শতবর্ষী বিশ্বখ্যাত ভারতীয় লেখক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট খুশবন্ত সিং পরলোকগমন করিয়াছেন। গত বৃহস্পতিবার দিল্লিতে নিজ বাসভবনে তিনি মারা যান। তাঁহার মৃত্যুতে একটি অধ্যায়ের অবসান ঘটিল। তিনি কেবল ভারতবিভাগকালীন রক্তাক্ত ও লজ্জাকর ইতিহাসের নীরব সাক্ষী কিংবা ভুক্তভোগীই ছিলেন না, তাহার অসামান্য রূপকারও বটে। ইহা সুবিদিত যে, ভারতবিভাগকে কেন্দ্র করিয়া সৃষ্ট অনভিপ্রেত ঘটনাপ্রবাহে বহু নিরপরাধ মানুষকে নৃশংসভাবে প্রাণ দিতে হইয়াছে। শিকার হইতে হইয়াছে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ ও লাঞ্ছনার। তছনছ হইয়া গিয়াছে আরও অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা। খুশবন্ত সিং তাহার কালজয়ী উপন্যাস ‘ট্রেন টু পাকিস্তান’-এ ইতিহাসের কলঙ্কজনক সেই অধ্যায়টির যেই মর্মস্পর্শী বিবরণ তুলিয়া ধরিয়াছেন তাহা যুগ যুগ ধরিয়া ধর্ম-বর্ণ-অঞ্চল নির্বিশেষে সর্বস্তরের মানুষের হূদয়কে আলোড়িত করিবে। তাহাদের মধ্যে জাগাইয়া তুলিবে মনুষ্যত্বের বোধ। তবে বহুমাত্রিক লেখক খুশবন্ত সিংয়ের বিশাল সৃষ্টিসম্ভারের ইহা এক সামান্য উদাহরণ মাত্র। শিল্প-সাহিত্য ও সাংবাদিকতার নানা ক্ষেত্রে তাঁহার অবদান এতো ব্যাপক যে, এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে ইহার যথাযথ মূল্যায়ন সম্ভব নহে। শোকবিহ্বল এই সময়ে আমরা কেবল অক্লান্ত, অকুতোভয় ও স্পষ্টভাষী এই মানুষটির প্রতি আমাদের অকৃত্রিম শ্রদ্ধা ও ভালোবাসাই নিবেদন করিতে পারি।
দীর্ঘ বর্ণাঢ্য জীবনের অধিকারী খুশবন্ত সিং ১৯১৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারি অবিভক্ত ভারতের পাঞ্জাবের হাদালিতে জন্মগ্রহণ করেন—যাহা বর্তমানে পাকিস্তানের অংশ। দেশভাগের পর তিনি দিল্লিতে চলিয়া আসেন স্থায়ীভাবে। জীবনের শুরুতে আইনজীবী ও কূটনীতিকের মর্যাদাজনক পেশা অবলম্বন করিলেও শেষাবধি সত্যিকারের সৃজনশীল জীবনকেই বাছিয়া লইয়াছিলেন সার্বক্ষণিকভাবে। আমৃত্যু সেখানেই সমর্পিত ছিলেন। ত্রিশটির অধিক উপন্যাস, বহু ছোটগল্প এবং নানা বিষয়ে অসংখ্য কলাম লিখিয়াছেন তিনি। তাহার মধ্যে ‘আই শ্যাল নট হিয়ার দ্য নাইটিঙ্গেল’, ‘অ্যা হিস্ট্রি অব দ্য শিখস’, ‘দিল্লি’ এবং আত্মজীবনীমূলক রচনা ‘ট্রুথ, লাভ অ্যান্ড আ লিটল ম্যালিস’ প্রভৃতি ব্যাপক পাঠকপ্রিয়তা পাইয়াছে। সত্তরের ও আশির দশকে ‘দ্য হিন্দুস্তান টাইমস’ ও ‘দ্য ন্যাশনাল হেরাল্ড’ পত্রিকার সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করিয়াছেন। ভারতের তৃতীয় সর্বোচ্চ রাষ্ট্রীয় বেসামরিক পদক ‘পদ্মভূষণ’ অর্জন করিয়াছিলেন ১৯৭৪ সালে। কিন্তু অমৃতসরের স্বর্ণমন্দিরে দুর্ভাগ্যজনক ঘটনার প্রতিবাদে তাহা ফিরাইয়া দিয়াছিলেন। পরে অবশ্য ভারতের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক পদক ‘পদ্মবিভূষণ’ও অর্জন করিয়াছেন। তবে ইহা নির্দ্বিধায় বলা চলে যে, কোনো রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি না পাইলেও সৃষ্টিকর্মের মাধ্যমে বিশ্ববাসীর চিত্তে তিনি যে মর্যাদার আসন লাভ করিয়াছেন—তাহা এতোটুকু মলিন হইত না।
