বাংলাদেশ নদীমাতৃক দেশ। সমাজ গঠনে নদীর ভূমিকা প্রাচীনকাল থেকেই প্রাধান্য পেয়ে আসছে। নদী মানুষের জীবনে অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। নদ-নদীর অববাহিকায় গড়ে উঠেছে মানব সভ্যতার ইতিহাস। দেশের কৃষিকাজ, বিদ্যুত্, পানি সেচ ব্যবস্থা সুলভ, পানিপথে পরিবহন, পানীয়জলের জোগান, মত্স্য উত্পাদন, শহর ও শিল্পকেন্দ্রের প্রয়োজনীয় পানি সরবরাহ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের নদ-নদীর প্রভাব খুবই বেশি।
কিন্তু প্রাকৃতিক ভারসাম্য হ্রাসের ফলে নদী দিন-দিন হারিয়ে ফেলছে তার নাব্যতা। নির্বিচারে বন ধ্বংসের কারণে পাহাড়ের মাটি আগের মতো বৃষ্টির পানি ধরে রাখতে না-পারায় থাকে না মাটি চোঁয়া পানি। ফলে শুকনা মৌসুমে নদী, ছড়াতে থাকে না পানি। পার্বত্য অঞ্চলের নদীগুলো খরার প্রকোপে পানিহীনতায় ভুগছে। বন ধ্বংসের ফলে নদী ও ছড়া পানি ধারণ ক্ষমতা হারিয়েছে। নদীর পানি ভাসিয়ে আনে বাঁশ, পাহাড়ে উত্পাদিত জুমের ফসল। নদীতে মাছ ধরে মত্স্যজীবীরা তাদের জীবিকা নির্বাহ করে আসছে। নদীপথে নৌকায় গ্রাম্য জীবনের মানুষ যাতায়াত করে। ভূগর্ভে পানির স্তর নিম্নমুখী, তাই মানুষের পানির চাহিদা পূরণ করতে প্রযুক্তি অবলম্বন করে নদীর প্রাকৃতিক পানিকে ব্যবহার করছে। উপজাতীয় অঞ্চলে ছড়ার পানি একমাত্র পানীয়। নদী, ছড়ায় বাঁধ দিয়ে সেচ প্রকল্প গড়ে উঠেছে। প্রায় নদীতে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের মাধ্যমে পানিশোধনাগারে নদীর পানি পরিশ্রুত করে লক্ষ মানুষের পানীয় জলের জোগান দিচ্ছে। বায়ু পানি বৃষ্টি ব্যতীত জীবপ্রাণ ধ্বংস। পানিমণ্ডলের মহাসমুদ্রের চেয়ে নদীর গুরুত্ব মানুষের কাছে অনেক তাত্পর্যপূর্ণ। নদী, ছড়ার পানি পান করে বন্যরাও বেঁচে আছে। পাহাড় হতেই নদী ছড়ার সৃষ্টি। নদী পরিবেশের বিশেষ অঙ্গ, মানুষের কাছে নদীর গুরুত্ব অপরিসীম। যমুনা নদীর তীরে অবস্থিত পৃথিবীর সাতটি আশ্চর্য সৃষ্টির মধ্যে একটি তাজমহল। নদী দূষণ সম্পর্কে মানুষের অবচেতনার ফলে নদী বা ছড়ার বালুচরে খোলা আকাশের নীচে মুক্ত পায়খানা, নদীতে ভাসমান মৃত গবাদিপশুর দেহ মাটিতে পুঁতে না-দিয়ে নদীর পানিতে ফেলে দেয়ার রীতি রয়েছে। সমপ্রতি পরিবেশ বিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধির সুবাদে সর্বাধিক স্বাস্থ্য বিধান প্রকল্পে আজকাল নদীতে মুক্ত পায়খানা করার কুঅভ্যাস অনেকাংশে কমে গেছে। নদী ও ছড়া নাগরিক জীবনের সম্পদ হিসাবে প্রদান করছে মুক্তপানি, বিদ্যুত্, সেচ, নদীর বালু-পাথর, মত্স্যজাতীয় সুষম খাদ্য। নদীর চরে উর্বর পলিমাটিতে উত্পন্ন হয় সবুজ ফসল, শাক-সবজি। নদীর খরস্রোতে ভেসে আসছে জ্বালানি কাঠ, মানুষ তা সানন্দে সংগ্রহ করছে।
পুরাকালে শীতের মৌসুমে পাহাড়িরা নদীতে মাছ শিকারের উদ্দেশ্যে প্রাকৃতিক বিষ প্রয়োগ করতো। স্যালারলতা নামে এক জাতীয় বিষাক্ত লতার রস নদীর পানিতে মিশিয়ে দিতো। এতে কিছু সময়ের জন্য মাছের চোখ অন্ধকার হয়ে যেতো। শত শত মানুষ আনন্দে উল্লাসে নদীতে মাছ ধরার জন্য দল বেঁধে নেমে পড়তো।
এখন নদী ও ছড়ার পানিতে বিষ মিশিয়ে মাছ ধরার কাণ্ড নিত্য-নৈমিত্তিক ঘটনা। যার ফলে নদীর কোলে প্রকৃতিতে উত্পন্ন ছোটো বড় মাছ, কাঁকড়া, ঝিনুক, শামুক, কচ্ছপ, ব্যাঙ প্রভৃতি জলজ প্রাণী বংশানুক্রমে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। এতে মত্স্যজীবীরা সমূলে বিপন্ন হচ্ছে। ঔষধিগুণসম্পন্ন বহু মাছ আজকাল নদীতে দুষপ্রাপ্য। নদীতে এক ধরনের ব্যাকটেরিয়া থাকে যা নদীর পানিকে দূষণমুক্ত রাখতে সাহায্য করে। নদীতে বিষাক্ত বিষ প্রয়োগের চরম প্রবণতায় পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষাকারী জীবাণুরা বিলুপ্ত হতে চলেছে। রাসায়নিক বিষ কৃষকের জমিতে ক্ষতিকারক কীট-পতঙ্গ রোধ করার জন্য আবিষ্কৃত হয়েছে। বিষ জীববৈচিত্র্যের জীব-জন্তু, পাখি, মাছ নিধনের জন্য নয়। বিষে মারা মাছ খেয়ে অনেকেই অসুস্থ হয়ে পড়েন। বিষে মারা মাছে রাসায়নিক বিষাক্ত অণু থেকে যায়। এই মাছ ভক্ষণে শারীরিক পঙ্গুত্বের ভয় থাকে। পাহাড়ি ছড়াতে ক্ষুদ্র প্রজাতির মাছ, শামুক, কাঁকড়া, ঝিনুক উত্পন্ন হয়। এইসব বনবাসী জীবনের প্রিয় খাদ্য। ছড়াতে বিষ দেয়ার ফলে এদের বংশবিস্তার ক্রমান্বয়ে লুপ্ত হতে চলেছে। নদীর উন্মুক্ত চর পশু-পাখিদের বিচরণ ভূমি। বিষাক্ত নদীর পানি পান করে গবাদিপশু গরু, শূকর, ছাগল মারা যাচ্ছে। নদীর মাছের স্বাদ অতুলীয়। নদী ও ছড়ার মাছের স্বাদের জন্য নদীর মাছের চাহিদা অনেকগুণ বেশি।
মত্স্যজীবীদের বাঁচাতে নদী দূষণ নিয়ন্ত্রণ আইন সংশোধন করে অধিক ক্ষমতা প্রদান করতে হবে। বিষ প্রয়োগে মত্স্য নিধন নিষিদ্ধ করতে এবং বিষ প্রয়োগকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির সময়োচিত বিধান তৈরিতে সরকারকে উদ্যোগী হতে হবে। বিভিন্ন জেলার দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্যদ নদী দূষণের প্রতিক্রিয়া নিয়ে বিন্দুমাত্র ভাবছে না। নদীতে বিষ প্রয়োগকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসাবে সরকার প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনায় পুলিশি আইনে বলবত্ ও রূপান্তরে বিধিসম্মত জনহিতকর নীতি গ্রহণ করতে দাবি জানাচ্ছে পরিবেশপ্রেমী বুদ্ধিজীবীমহল। নদী ও ছড়ার স্নিগ্ধ তীরে পশু-পাখিদের বিচরণ ভূমি। সমপ্রতি সংবাদপত্রে প্রকাশ, পশু-পাখিরা নদীর বিষাক্ত পানি পান করে প্রাণ হারাচ্ছে। নদীতে বিষ প্রয়োগে মাছধরা বন্ধ করতে পরিবেশ সচেতনতা অভিযান সফল করা দরকার। নদীতে বিষ প্রয়োগের ফলে ভয়ঙ্কর পরিবেশ দূষণ মানব সভ্যতার কাছে এক অশনি সংকেত।
লেখক :সাংবাদিক-কলামিস্ট
