সভ্যতা ধ্বংসের আশঙ্কা কেন করিতেছে নাসা

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২১:৩৭
শিল্পায়নভিত্তিক চলতি মানব সভ্যতা আগামী কয়েক দশকের মধ্যেই ধ্বংস হইয়া যাইবার আশঙ্কা প্রকাশ করিয়াছে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য ন্যাশনাল এরোনটিকস অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (নাসা)। প্রাকৃতিক বিজ্ঞানী ও সামাজিক বিজ্ঞানীদের সমন্বয়ে গঠিত নাসার একটি গবেষক দলের সদ্য প্রকাশিত গবেষণাতে এই আশঙ্কার কথা প্রকাশ ঘটিয়াছে। কি কারণে মানব সভ্যতা এমন এক আশঙ্কাজনক অবস্থাতে পৌঁছাইয়া গিয়াছে তাহা লইয়া গবেষণা করিতে যাইয়া বাছবিচারহীনভাবে প্রাকৃতিক সম্পদের অপব্যবহার এবং ক্রমবর্ধমান হারে সম্পদের অসম বণ্টনকে কারণ হিসাবে খুঁজিয়া পাইয়াছে বিজ্ঞানীরা। উল্লেখ করিবার বিষয় এই যে কেবলমাত্র সামপ্রতিক প্রবণতাগুলির দিকে দৃষ্টি ফেলিয়া এমত সিদ্ধান্তে উপনীত হন নাই বিজ্ঞানীরা। বরং মানবসভ্যতা ধ্বংস হইবার আশঙ্কা লইয়া গবেষণাকালে প্রাচীন সভ্যতাগুলির বিলুপ্ত হইবার কারণের সহিত বর্তমানের প্রবণতাগুলিকে হিউম্যান অ্যান্ড নেচার ডাইনামিক্যাল নামক একটি মডেল ব্যবহার করিয়া তথ্য-উপাত্তের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিকভাবে যাচাই করিয়া দেখিয়াছেন নাসার গবেষকদল। মানবের সহিত প্রকৃতির সম্পর্কের ধরন বিবেচনার মধ্যে লইয়া অতীতের বৃহত্ সভ্যতাগুলি বিলীন হইবার পিছনে জনসংখ্যা, পরিবেশ, পানি ও কৃষির মধ্যেকার আন্তঃসম্পর্ককে কারণ হিসাবে খুঁজিয়া পাইয়াছেন বিজ্ঞানীরা। প্রত্যেক ক্ষেত্রেই দেখা গিয়াছে যে প্রতিবেশের উপরে নির্বিচার চাপ সৃষ্টি এবং সমাজের মধ্যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এলিট এবং সাধারণ মানুষের ভেদাভেদ নির্মিত হইবার কারণেই গত পাঁচ হাজার বত্সরের সভ্যতাগুলি ধ্বংস হইয়াছিল। পরিতাপের বিষয় এই যে, পাঁচ হাজার বত্সরের ভয়াল অভিজ্ঞাতেও মানব সভ্যতা ধ্বংসের আশঙ্কা হইতে উত্তরিত হইতে ব্যর্থ হইয়াছে। গবেষকরা দেখিতে পাইয়াছেন যে অতীতের ন্যায় শিল্পভিত্তিক সভ্যতার যুগেও একই ঘটনা ঘটিয়া চলিয়াছে। যাচাইবাছাইহীন শিল্পায়নের সমর্থক লোকজন এই মর্মে আশাবাদ দেখাইয়া থাকেন যে, প্রযুক্তিগত বিপুল উন্নতি সংগঠনের মধ্য দিয়া মানবসভ্যতা যেই সংকটের মধ্যে পড়িয়াছে তাহা হইতে উত্তরণ লাভ সম্ভব হইবে। কিন্তু নাসার গবেষকেরা বলিতেছেন ভিন্ন কথা। তাহারা মনে করিতেছেন যে, প্রযুক্তির বিকাশ সম্পদ ব্যবহারের দক্ষতা বাড়াইয়া দেয় বটে, কিন্তু একই সঙ্গে ইহার ফলে সম্পদ আহরণের নির্বিচার মাত্রা এবং মাথাপিছু ভোগের মাত্রাও বাড়িয়া যায়। এমতাবস্থাতে যথাযথ নীতিমালার অনুপস্থিতিতে পরিস্থিতি বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত হইবার সমূহ সম্ভাবনা দেখা দেয়। সম্পদের যুক্তিহীন নির্বিচার ব্যবহার সমাজের সাধারণ মানুষের জীবনকে দ্রুত দুর্গতির দিকে ধাবিত করে, যাহার পরিণতিতে সামাজিক বিশৃঙ্খলা অবধারিত হইয়া পড়ে। অন্যদিকে, সম্পদের উপরে প্রভুত্ব কায়েম থাকিবার ফলে সমাজের এলিটেরা এই বাস্তবতা অনুধাবনে ব্যর্থ হয়। শুধু তাহাও নহে, নাসা গবেষকরা দেখিতে পাইয়াছেন যে, প্রত্যেক সমাজেই এলিটদিগের মধ্যে সব কিছু ঠিকঠাক হইয়া যাইবে মর্মে ধরিয়া লইয়া বসিয়া থাকিবার একটি প্রবণতা দেখা যায়। কিন্তু, ইতিহাস সাক্ষী, বাস্তবে পরিস্থিতি দেখা দেয় ভিন্নভাবে। ধ্বংস হইয়া যাওয়া সভ্যতাগুলিতে সাধারণ মানুষজনের কিছুটা পরে হইলেও শেষ অবধি এলিটেরা ধ্বংসের হাত হইতে কখনোই বাঁচিতে পারে নাই। ভবিষ্যতেও তেমন কিছু হইবে আশা করিবার কারণ নাই। এই জন্য নাসার গবেষকেরা দুইটি পন্থা বাতলাইয়াছেন—অর্থনৈতিক বৈষম্য প্রশমন এবং প্রকৃতিকে যথেচ্ছভাবে ভোগ করিবার বর্তমান প্রবণতাতে অনতিবিলম্বে রাশ টানিয়া ধরা। দেশে-দেশে রাজনীতিবিদ, সুশীল সমাজ, নীতি প্রণেতারা এই গবেষণাটিকে গুরুত্বের সহিত লইবেন? নাকি মানব সভ্যতা ধ্বংসের দোরে পৌঁছাইয়া যাওয়া অবধি তাহারা চাহিয়া চাহিয়া দেখিবেন?

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন