আবারও গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিয়াছে। গত সোমবার চট্টগ্রামের ফটিকছড়িতে যাত্রীবাহী একটি মাইক্রোবাসে সংঘটিত এই বিস্ফোরণে অকালে ঝরিয়া পড়িয়াছে তিনটি মূল্যবান জীবন। মারাত্মকভাবে অগ্নিদগ্ধ হইয়াছেন আরও সাতজন। ভস্মীভূত হইয়া গিয়াছে পুরো মাইক্রোবাসটি। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনা ইহাই প্রথম নহে। যানবাহনে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোজন শুরু হইবার পর হইতে প্রায়শ এই ধরনের প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটিতেছে। হতাহতের তালিকাও অনেক দীর্ঘ। প্রতিবেশী দেশ ভারত ও বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনাজনিত মৃত্যু অনেকটা নৈমিত্তিক বিষয়ে পরিণত হইলেও ভয়াবহতার বিচারে ইহার অবস্থান শীর্ষে। গ্যাস সিলিন্ডার বিস্ফোরণজনিত দুর্ঘটনার প্রকৃতি এতোটাই ভয়ঙ্কর যে ভাগ্যক্রমে প্রাণে বাঁচিয়া গেলেও ভুক্তভোগীদের সারাজীবন ইহার ক্ষত বহন করিতে হয়। কারণ মারাত্মকভাবে দাহ্য গ্যাসভর্তি সিলিন্ডারটি থাকে গাড়ির ভিতরে। ফলে ভুক্তভোগীরা ইহাকে চলন্ত বোমার সহিতও তুলনা করিয়া থাকেন। এইসব ঝুঁকি বিবেচনায় রাখিয়া গাড়িতে গ্যাস সিলিন্ডার সংযোজনকালেই নিরাপত্তার স্বার্থে সতর্কতামূলক কিছু নির্দেশনাও প্রদান করা হয় লিখিতভাবে। প্রতিটি গ্যাস স্টেশনেও অনুরূপ নির্দেশনাসংবলিত সাইনবোর্ড টাঙানোর বাধ্যবাধকতা রহিয়াছে। যেমন, গ্যাস নেওয়ার সময়ে গাড়ি যাত্রীশূন্য রাখা, মোবাইল ফোন ব্যবহার না করা এবং ধূমপান হইতে বিরত থাকা প্রভৃতি। কিন্তু বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সেইসব নিয়মকানুনের কোনো তোয়াক্কা করা হইতেছে না। কিন্তু কাগজে-কলমে থাকিলেও বাস্তবে তাহা দেখিবার কেহ নাই। নাই সচেতনতামূলক কোনো প্রচারণাও। ফলে শুধু যে একের পর সিলিন্ডার বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটিতেছে তাহাই নহে, সেই সাথে বাড়িয়া চলিয়াছে যাত্রীদের নিরাপত্তার ঝুঁকিও।
অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে, দুর্ঘটনার মূলে রহিয়াছে নিম্নমানের সিলিন্ডার। চট্টগ্রামের সর্বশেষ দুর্ঘটনাটিও ইহার ব্যতিক্রম নহে। অথচ পেট্রোবাংলার অধীনস্থ সরকারি প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল) কর্তৃক অনুমোদিত নহে— এমন সিলিন্ডার ব্যবহারে সুস্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা রহিয়াছে। কিন্তু যথাযথ তদারকির ব্যবস্থা না থাকায় অবাধে নিম্নমানের সিলিন্ডার তৈরি ও বিক্রয় হইতেছে। দাম কম হওয়ার কারণে বাস-টেম্পু ও ট্রাকের মতো বাণিজ্যিক যানবাহনে সেইসব সিলিন্ডার ব্যবহূতও হইতেছে ব্যাপকভাবে। কিন্তু প্রতিকারের কোনো ব্যবস্থা দৃশ্যমান নহে। এমনকী অনুমোদিত সিলিন্ডারের ক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কিছু নিয়মকানুন রহিয়াছে। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, একটি সিলিন্ডারের মেয়াদ সর্বোচ্চ ১৫ বত্সর হইলেও সর্বোচ্চ পাঁচ বত্সরের মধ্যে ব্যবহূত সিলিন্ডারটি রি-টেস্টিং বা পুনঃপরীক্ষণ করা বাধ্যতামূলক। অথচ পুলিশের সংশ্লিষ্ট একজন কর্মকর্তাই স্বীকার করিয়াছেন যে সেই সময়সীমা উত্তীর্ণ হওয়া সত্ত্বেও সিএনজিচালিত একটি অটোরিকশার সিলিন্ডারও পুনঃপরীক্ষণ করা হয় নাই। অন্য যানবাহনগুলির চিত্রও তথৈবচ। সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষণের দায়িত্বপ্রাপ্ত একটি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা জানাইয়াছেন যে, গত তিন বত্সরে তাহারা প্রায় ১৩ শত গাড়ির সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষা করিয়াছেন। তন্মধ্যে ৩০টি গাড়ির সিলিন্ডারই ছিল ঝুঁকিপূর্ণ। আরপিজিসিএল-এর প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৩ সালের মার্চ পর্যন্ত সিএনজিচালিত যানবাহনের সংখ্যা ছিল প্রায় ২ লক্ষ ১০ হাজার। বাংলাদেশে যানবাহনে সিএনজির ব্যবহার শুরু হইয়াছে প্রায় ১০ বত্সর আগে। ইতিমধ্যে কতো সংখ্যক সিলিন্ডারের মেয়াদোত্তীর্ণ হইয়াছে এবং সিলিন্ডার পুনঃপরীক্ষণ করা হয় নাই এমন গাড়ির সংখ্যা কতো— তাহার খোঁজ কেহ রাখে বলিয়া তো মনে হয় না। ডিজেল, পেট্রোল বা অকটেনচালিত যানবাহনকে সিএনজিতে রূপান্তরের কাজটিও কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। ত্রুটিপূর্ণ সংযোজনের কারণেও দুর্ঘটনা ঘটিতে পারে। এইজন্য অনুমোদিত কোম্পানি রহিয়াছে। কিন্তু অসংখ্য অদক্ষ ও অননুমোদিত কারখানায় নিয়মিত রূপান্তরকরণের কাজ চলিতেছে। অতএব, সামগ্রিক অবস্থা কতোটা ভয়াবহ তাহা অনুমান করা কঠিন নহে।
আমরা জানি যে, বাংলাদেশের মতো দরিদ্র এবং প্রশাসনিকভাবে দুর্বল কোনো দেশের পক্ষে ইহার সমাধান সহজ নহে। কিন্তু বাস্তবতার দাবি হইল—হয় জরুরিভিত্তিতে ইহার যথাযথ প্রতিকারের ব্যবস্থা করিতে হইবে, অথবা অপেক্ষা করিতে হইবে আরও ভয়াবহ দুর্ঘটনার জন্য।
