বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম এবং মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির জন্য অহংকার ও মাথানত না করা সবচাইতে গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায়। একজন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আমরা ৭১ এর জয়যাত্রার আবেগ দমিয়ে রাখতে পারি না। বর্তমান বাংলাদেশে বিভিন্ন শ্রেণী পেশায় ও রাজনৈতিক দলে অনেকেই মুক্তিযোদ্ধা আছেন। কিন্তু আমাদের বিভক্তির কারণে স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাস ও মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আজ বিকৃত করা হচ্ছে বিভিন্নভাবে। এখানে বলে রাখি, ১৯৭১ সালে আমি মুক্তিযুদ্ধ করেছি আমার নিজ জেলা চাঁদপুরে। মুক্তিযুদ্ধের কথা লিখতে হলে অবশ্যই মুক্তিযুদ্ধের সত্য সঠিক কথা লিখতে হবে, কিন্তু আমাদের দেশের বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের দৃষ্টিভঙ্গি মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে নয়। আমরা বাঙালিরা মুক্তিযুদ্ধ করেছি, অবশ্যই একটি স্বাধীন সার্বভৌম অসামপ্রদায়িক শোষণহীন সমাজব্যবস্থার জন্য। বাংলা, বাঙালি জাতির স্বাধীনতার ও জাতীয় মুক্তির এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য দুরদৃষ্টিসম্পন্ন নির্ভীক, প্রকৃত দেশপ্রেমিক নেতার দরকার এবং অত্যাবশ্যক হয়ে পড়ে, যার দায়িত্ব নিয়েছিলেন স্বয়ং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান নিজেই। মাত্র ৪৫ বত্সর বয়সেই বাঙালি জাতির মুক্তির সনদ ছয় দফা দাবি ১৯৬৬ইং সালে ০৫ ও ০৬ই ফেব্রুয়ারি লাহোরে সর্বদলীয় রাজনৈতিক নেতাদের গোলটেবিল বৈঠকে তিনিই উপস্থাপন করেছিলেন বলেই ১৯৬৬, ১৯৬৭, ১৯৬৮, ১৯৬৯, ১৯৭০, ১৯৭১ইং সালে বাঙালিরা স্বমহিমায় আত্মপ্রকাশে সাহস অর্জন করেছিল। পৃথিবীর যতগুলো দেশ স্বাধীন হয়েছে সেগুলোর প্রতিটিরই নেতৃত্বে ছিলেন এক বা একাধিক দেশপ্রেমিক অবিসংবাদিত নেতা। যেমন- জর্জ ওয়াশিংটন, লেনিন, আব্রাহাম লিঙ্কন, মাও সে তুঙ, উইনস্টন চার্চিল, মহাত্মা গান্ধী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, পেট্রিক হেনরি, ফিদেল ক্যাস্ট্রো, ড. সুকর্ন, হো চে মিন, আলেন্দে, মার্টিন লুথার কিং। তাঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ দেশের জন্য, জাতির জন্য সঙ্কল্পবদ্ধ হয়ে, আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান হয়ে নিজের জীবনের মায়া বিসর্জন দিয়ে দেশ ও জাতির চিন্তা করেছেন, দেশ ও জাতির কল্যাণ করেছেন। তখনই কেবল তারা জাতীয় নেতায় পরিণত হয়েছেন। ১৯৬৯-এর ২৩ ফেব্রুয়ারি রমনা রেসকোর্স ময়দানে তত্কালীন ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদের সভাপতিত্বে কারামুক্ত বাঙালির নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের পক্ষ থেকে সংবর্ধনা দেয়া হয়। এবং ওই সংবর্ধনা সভায় ছাত্র-জনতার পক্ষ থেকে ডাকসু ভিপি তোফায়েল আহমেদ শেখ মুজিবকে বঙ্গবন্ধু খেতাবে ভূষিত করেন। সেদিন থেকেই তিনি বাংলার বন্ধু, বাঙালির বন্ধু অর্থাত্ বঙ্গবন্ধু।
এখানে বলা প্রয়োজন যে, বাঙালি জাতিকে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে দাবিয়ে রেখেছিল পৃথিবীর বিভিন্ন অংশের লোকেরা শাসন ও শোষণের মাধ্যমে। অথচ অদম্য সাহস, সঙ্কল্প আর আত্মবিশ্বাসে বাঙালির অবিসংবাদিত নেতা যখন বললেন, ‘সাত কোটি মানুষকে দাবায়ে রাখতে পারবা না’, তখন মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাঙালি অসম্ভবকে সম্ভব করল। বঙ্গবন্ধুর ০৭’ই মার্চের ভাষণের প্রেরণাশক্তি হতেই আমাদের ইষ্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের ২নং ব্যাটালিয়নের (সে সময় গাজীপুরে অবস্থিত) সৈনিকেরা তত্কালীন ইস্টবেঙ্গল রেজিমেন্টের মেজর কে.এম সফিউল্ল্যাহ’র নেতৃত্বে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সার্বিক প্রস্তুতি নিয়েছিলেন ১৯ মার্চ ১৯৭১-এ জয়দেবপুরে ছাত্র-জনতা সমন্বয়ে। আমি বঙ্গবন্ধুর ০৭ ই মার্চের আহ্বানেই মুজিবনগর সরকারের অধীনে কে ফোর্সেস এর ২নং সেক্টরের চাঁদপুর মহকুমার (চাঁদপুর জেলা) মুক্তিযোদ্ধা এফ.এফ বাহিনীর ডেপুটি কমান্ডার হিসেবে রণাঙ্গনে দায়িত্ব নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ করেছি এবং দায়িত্ব পালন করেছি। হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে আমরা অনেকগুলো সম্মুখযুদ্ধ করেছি।
আমাদের ৫৬ হাজার বর্গমাইলের মধ্যে যেকোনো যুদ্ধাপরাধীর প্রশ্রয়দাতাকে নতুন প্রজন্মই পারে শাস্তি দিতে ও প্রত্যাখ্যান করতে। মুক্তিযোদ্ধাদের রক্তে ঝরা বাঙলায়, ৩০ লাখ শহীদের রক্তে ভেজা মাটিতে, প্রায় ৪ লাখ ধর্ষিত মা-বোনের বাংলাদেশে কোনো যুদ্ধাপরাধীদেরকে এবং তাদের প্রশ্রয়দানকারীকে বা তাদের পক্ষ নেওয়া রাজনৈতিক দলগুলোকে আইনজীবীদের সমর্থন না করার জন্য সবিনয় অনুরোধ করছি সকল সাংবাদিক, সিভিল সোসাইটি, বুদ্ধিজীবী ও নতুন প্রজন্মের কাছে। আরও অনুরোধ করছি, মাইগ্রেটেড রাজনীতিবিদ আর পরজীবীদের প্রত্যাখানের জন্য। মাইগ্রেটেড রাজনীতিবিদরা হচ্ছেঃ- এদের কোনো আদর্শ নেই, এরা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দলের পক্ষে রাজনীতি করে চলেছেন; পদের লোভে, জাতীয় সংসদ সদস্য হওয়ার লোভে, দুর্নীতি করার লোভে এবং মন্ত্রীত্বের লোভে। সম্ভবতঃ এরা হচ্ছে জগতের সবচাইতে কলংকিত অসভ্য ও অমানুষ। অমর হোক আমার দেশ, মুক্তিযুদ্ধে অর্জিত জন্মভূমি বাংলাদেশ। জয় বাংলা।
লেখক: মুক্তিযোদ্ধা ও শিক্ষাবিদ
