যদিও আমাদের সকল মুক্তির একমাত্র চাবিকাঠি গণতন্ত্র নয়। তবুও এদেশের মানুষ বিশ্বাস করে গণতান্ত্রিক ধারাই সকল নীতিহীনতা ও নৈরাজ্য থেকে আমাদের বেরিয়ে আসতে সাহায্য করবে। আমরা বিশ্বাস করতে চাই, আমাদের দেশের রাজনীতিবিদদের একটি বড় অংশ প্রকৃত অর্থে গণতন্ত্রে বিশ্বাসী। তারা ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থকে অতিক্রম করে গণমানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা করতে চান। ক্ষমতার রাজনীতির বাস্তবতার ভেতরে থেকেও বিপন্ন গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক মর্যাদায় ফিরিয়ে আনতে চান। প্রতিক্রিয়াশীল সাম্প্রদায়িক শক্তির সদম্ভ বেড়ে ওঠার অশুভ তত্পরতাকে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিংড়ানো তীক্ষ রশ্মি দিয়ে ঝলসে দিতে চান। দেশের সাধারণ মানুষের বড় অংশও এই সুন্দরের প্রতীক্ষায় উদ্বাহু। শুধু প্রয়োজন রাজনীতির ট্রেনটিকে সঠিক লাইনে তুলে দেয়া।
মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের গড়া বিএনপি তার জন্ম উেসর বিড়ম্বনা আড়াল করে হলেও গণতান্ত্রিক রাজনীতির ভিত রচনা করতে পারত। এতে বাংলাদেশের রাজনীতিতে গড়ে উঠতে পারত একটি সুষম প্রতিযোগিতা। ভারসাম্যের রাজনীতি শক্তিশালী করে তুলতে পারত দেশের গণতান্ত্রিক কাঠামো। কিন্তু তা হলো না। মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগকে জন্মলগ্ন থেকেই প্রবল প্রতিপক্ষ বিবেচনা করল বিএনপি। হয়ত বিএনপি নেতৃত্ব মনে করেছিল, আওয়ামী লীগের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা লালনকারী দল হিসাবে এই নতুন সংগঠন নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে না। অথবা মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দেশি-বিদেশি পরাজিত শক্তি যাদের প্রয়োজন ছিল বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ম্লান করে দেয়া। তারা বিএনপির মধ্যদিয়ে নতুন এক প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক দলের জন্ম দিতে চেয়েছিল। তাই মুক্তিযোদ্ধা জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক দল ও সরকারে অচিরেই জায়গা করে নিয়েছিল শাহ আজিজ, আবদুর রহমান বিশ্বাসের মতো স্বাধীনতা বিরোধীরা। ক্রমে এই দলটিতে নানা মতবাদের ডিগবাজি রাজনীতিতে পারদর্শী ব্যক্তিরা এসে জুটতে থাকেন।
স্বাধীনতা-উত্তর এবং পরবর্তী সময়ে আওয়ামী লীগের অনেক ভ্রান্ত রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং ইতিবাচক রাজনীতিতে দলীয় সামর্থ্য প্রয়োগের ব্যর্থতার পথ ধরে বিএনপি শক্ত অবস্থান তৈরি করে নেয়। ক্ষমতার রাজনীতির সুধা আকণ্ঠ পান করার জন্য বিএনপি শেষ পর্যন্ত জামায়াতে ইসলামীর সাথে জোট বেঁধে নিজ দলের অবস্থানকে স্পষ্ট করে তোলে। এভাবেই বিএনপি মুক্তিযুদ্ধবিরোধী জামায়াতকে রাজনৈতিক অঙ্গনে শক্ত ভিত্তি তৈরির সুযোগ এনে দেয়। ইতোমধ্যে বিএনপিকে জামায়াত এতটা আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে চলেছে যে, দলটির পক্ষে প্রকৃত গণতান্ত্রিক ধারায় ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিকট অতীতের সরকার বিরোধী আন্দোলনের নামে বিএনপি জামায়াতের শক্তি সাথে নিয়ে যে বীভত্স নৈরাজ্য তৈরি করেছিল তা বিএনপির বর্তমান গড়নটিকে স্পষ্ট করে দেয়।
রাজনীতির শুদ্ধপথ ছেড়ে নেতিবাচক পথে হাঁটতে গিয়ে বিএনপি বরঞ্চ আওয়ামী লীগের হাতেই বল তুলে দিয়েছিল। তাই পাঁচ বছরের শাসন দুর্বলতায় কোণঠাসা আওয়ামী লীগ পায়ের নীচে মাটি পেয়ে যায়। আওয়ামী লীগ নেতারা বিএনপির দুর্বল জায়গাগুলো সহজেই উপড়ে ফেলতে পারেন। তাই আন্দোলন দুর্বল করার জন্য হার্ডলাইন বেছে নেন অকপটে। নিজ ছকে আওয়ামী লীগ নির্বাচনও করে ফেলে। নিজ ভুলে ঘূর্ণিপাকে পড়ে চেঁচামেচিটাই সার হয়ে যায় বিএনপির।
আওয়ামী লীগের সিদ্ধান্তে অন্যায় অসঙ্গতি থাকলেও প্রতিপক্ষটি বিএনপি হওয়ায় আওয়ামী লীগ অনেকটা ওয়াক ওভারই পেয়ে যায়। ৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচন নিয়ে বিএনপির নানা অভিযোগে প্রায় ভোটারবিহীন নির্বাচন বলা হচ্ছে। আরেকটু আগ বাড়িয়ে বলা হচ্ছে, বিএনপির আহ্বানে মানুষ নির্বাচন বয়কট করেছে। সুশীল সমাজের অনেকেও এ প্রশ্নে সহমত প্রকাশ করেন। কিন্তু একটি বাস্তবতা অনেকের আলোচনা-সমালোচনায় বিশেষ জায়গা পাচ্ছে না। তা হচ্ছে গণতান্ত্রিক পথে সংকট তৈরি হয়েছিল কিনা!
এখন নির্বাচনী রাজনীতি গণতন্ত্রের সরল পথের চেয়ে কৌশলের পথেই হাঁটতে বেশি পছন্দ করে। ‘গণতন্ত্র’ আর ‘জনগণ’ শব্দ দুইটি রাজনীতিকরা ব্যবহার করেন নিজেদের আড়াল করার জন্য একটি খোলস তৈরি করতে। বিএনপি নির্বাচনে আসুক তা হয়তো আওয়ামী লীগ অন্তরে চায়নি। কিন্তু বিএনপি এই কৌশলকে আমলে আনবে না কেন? নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে নিজেদের অদূরদর্শিতাকে স্পষ্ট করলো। জামায়াতকে সাথী করে নির্বাচন প্রতিহত করার মত অগণতান্ত্রিক ডাকও দিয়ে ফেললো। শুধু ডাক নয়—নির্বাচনী বুথ ভাঙ্গা, আগুন দেয়া, বোমা ফাটানো, নির্বাচনী কর্মকর্তাদের আহত-নিহত করার ঘটনাও ঘটালো। সুতরাং এসত্য মানতেই হবে যে, ভোটার উপস্থিতির হার কম হওয়া মানুষের স্বতঃস্ফূর্তভাবে নির্বাচন বর্জন নয়- ভীতি ছড়ানোর প্রতিক্রিয়ায়ই হয়েছে। তাছাড়া সঙ্গত কারণেই বিএনপি ও জামায়াতভক্ত ভোটারদের বড় অংশ ভোট দিতে আসবে না এ তো অবধারিতই ছিল। সুতরাং এমন বাস্তবতায় আওয়ামী লীগের ওপর থেকে অভিযোগের ভার অনেকটাই কমিয়ে দেবে বিএনপির ভ্রান্ত কৌশল।
কিন্তু ক্ষমতার রাজনীতির বিলাসী মানুষগুলো কেন ভুলে যায়, সুষ্ঠু নির্বাচনে সাধারণ ভোটারের রায়ই প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণ করে। আর এই মূল্যবান ভোটাররা গোষ্ঠী বা ব্যক্তিস্বার্থে তাড়িত হন না। যদি যুক্তি বিপর্যস্ত হয়—সৌন্দর্য লাঞ্ছিত হয়, তবে কোনো বিশেষ দলীয় আদর্শও শেষ পর্যন্ত তাদের মোহাবিষ্ট করে রাখতে পারে না। এই সহজ সত্যটি মেনে নিতে বার বার ব্যর্থ হন ক্ষমতাপ্রত্যাশী নেতৃত্ব। মুক্তচিন্তার মানুষ বিশ্বাস করে সরকার পক্ষকে অবিশ্বাস করার চেয়ে সাধারণ মানুষকে বিশ্বাস করা বিএনপির জন্য আবশ্যিক ছিল। কিন্তু আত্মবিশ্বাসী হতে পারেনি বিএনপি নেতৃত্ব। সাম্প্রদায়িক রাজনীতির পৃষ্ঠপোষকতা, মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে লাঞ্ছিত করা, সীমাহীন দুর্নীতির কলঙ্ক গায়ে জড়ানোর অতীত আন্দোলনের নামে জনজীবনকে বিপর্যস্ত করার নিকট অতীত তাঁদের তাড়িয়ে বেড়িয়েছে। এদেশের মানুষ কিন্তু গণতন্ত্রের পথেই হাঁটতে চেয়েছে। সাধারণ মানুষের বিবেচনাকে অস্বীকার করা বিএনপি নেতৃত্বের একটি বড় ভুল বলে আমাদের মনে হয়েছে।
আমাদের ধারণা, বিএনপি নেতৃত্ব অনেক কিছু হারিয়ে এখন ভুল বুঝতে পেরেছে। এটি শুভ লক্ষণ। জাতীয় নির্বাচনের আগে নির্বাচন বর্জন ছিল একমাত্র লক্ষ্য। উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল উত্সাহিত করছে বিএনপিকে। এখন স্বয়ং খালেদা জিয়া নির্বাচনের পক্ষে কথা বলে যাচ্ছেন। তবে আমাদের ধারণা, জামায়াতকে সাথে জড়িয়ে বিএনপি এসময়ের বাস্তবতায় অনেক দূর যেতে পারবে না।
আওয়ামী লীগ নিজেকে শুধরিয়ে বিএনপির পথ চলা বন্ধুর করে দিতে পারতো। কিন্তু মনে হয় না, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব নিজেদের চিনতে পারছেন। যেসব ভুলের কারণে গত নির্বাচনটি নিজেদের জন্য দুর্ভাবনাময় করে ফেলেছিলেন বিশ্বাস ছিল তা থেকে বেরিয়ে আসবেন তারা। তাই জোড়াতালির নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় ফিরে আসতে হয়েছিল। আশাবাদী মানুষ ভেবেছিল, ভুল শোধরানোর এই সুযোগটা শুরু থেকেই গ্রহণ করবে আওয়ামী লীগ। দলীয়করণের কঠিন বেড়াজাল থেকে বেরিয়ে এসে স্বচ্ছ জনকল্যাণমুখী শাসন প্রতিষ্ঠা করে জনআস্থা ফিরিয়ে আনবে। কিন্তু সরকার সেপথে হাঁটছে বলে মনে হয় না। আমাদের বিশ্বাস, বিরোধী দলের ওপর দমন নীতি চালানোর চেয়ে সুশাসন প্রতিষ্ঠার দিকে মনোযোগ দিলে অনেক বেশি ফল লাভ করতে পারতো আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগ সরকারের একটাই সুবিধা যে, এর প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি। যে দল নিজ কৃতকর্মের কারণেই একান্ত অন্ধ অনুসারী ছাড়া সমর্থন বাড়াতে পারেনি। তাই নানা প্রতিবন্ধকতা থাকবে জেনেও জামায়াতকে পরিত্যাগ করতে পারছে না। এমন বাস্তবতায় বিশ্বাস করা কঠিন যে, বিএনপি রাজনীতির মাঠে একা হাঁটার আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারবে।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব হামবড়া ভাব পরিত্যাগ করে যদি প্রকৃত অর্থে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় নিজেরা উদ্ভাসিত হতেন এবং প্রজন্মের কাছে এই চেতনা ছড়িয়ে দেয়ার দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারতেন তাতে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের মর্যাদা যেমন বাড়তো, দেশেরও কল্যাণ সাধিত হতো।
স্বাধীনতার এই মাসে মুক্তিযুদ্ধস্নাত মানুষ কিন্তু আত্মচৈতন্যে ফিরে যেতে চায়। এই সময়গুলো বিএনপির জন্য সুখপ্রদ নয়। মুক্তিযুদ্ধের সংশ্লিষ্টতা থেকে যে সম্মান ধারণ করতে পারতো বিএনপি তা শুরুতেই নষ্ট করে ফেলেছে অবহেলায়। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সেক্টর কমাণ্ডারের গৌরব ছিল বিএনপি প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের। এ ঐতিহাসিক সত্যকে সামনে রেখে বিএনপিকে উজ্জ্বল করা যেতো। তার বদলে দলটির জন্মলগ্ন থেকে পাকিস্তান প্রীতি ও মুক্তিযুদ্ধ বিরোধীদের কাছে টেনে আনা মানুষকে সন্দিগ্ধ করে তোলে। জিয়াউর রহমান নিহত হওয়ার পর দলটিকে আরো লাঞ্ছিত করা হলো জিয়াউর রহমানকে স্বাধীনতার ঘোষক বানিয়ে এবং ১৫ আগস্ট বেগম জিয়ার জন্মদিন আবিষ্কারের মধ্যদিয়ে। এসবের সাথে যুক্ত হয়েছে ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি নেতা-মন্ত্রীদের কিংবদন্তী তুল্য দুর্নীতি। এইসব ঘেরাটোপ থেকে বিএনপি কীভাবে বেরুতে পারবে তা নিয়ে ভাবতে হবে বিএনপি নেতা-নেত্রীদের।
আওয়ামী লীগ নেতৃত্বেরও মানুষ ঘনিষ্ঠ হতে হবে। সমালোচনা পক্ষে না গেলে স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও শব্দচয়নে যেভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে ব্যর্থ হন তা শুভ লক্ষণ ধারণ করে না। আমরা কল্পতরু থেকে সকল পক্ষকেই নেমে আসতে অনুরোধ করবো। বিজয়ের এই মাসে মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ধারণ করে আমাদের রাজনীতি ও ‘রাজাদর্শ’ জনকল্যাণমুখী হোক, প্রতিষ্ঠা পাক গণতন্ত্র-এর আপন অবয়বে এমনই প্রত্যাশা বিপন্ন জাতির।
লেখক :অধ্যাপক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]
