচনে ইস্পিত ফলাফল না হওয়ার মূল কারণ অন্তর্দ্বন্দ্ব, কোন্দল, দলীয় আনুগত্যের অভাব। দলের ভেতরে গণতন্ত্র চর্চার ব্যবস্থা করা এবং সত্ ও যোগ্য নেতৃত্বের ক্ষমতায়নের বন্দোবস্ত করতে পারলে এই আওয়ামী লীগই হয়ে উঠবে বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগের মতো অপ্রতিরোধ্য। সব কিছুর মূলে হলো মানুষের জন্যে রাজনীতি নিশ্চিত করা। পুরো জাতি চেয়ে আছে সেই রাজনীতির দিকে যে রাজনীতি-“Of the people, by the people and for the people.” [ লেখক: অধ্যাপক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক]