শিক্ষা ব্যবস্থা

তোতাকাহিনী শেষ হয়নি এখনও

আপডেট : ২০ মার্চ ২০১৪, ২১:৩৮
রবীন্দ্রনাথের ‘তোতাকাহিনী’ আমাদের অনেকেরই জানা আছে। “এক-যে ছিল পাখি। সে ছিল মূর্খ। সে গান গাহিত, শাস্ত্র পড়িত না। লাফাইত, উড়িত, জানিত না কায়দা-কানুন কাকে বলে। রাজা বলিলেন, ‘এমন পাখি তো কাজে লাগে না, অথচ বনের ফল খাইয়া রাজহাটে ফলের বাজারে লোকসান ঘটায়।’ মন্ত্রীকে ডাকিয়া বলিলেন, ‘পাখিটাকে শিক্ষা দাও।’ তারপর পাখিটাকে শিক্ষা দিতে বন্দী করা হল। পণ্ডিতরা লেগে পড়লেন তাকে পুথিগত শিক্ষায় শিক্ষিত করতে। কিছুতেই উপায় না পেয়ে পণ্ডিতরা তোতার পেট ঠেসে ভরে দিলেন পুথির কাগজ। তাতে যা হওয়ার তাই হলো। পাখিটা গেল মরে। তারপর রাজা পাখিটাকে টিপে দেখলেন, সে হাঁ করল না, হুঁ করল না। কেবল তার পেটের মধ্যে পুথির শুকনো পাতা খস্খস্ গজ্গজ্ করতে লাগল। রাজা ভাবলেন, উচিত শিক্ষা হয়েছে। আমাদের মুখস্থ বিদ্যাও যেন ওই তোতা পাখির মতো। ছোটবেলায় আমার বন্ধু কিশোর সারাদিন ধরে পড়া মুখস্থ করতো। ‘ইএটি’ ইট মানে ‘খাই’, এটাকে মুখস্থ করতে গিয়ে সে জোরে জোরে বলত—‘ইট খাই’, ‘ইট খাই’। মজার ব্যাপার হলো, বিশ্বের অধিকাংশ দেশের থেকেই বাংলাদেশের শিশুরা স্কুলে পড়াশুনা করে বেশি সময় কাটায়। এমনকি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের শিশুদের থেকেও। মার্কিন শিক্ষা দপ্তরের কর্মকর্তারা নিজেদের দেশের স্কুল শিক্ষা ব্যবস্থার সাম্প্রতিক এক সমীক্ষায় এমন কথাও বলেছেন যে, তাদের শিশুরা ভারতীয় উপমহাদেশের শিশুদের থেকে পড়াশোনায় সময় দেয়ার ব্যাপারে কিছুটা পিছিয়ে পড়েছে। পিছিয়ে পড়েছে মার্কিন শিশুরা? শুনতে বিস্ময় লাগে। আসলে বাস্তবতা সম্পূর্ণ বিপরীত। স্কুলে দীর্ঘক্ষণ সময় কাটানোর ক্ষেত্রে বাংলাদেশের শিশুরা অন্যান্য বহু দেশের শিশুদের থেকে এগিয়ে থাকলেই কি তারা শেখেও অনেক বেশি? আমরা জানি, ঘটনা তা নয়। ঘটনা এটাই যে, আমাদের স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থার গোড়াতেই এমন কিছু গলদ আছে যা শিশুদের প্রকৃত পঠনপাঠনের পথে অন্তরায়। এর জন্য সৃজনশীল ব্যবস্থা করা হয়েছে বটে, কিন্তু মানসিকভাবেই আমরা যেন মুখস্ত বিদ্যার দাস। তাই ওই সৃজনশীল ব্যবস্থার ভেতরেও ফাঁকি খুঁজি কীভাবে মুখস্থ করেই পাসের বৈতরণী পার হওয়া যায়। পাস করা অবশ্য এখন অনেক সহজ। পরীক্ষায় পাস করিয়ে দেয়ার ব্যাপারে সরকারের নাকি চাপও থাকে। যে বেসরকারি স্কুলে পাসের হার কম, সেই স্কুল তত বেশি বিপদে পড়ে। শিক্ষা ব্যবস্থায় পাস-ফেল আর গ্রেডই শেষ কথা যেন। আমাদের প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পরিকাঠামো নিশ্চয়ই আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্নত হয়েছে। তারপরও শিশুদের শৌচাগার, পানীয় জলের ব্যবস্থাসহ অন্যান্য পরিকাঠামো তো দূরের কথা, বহু এলাকার প্রাথমিক স্কুলের মূল স্কুল বাড়িটির এমনই অবস্থা যে, বর্ষাকালে সেখানে ক্লাস করাই সম্ভব হয় না। তাই বেশির ভাগ শিশুরা এখনও কোনো রকমে শিক্ষা গ্রহণ করে। তারা হয়তো দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে সময় পার করে, কিন্তু তার বড় একটি অংশ যে অকারণে অপচয় হয় মাত্র, সে কথা আমরা সবাই জানি। এই অবস্থা নিশ্চয়ই আস্তে আস্তে আরও পরিবর্তিত হবে। কিন্তু বিপদ আরও আছে। প্রাথমিক শিক্ষা টপকে যত উপরে ওঠা যায়, ততই স্কুলশিক্ষা ব্যবস্থাটা যেন চাকরির বাজারের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হতে থাকে। বিশেষ কিছু বিষয়কে চাকরি ক্ষেত্র হিসেবে ধরা হয়। মেধাবীদের সাফল্যের সহায়ক হিসাবে চিহ্নিত করা হয় সেসব বিষয়ের ওপর পড়ালেখার সক্ষমতা নিয়ে। নিজস্ব মেধা বা আগ্রহ নির্বিশেষে প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে যেন সেইসব বিষয়ে পারদর্শী করে তোলারই একটি বৃহত্ কারখানার নাম ‘স্কুল’। এটা অনেক ক্ষেত্রেই লাখ লাখ শিশুর নিজস্ব ক্ষমতার বিকাশকে উপেক্ষা করে। সুতরাং আমাদের ছাত্ররা যত ঘণ্টাই স্কুলে কাটাতে বাধ্য হোক না কেন, তা নিয়ে বড় তৃপ্তির সুযোগ নেই। তাই ‘তোতাকাহিনী’ শেষ হয়নি এখনও। লেখক :সাংবাদিক, শিক্ষক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন