বাসা-বাড়িতে কিংবা উত্সবে বিভিন্ন সময় রসনা তৃপ্তির সহিত যাহা খাই, আমরা এখন জানি, তাহার কিছু কিছু সত্যিকারেই ‘স্লো পয়জন’। বলা হইয়া থাকে যে, অল্প অল্প করিয়া খাইলে মানুষ ‘বিষ’ও হজম করিয়া ফেলে। আপাতদৃষ্টে তাহা মিথ্যা নহে। স্লো পয়জনে মানুষ তত্ক্ষণাত্ মরে না। কিন্তু মরণব্যাধি যে শিহরে আসন পাতিবার তোড়জোর করে—তাহা বিজ্ঞান স্বীকৃত। আমরা না-জানিয়া, কিংবা জানিয়া শুনিয়াই বিষ করিতেছি পান। সেই বিষে আমাদের কিডনি, যকৃত্ এবং মস্তিষ্কও ‘নীল’ হইয়া যাইতে পারে অবশেষে। শিয়রে সমন যেন হাসিতেছে বাঁকা ঠোঁটে।
যেই মাছ-মুরগি আমাদের পাতে না থাকিলে খাদ্যতালিকা সম্পূর্ণ হয় না, তাহা প্রধানত বিভিন্ন খামারে উত্পাদিত হয়। কীভাবে উত্পাদিত হয়—তাহা কয়জনাই বা জানি? ইত্তেফাকসহ বিভিন্ন পত্রিকান্তরে প্রকাশিত হইয়াছে, ট্যানারিতে অব্যবহূত ঝুট চামড়ার গুঁড়া মিশিয়ে মাছ-মুরগির খাবার তৈরি করে এক শ্রেণীর কারখানা। চামড়া প্রক্রিয়াজাতের সময় উহার ডাস্ট বাহির করিতে শেষাবধি প্রায় ২০ রকমের কেমিক্যাল ব্যবহার করা হয়। ইহার মধ্যে সর্বাধিক ভয়াবহ পদার্থটির নাম হইল—ক্রোমিয়াম। এই বিপজ্জনক ভারী পদার্থটিকে মাটিও সহজে হজম করিতে পারে না। আর চামড়ার গুঁড়ায় মিশিয়া যাওয়া এই ক্রেমিয়াম ঢুকিয়া পড়ে পোলট্রি খাদ্যের ভিতরে। কোনো মাছ বা মুরগিকে লাগাতার দুই মাস ওই বিষাক্ত খাবার খাওয়ানো হইলে তাহাদের শরীরে শূন্য দশমিক তিন মিলিগ্রাম হইতে প্রায় সাড়ে চার মিলিগ্রাম পর্যন্ত ‘ক্রোমিয়াম’ জমা হয়, যাহা মানবদেহের সহনীয় মাত্রা হইতে কয়েকশত গুণ বেশি। মাত্রাতিরিক্ত এই ‘ক্রোমিয়াম’ মানবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ বিশেষ করিয়া যকৃত্, কিডনি ও মস্তিষ্কে জমা হইতে থাকে এবং ধীরে ধীরে ওই সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বিকল করিবার বন্দোবস্ত করে। দেশে মরণব্যাধি বর্তমানে আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাইবার ইহাও অন্যতম কারণ বলিয়া মনে করে অনেক গবেষক। সুতরাং বিষয়টি কতোটা ভয়াবহ ও ঝুঁকিপূর্ণ তাহার বিস্তারিত ব্যাখ্যা অনাবশ্যক।
ব্যবসার উদ্দেশ্য নিশ্চয়ই লাভ করা। কিন্তু তাহা কি যেকোনো উপায়ে, যেনতেন ভাবে, নীতি-নৈতিকতা ও মানবকিতা বিসর্জন দিয়া? অথচ তাহাই করিতেছেন কিছু কিছু ব্যবসায়ী। কেননা, মুরগি ও মাছের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার প্রতি কেজির দাম ৬০ হইতে ৭০ টাকা। আর ট্যানারির বর্জ্যে তৈরি প্রতি কেজি খাবারের দাম কিনা মাত্র ১০ হইতে ১৫ টাকা! কিছু মুরগির খামার মালিক ও মাছ চাষিরা মাত্রাতিরিক্ত মুনাফার লোভের বশেই এই বিষাক্ত খাবার ক্রয় করিতেছেন। কিন্তু দোষ কি শুধু তাহাদের? যদি বিষাক্ত পোলট্রি খাবার উত্পাদনই না হইত, তবে তাহারা ক্রয় করিত কোথা হইতে? দোষ মূলত উভয় পক্ষের। প্রশ্ন হইল, এইরূপ দুষ্কর্ম (ক্রয় করা বা উত্পাদন করা) যাহারা করেন, তাহারা কি সত্যই জানেন না ইহার ভয়াবহ দিক? নাকি তাহারা সব জানিয়াও অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বুঁদ হইয়া বিসর্জন দেন সকল ধরনের ন্যায়-নীতি? ইহা তাহাদের অতি দৈন্য মানসিকতা বলিলেও কম বলা হয়।
রাষ্ট্র হিসাবে আমরা এমন জায়গায় এখনও পৌঁছাইতে পারি নাই যে, সকল অনিয়ম ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডের ব্যাপারে সহস্র চক্ষু খোলা রহিবে অহর্নিশ। তৃতীয় বিশ্বের কোনো দেশেরই এত নজরদারি চক্ষু নাই। সুতরাং রাষ্ট্রের নজরদারিতে যাহা ধরা পড়ে, তাহা হিমশৈলীর দৃশ্যমান উপরিভাগ মাত্র, সিংহভাগই আড়ালে রহিয়া যায়। এইখানেই প্রশ্ন আসে নীতি ও নৈতিকতার। যেনতেনভাবে অতি মুনাফার মানসিকতার দৈন্য দিকটা একটি জাতিকে পিছনের দিকে টানিয়া ধরিতে চাহে। সম্মিলিতভাবে কোনো জাতি এই দীনতা ত্যাগ না করিলে, নীতি নৈতিকতাকে জীবনের ‘তুলাদণ্ড’ না বানাইলে শুধু পুলিশি নজরদারিতে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নহে।
