চিকিত্সক লাঞ্ছিত, হাসপাতালে বিশৃঙ্খলা : সমাধান কোথায় ?

আপডেট : ১৯ মার্চ ২০১৪, ২১:৫৮
ইদানীং প্রায়ই রোগীদের চিকিত্সা ও মৃত্যুর ক্ষেত্রে অবহেলার অভিযোগে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও ল্যাবরেটরি ভাংচুরের ঘটনাসহ ডাক্তার, নার্স এবং কর্মচারীদের উপর আক্রমণ করা হচ্ছে, মামলা দায়ের করে হয়রানি করার মত ঘটনা ঘটছে। বর্তমানে এই অবস্থা ভয়াবহ ও উদ্বেগজনক, সুষ্ঠু চিকিত্সার পরিবেশের অন্তরায়। সামান্য ঘটনার জের ধরে রোগীর আত্মীয়-স্বজনরা অযথাই ক্ষিপ্ত হয়ে চিকিত্সকদের গায়ে হাত তুলছেন। ফলে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকে জটিল ও মুমূর্ষু রোগীদের জরুরি চিকিত্সা সেবা প্রদান করতে গিয়ে চিকিত্সকগণ ভয়-ভীতির মধ্যে কাজ করছেন। একটু সমস্যা মনে হলেই অনেক চিকিত্সক রোগীকে অন্য হাসপাতালে পাঠিয়ে দিয়ে নিজেরা রোগীর চিকিত্সা সেবা এড়িয়ে যেতে চাচ্ছেন। ফলে জরুরী চিকিত্সা সেবাও অনেকাংশে হুমকির সম্মুখীন, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে বন্ধ হবার উপক্রম। একদিকে অন্য রোগীরা আতংকিত হয়ে যাচ্ছেন, অন্যদিকে হাসপাতালের কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে। এমনও শোনা যায় যে, কিছু দুষ্কৃতকারী অর্থ আদায়ের লোভে অথবা ক্লিনিকের বিল পরিশোধ না করার দুরভিসন্ধি নিয়ে এসব ঘটনা ঘটিয়ে থাকেন। শুধু আমাদের দেশেই নয়, অন্যান্য অনেক দেশেই, বিশেষ করে তৃতীয় বিশ্বের দরিদ্র দেশগুলোতে এমনটা প্রায়ই দেখা যায়। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতেও এই ধরনের ঘটনা অহরহ ঘটছে। চিকিত্সায় অবহেলার অভিযোগে চিকিত্সকদের মারধর, মামলা, হয়রানি, হাসপাতাল ভাংচুর ইত্যাদি সম্পর্কে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট ২০০৯ সালে এক যুগান্তকারী রায় দেন। সেই রায় অনুযায়ী কোন চিকিত্সকের বিরুদ্ধে চিকিত্সায় অবহেলার অভিযোগ তোলা হলে তার প্রাথমিক সত্যতা ছাড়া ঐ চিকিত্সককে গ্রেফতার করা যাবে না। এক্ষেত্রে প্রথমে কোন যোগ্য বিশেষজ্ঞ বা বিশেষজ্ঞ প্যানেলের মতামত নিতে হবে। এরপরই শুধু সংশ্লিষ্ট চিকিত্সকের বিরুদ্ধে নোটিস জারি করা যাবে। আদালত মনে করেন যে, চিকিত্সা পেশাকে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইনের আওতায় অন্তর্ভুক্ত করায় অত্যন্ত তুচ্ছ ঘটনায়ও চিকিত্সকদের বিরুদ্ধে অভিযোগ বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাই তদন্ত প্রক্রিয়ায় যারা শেষ পর্যন্ত দোষী সাব্যস্ত হবেন না তারা যেন অযথা হয়রানির শিকার না হন তা নিশ্চিত করা দরকার বলে আদালত মত প্রকাশ করেন। এ ব্যাপারে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সতর্ক করে বলা হয় যে, আনীত অভিযোগ সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত চিকিত্সকদের যেন গ্রেফতার বা হয়রানি না করা হয়, অন্যথায় তাদেরকেও আইনগত ব্যবস্থা মোকাবিলা করতে হবে। ভারতের সর্বোচ্চ আদালতের ঐ রায়ে আরও উল্লেখ করা হয় যে, প্রকৃত অর্থে যেসব চিকিত্সক চিকিত্সায় অবহেলার সঙ্গে জড়িত তাদের প্রতি আদালতের কোন সহানুভূতি নেই। ২০১০ সালে ভারতের মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকার চিকিত্সকদের ওপর হামলা বন্ধে একটি আইন পাস করে। এ আইনে কেউ চিকিত্সকদের ওপর হামলা করলে তাকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা এবং ৩ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড দেয়ার বিধান করা হয়। মহারাষ্ট্র মেডিক্যাল সার্ভিস পার্সন্স অ্যান্ড মেডিকেয়ার সার্ভিস ইনস্টিটিউশন্স (প্রিভেনশন অব ভায়োলেন্স এন্ড ড্যামেজ প্রপার্টি) অ্যাক্ট ২০১০ নামে এই আইন পাস হবার পর চিকিত্সকগণ স্বস্তিবোধ করছেন। সত্যিকার অর্থে পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ আকার ধারণ করলে আইন প্রণয়ন করতে হয় তা সহজেই প্রণিধানযোগ্য। ইন্ডিয়ান মেডিক্যাল অ্যাসোসিয়েশনের দাবি ছিলো যাতে অভিযোগ প্রমাণের আগে চিকিত্সকদের গ্রেফতার ও হয়রানি না করা হয় এবং চিকিত্সকদের ওপর হামলায় দায়ী ব্যক্তিদের যেন আইনের আওতায় আনা হয়। যেহেতু এই ধরনের ঘটনা আমাদের দেশেও ঘটছে, তাই এরকম আইন করা যায় কিনা তা সংশ্লিষ্ট সবার ভেবে দেখা উচিত। আসলে দেশে চিকিত্সা ক্ষেত্রে চরম বিশৃংখলা বিরাজমান। একথা অস্বীকার করার উপায় নাই যে, চিকিত্সা আজ অনেক ক্ষেত্রে বাণিজ্যে পরিণত হয়েছে। ফলে সাধারণ মানুষ যথাযথ সেবা পাচ্ছে না। সরকারি হাসপাতালের কাজ-কর্মে অবহেলা আর অনীহা, ঠিকভাবে রোগীর সেবায় আত্মনিয়োগ না করা, রোগী এবং তার লোকের সাথে সহযোগিতা না করা, রোগ সম্পর্কে তাদেরকে অবহিত না করা, এ ধরনের অভিযোগ তো অহরহ আছেই। আবার দেখা যায়, একই চিকিত্সক বেসরকারি হাসপাতালে অতি তত্পর থাকেন, সেখানের রোগীদের চিকিত্সায় তত্পর থাকেন। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতালেও অনেক টাকা-পয়সা খরচের পরেও অনেক ক্ষেত্রে উপযুক্ত সেবা না পাওয়ার অভিযোগও কম নয়। কিছু কিছু নামি-দামি হাসপাতালে চিকিত্সা খরচ এতই আকাশচুম্বী যা গরীব, নিম্নবিত্ত এমনকি অনেক মধ্যবিত্তের পক্ষে সেখানে সেবা নেয়া নাগালের বাইরে। দেখা যায় অনেকেই না জেনে নামি-দামি হাসপাতালে চিকিত্সা নিতে যান, কিন্তু চিকিত্সা শেষে যখন বিশাল অংকের বিল ধরিয়ে দেয়া হয়, তখন শুরু হয় অসন্তোষ আর ভাংচুর। ডাক্তারদেরও ভেবে দেখা উচিত এমন অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা কেন হচ্ছে? কেনইবা জনসাধারণ অপ্রাপ্তি বা অসন্তোষের কারণে এতটা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠছেন? যারা চিকিত্সা সেবা দিচ্ছেন তাদের প্রতি জনগণের শ্রদ্ধা আর সম্মান থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল, তার বদলে এই অশ্রদ্ধাবোধ কেন? চিকিত্সকদের উপলব্ধি করা দরকার যে, মানুষ অত্যন্ত দায়ে পড়ে তাদের শরণাপন্ন হন। একজন রোগী যখন চিকিত্সকের কাছে যান তখন মানসিকভাবে উদ্বিগ্ন থাকেন। এই সময় তার প্রতি একটু সদয় আচরণ অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা এড়াতে পারে। বিশেষ করে চিকিত্সার শুরুতেই রোগী ও তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে যথাযথ তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। অনিরাময়যোগ্য রোগ সম্পর্কে রোগী বা তার আত্মীয়-স্বজনকে ভালভাবে ধারণা দিয়ে রাখা উচিত। প্রায়ই শোনা যায় যে, ডাক্তাররা রোগীর সাথে ভালভাবে কথা বলেন না, রোগীদের কথা মন দিয়ে শোনেন না, ভালভাবে পরীক্ষা করেন না। এসব অভিযোগ একেবারেই অমূলক নয়, এদিকে সকল চিকিত্সকের দৃষ্টি দেয়া উচিত। সকল রোগ চিকিত্সা করে নিরাময় করা যাবে না, পৃথিবীর অনেক উন্নত দেশেও না, এই কথাটুকুই রোগীর আত্মীয়-স্বজনকে বুঝিয়ে দিতে হবে। এতে কথায় কথায় রোগীদের অভিযোগ যেমন ভুল চিকিত্সা হলো, রোগ ধরতে পারল না ইত্যাদি কমে যাবে। ডাক্তারকে মনে রাখতে হবে যে, কোন রোগীর প্রতি যেন কোন অবহেলা বা দুর্ব্যবহার না হয়। একটা ছোট বাচ্চা অসুস্থ হলে স্বভাবতই তার পিতামাতা, দাদা-দাদী, নিকটাত্মীয় আরো উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন, সেটাই স্বাভাবিক। এক্ষেত্রে ডাক্তারদের আরো নমনীয় ও সহনশীলতার সাথে বাচ্চার চিকিত্সাসহ তার আত্মীয়-স্বজনের সাথে সদ্ব্যবহার করতে হবে। সবশেষে একথা বলতে দ্বিধা নেই, আমরা একজন আরেকজনের উপর শুধু দোষ দিয়েই যাচ্ছি, নিরাময়ের চেষ্টাটা কমই হচ্ছে। তাই সবাইকেই সত্যিকার কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া উচিত। ভাল মানসম্মত ডাক্তার তৈরির যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। তার জন্য ভাল শিক্ষক ও শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ডাক্তারদের শুধু মেডিক্যাল শিক্ষার বাইরেও রোগী এবং আত্মীয়-স্বজনের সাথে আচার-আচরণ কিভাবে করতে হয় তারও শিক্ষার ব্যবস্থা করতে হবে। ব্যাঙের ছাতার মত যত্রতত্র মেডিক্যাল কলেজ খোলার ব্যাপারে আরো সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ডাক্তারের বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছে করা উচিত। শুধু আবেগের বশে ভাংচুর বা উচ্ছৃংখল আচরণ যেন না হয়। পৃথিবীর সবচেয়ে উন্নত দেশের চিকিত্সকদেরও ভুল হয়। এ ধরনের ভুলের ক্ষেত্রে মামলা অবশ্যই হতে পারে। কিন্তু দোষী প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কোনভাবেই চিকিত্সকদের গ্রেফতার করা উচিত নয়। ডাক্তারদের সাথে খুনের মামলার আসামির মত আচরণ কোনক্রমেই কাম্য হতে পারে না। চিকিত্সকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে স্বাভাবিক চিকিত্সা কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। এ বিষয়টি রোগী ও তার স্বজনদের উপলব্ধি করতে হবে। সরকার ও কর্তৃপক্ষের একটি নৈতিক অবস্থান নেয়া উচিত। কোনো হাসপাতালে অপ্রীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করা বা এর পরিণামে এক মুহূর্তও ধর্মঘট চলতে দেয়া হবে না—এ রকম একটি জাতীয় সমঝোতা স্মারকপত্র গৃহীত হওয়া দরকার, যেখানে স্বাক্ষর করবেন চিকিত্সক, কর্তৃপক্ষ এবং সমাজের প্রতিনিধিরা। রোগীদের প্রতি সরকারসহ সমাজের সর্বস্তরের মানুষ ও চিকিত্সকদের একটি অঙ্গীকার থাকা উচিত। কোন চিকিত্সকের বিরুদ্ধে চিকিত্সা সংক্রান্ত মামলা হলে গ্রেফতারের আগে বিএমডিসি এর অনুমতি নেয়া উচিত। সবশেষে মনে রাখতে হবে, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধের মাধ্যমে পরিস্থিতির উন্নতির যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ভারতীয় কোর্টের রায়ের মত আমাদের এখানে রায় হলেও তা বাস্তবায়িত হবে কিনা এ নিয়েও সন্দেহ থেকেই যাবে। লেখক:ডিন, মেডিসিন অনুষদ অধ্যাপক, মেডিসিন বিভাগ, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়