ঝালে ঝোলে অম্বলে

বুদ্ধু, বোকা ও বোকা বানানোর রাজনীতি

আপডেট : ২২ মার্চ ২০১৪, ২২:০৮
আমাদের দেশের রাজনৈতিক দলের নেতারা নিজেরা বুদ্ধু, না জনগণকে বুদ্ধু মনে করেন, সে সম্পর্কে সিদ্ধান্ত টানা কঠিন। রাজনৈতিক নেতাদের কথা শুনলে অনেক ক্ষেত্রেই দ্বন্দ্ব লাগে, বাস্তবে কী ঘটছে, আর উনারা কী বলছেন? মাঝে মাঝে তো মাথাটাই বিগড়ে যায়। এগুলো প্রলাপ না বক্তব্য তা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়। তৃতীয় পর্যায়ের উপজেলা নির্বাচন নিয়ে বিএনপি নেতাদের বক্তব্যের কথাই ধরা যাক। এই তৃতীয় পর্যায়ের উপজেলা নির্বাচনের আগের দিন বিএনপি নেতারা বললেন, ভোটের ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিতে সরকারি দল ও প্রশাসন সর্বাত্মক ভূমিকা পালন করছে। কোন নির্বাচন নয়, ফলাফল নিজেদের পক্ষে নিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ যাবতীয় উদ্যোগ সম্পন্ন করেছে। নির্বাচনের দিন দুপুরে বিএনপি নেতারা সাংবাদিকদের ডেকে আবারও বললেন, বিভিন্ন উপজেলা পরিষদের ভোটকেন্দ্র আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সহায়তায় সরকার দলীয় সন্ত্রাসীরা দখল করে নিয়েছে। দুপুরে এই কথা শুনে আমরা সরকার ও সরকারি দলের প্রতি আমাদের যাবতীয় ক্ষোভ ও ঘৃণা প্রকাশ করলাম। অথচ সন্ধ্যায় নির্বাচনের ফলাফলে দেখলাম, বেশিরভাগ উপজেলায় বিএনপি সমর্থক প্রার্থীরা বিজয়ী হয়েছেন! তাহলে দুপুরে বিএনপি নেতারা অমন কথা কেন বললেন? কিসের ভিত্তিতে বললেন? গত সিটি করপোরেশন নির্বাচন থেকে শুরু করে উপজেলা পরিষদ নির্বাচনের প্রথম থেকেই তারা এমন কথা বলে চলেছেন। অথচ নির্বাচনের ফলাফলে দেখা যাচ্ছে, বিএনপির প্রার্থীরাই নির্বাচনে জয়ী হচ্ছেন! তাহলে বিএনপি নেতারা এমন বক্তব্য কেন দিচ্ছেন? এটা নিজেদের আহাম্মুকী? নাকি জনগণকে আহাম্মকি মনে করে যা খুশি তাই বলা? সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হচ্ছে, নিজেদের কোন বক্তব্য তারা কখনও সংশোধন বা প্রত্যাহার করেন না, বক্তব্য যদি একবারেই বিপরীত হয়, তারপরও তারা কখনও দুঃখও প্রকাশ করেন না। আসলে তারা দেশের মানুষকে বুদ্ধু মনে করেন। আর বুদ্ধুদের উদ্দেশে যা খুশি তাই বলা যায়, তাতে কী আর এমন এসে-যায়? কোন ভোট কেন্দ্রে হারার সম্ভাবনা দেখলেই আমাদের বিরোধী রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে মতলবি বুলি উচ্চারণ শুরু হয়ে যায়। জিতে গেলে বলা হয়, জনতা রুখে দিয়েছে। আরও ভোট পেতাম, আরও জিততে পারতাম প্রতিপক্ষ দেয় নাই! আর হারলেও সেই একই অভিযোগ— প্রতিপক্ষ জোর করে হারিয়েছে। এমন ভন্ডামির পরও আমাদের দেশের নেতারা কীভাবে পার পান— সেটাই আশ্চর্যের! রাজনৈতিক নেতারা যা খুশি তাই বলেন, তার মূল কারণ, আমরা বুদ্ধু। এখানে বুদ্ধু শব্দটির মানে একটু আলোচনা করে নেয়া যাক। বুদ্ধু শব্দের মানে সবাই জানে বোকা। শব্দটি খুব সম্ভব হিন্দি ভাষা মারফত বাংলায় এসেছে। হিন্দিতে বলে ‘বুদ্ধু কাঁহাকা’। যার মানে হলো ‘বোকা কোথাকার’। বাংলাতেও অবশ্য আজকাল বুদ্ধু কথাটা খুব চলছে। লোকে আর বোকা কোথাকার বলতে চায় না, বলছে ‘বুদ্ধু কোথাকার’। বোকা কেমন সাদামাটা শব্দ, তেমন জোর নেই শব্দটির গায়ে। সেদিক থেকে বুদ্ধু ধ্বনির মাহাত্ম্যে এবং উ-কারের মিলে সেই সঙ্গে দ আর ধ সংযুক্তিতে খুব জোরদার শব্দ। খুব সম্ভবত বুদ্ধি থেকেই বুদ্ধু শব্দটি এসেছে। কিন্তু তা-ই বা কী করে হয়? যার বুদ্ধি নেই সেই তো বুদ্ধু! এগুলো আসলে ভাষাবিজ্ঞানের সমস্যা; এ সব কচকচানিতে না যাওয়াই মঙ্গল। বুদ্ধু শব্দটি যেখান থেকেই আসুক, শব্দটি কিন্তু বেশ প্রচলিত। কথায় কথায় অপরকে বুদ্ধু বলা আমাদের স্বভাব। অধিকাংশ লোকই নিজেকে চালাক এবং অপরকে বুদ্ধু মনে করে। কিন্তু নিজেকে কেউ-ই প্রায় বুদ্ধু বলে স্বীকার করতে চায় না। যারা নিজেকে চালাক মনে করে, তাদের অনেক কথা-বার্তা-আচরণে কিন্তু বুদ্ধিহীনতা প্রকাশ পায়। আবার অনেক স্বীকৃত বুদ্ধুর আচরণেও চালাক লোকের বৈশিষ্ট্য ধরা পড়ে। আসলে প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই কিছু বুদ্ধি, আর কিছু বুদ্ধিহীনতা রয়েছে। বলা যায় প্রত্যেকের মধ্যেই একজন বুদ্ধু লুকিয়ে থাকে; যদিও সবাই তা কবুল করতে চায় না। কে যে বুদ্ধু আর কে যে বুদ্ধু নয়, তা নির্ণয় করা কঠিন। আমরা সেই কঠিন আলোচনায় যাবো না। আমরা বরং দু-একটা আসল বুদ্ধুর কাহিনী আলোচনা করি। আমাদের দেশে মাঝে মাঝে খাল কাটার হুজুগ দেখা দেয়। এ খালকাটা কর্মসূচি কতটুকু কী লাভ হয়—সেটা একটা বেদনাদায়ক আলোচনা। এতে অনেকের বিশেষ করে খালকাটা গোষ্ঠীর আঁতে ঘা লাগতে পারে। কারো আঁতে ঘা দেয়া উচিত কাজ নয়। কাজেই আমরা সে দিকে যাবো না। তবে এ প্রসঙ্গে এ টুকুই শুধু বলা যায় যে, খালকেটে কারও উপকার করা না হলেও এ কর্মসূচির সঙ্গে জড়িত অনেকের পকেট ভরে। যা হোক, এ বিষয়ে বৃথা বাক্য ব্যয় না করে আমরা সরাসরি খালখনন বিষয়ক এক অভিজ্ঞতার আলোচনায় যাই। এক খালখনন কর্মকর্তা কর্মস্থল থেকে অর্থাত্ যেখানে তার কাজ হলো বড় বড় গর্ত খোঁড়া, সেই জায়গা থেকে হেড অফিসে জরুরি বার্তা পাঠালেন, গর্তগুলো খুঁড়ে যতটুকু মাটি বেরোচ্ছে, তার থেকে কম মাটি লাগছে গর্ত বোজানোর সময়। উদ্বৃত্ত মাটি দিয়ে কী করবো? কোথায় ফেলবো? হেড অফিসের বুদ্ধু আরো সরেস, তিনি ত্বরিতগতিতে নির্দেশ পাঠালেন, এ নিয়ে চিন্তার কী আছে! পাশাপাশি আরো গর্ত করে সে সব মাটি ফেলে দাও। আরেকবার এক মন্ত্রী একই খালের ওপর পাশাপাশি দুটি একই রকম ব্রিজ দেখে জানতে চেয়েছিলেন, এ কী ব্যাপার? স্থানীয় কর্তা জানিয়েছিলেন, সরকারি নির্দেশ বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই এসেছিলো। আমাদের স্থানীয় জনপ্রতিনিধি উচ্চশিক্ষিত কী না, তিনি দুই ভাষাই জানেন। তাই দুটি আদেশই তামিল করেন এবং দুটি একই ব্রিজ বানিয়েছেন! শুধু ব্রিজ বানানো বা খাল কাটা নয়, সাধারণ কথাবার্তার ব্যাপারেও বুদ্ধুদের অসাধারণত্ব দেখে যায়। এটা তাদের চালাক হওয়ার মধ্যে পড়ে। বোকা তথা বুদ্ধুদের সারা জীবনের স্বপ্ন চালাক হওয়ার। এর জন্য তারা কত কী করে? উদ্ভট পোশাক পড়ে গটগট করে হেঁটে যায়। বিনা কারণে মুচকি মুচকি হাসে। বাংলা-ইংরেজি মিশেল দিয়ে ‘বাংরেজি’ ভাষায় বোকা বোকা কথা বলে। বিসদৃশ টাই ঝুলিয়ে কুত্কুতে চোখে এদিক-ওদিক তাকায়। হঠাত্ হঠাত্ গম্ভীর হয়ে ফিল্টার সিগারেটের উল্টো দিকে আগুন ধরিয়ে প্রথম সুখটান দিয়ে ঘন ঘন হেচকি তুলতে থাকে। এমন বুদ্ধুর সংখ্যা আমাদের সমাজে, ফ্ল্যাটে, রাস্তা-ঘাটে, অফিসে, টেলিভিশনের পর্দায়, এমনকি মন্ত্রিসভায় পর্যন্ত নেহাত কম নয়। মানুষ বোকা থাকতে চায় না। অন্যের বোকামি নিয়ে ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, বোকামির সমালোচনা করে; তারপরও কিন্তু সমাজে বোকারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। বোকাদের নিয়ে সার কথা বলেছিলেন মহামতি আলেকজান্ডার পোপ। দেবদূতেরা যেখানে যেতে ভয় পায়, বোকারা নির্দ্বিধায় সেখানে ছুটে যায়। শুধু পোপ নয় বোকাদের নিয়ে কখনো কিছু বলেননি—এমন লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। মার্কটোয়েন বলেছিলেন, এই শহরের সব বোকাই আমাদের পক্ষে। আর কে না জানে যে কোন শহরেও বোকারাই সংখ্যাগরিষ্ঠ। চালাক বোকার ভাগাভাগিটা অবশ্য বড় কঠিন। আমরা যাকে সব থেকে বোকা ভাবি, সে কিন্তু নিজেকে তা ভাবে না। আবার কোথাও এমন চালাক লোক দেখা যাবে না, যে কখনো নিজেকে মনে মনে বোকা বলে গণ্য করে তিরস্কার করেনি। নিজের নিভৃততম মুহূর্তে নিজের কাছে কে বোকা নয়? তাছাড়া এমন কোন লোক সত্যিই পাওয়া যাবে না, যাকে অন্তত অন্য কোন লোক বোকা ভাবে না। তবে বোকামি ব্যাপারটা তেমন যে খুব একটা খারাপ জিনিস তা কিন্তু নয়। ভলটেয়ার বলেছিলেন, পৃথিবীতে বুদ্ধিমানের সংখ্যা অতি অল্প। সুতরাং আপনি যদি বোকা হন, তাহলে আপনি নিশ্চয়ই সংখ্যাগরিষ্ঠের দলে; তাছাড়া আপাতত বোকা যে কোন লোককেই সমাজে ভালোমানুষ বলে বিবেচনা করা হয়। সেটা বোকামির একটা বাড়তি সুবিধা। আমাদের সমাজে এমন অনেক লোক আছে, যারা আসলেই বোকা। এই বোকারা নিজেদের জন্য বোকা হলেও অন্য কারও জন্য বিপজ্জনক নয়। এ জাতীয় বোকাদের নিয়ে আমরা ঠাট্টা-মশকরা করি, ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করি; তাতে ওই বোকারা বিব্রত হন, কিন্তু নিজেকে শোধরাতে পারেন না। একটা বোকামির ঘটনা ঢাকতে গিয়ে আরও কয়েকটা বোকামির কাণ্ড করে বসেন। এ প্রসঙ্গে মনে পড়ছে জীববিজ্ঞানের এক অধ্যাপকের কথা। ব্যাঙ নামের সহজলভ্য প্রাণীটি জীববিজ্ঞানের ক্লাসে নানাবিধ বিশ্লেষণের কাজে প্রায়ই ব্যবহূত হয়। আমাদের এই অধ্যাপকও সে দিন ব্যাঙ নিয়ে পড়াচ্ছেন। বিকেলের দিকে ক্লাস। তিনি তার ঝোলা থেকে একটি কৌটা বের করে বললেন, এবার আমরা একটা ব্যাঙ কেটে দেখবো তার হূিপন্ডটা কীভাবে চলে। এই বলে কৌটা খুলে তিনি ব্যাঙ বের করলেন, সেটা দেখে ক্লাসের ছেলে-মেয়েরা প্রায় সবাই চেঁচিয়ে উঠলো, স্যার এটা তো ব্যাঙ নয়। সামনের বেঞ্চে বসা একজন গভীরভাবে নিরীক্ষা করে রায় দিলো, স্যার এটা তো দেখে মনে হচ্ছে ডিম-পাউরুটির টোস্ট কিংবা কাটলেট জাতীয় কিছু হবে। ঘামতে ঘামতে অধ্যাপক ভদ্রলোক তার ঝোলার মধ্যে হাত চালিয়ে আরেকটি চৌক কৌটা বের করলেন। তারপর সেটা খুলে দেখা গেলো, সেই কৌটার মধ্যে কিছু নেই; একদম ফাঁকা। এবার অধ্যাপক মহোদয় আরও ঘামতে ঘামতে মাথা চুলকাতে লাগলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন, তাই তো, তখনই ক্যামন যেন লাগছিলো! আজ দুপুরে টিফিন করলাম কী দিয়ে? তাই তো....! তবে সবাই এই অধ্যাপকের মতো স্বভাবজাত বোকা নয়। কেউ কেউ ইচ্ছে করে বোকা সাজে। বোকা বোকা কথা বলে, বোকার মতো আচরণ করে। বিপদে পড়লে বোকার মতো কথা বলা আমাদের সমাজে যারা ধুরন্ধর ব্যক্তি, তাদের স্বভাব। ক্ষমতাসীনদের মধ্যেও এই প্রবণতা রয়েছে। অনেক সময় তারা বোকা বোকা কথা বলে নিজেদের অপকর্ম ঢাকতে চায়। সাধারণ মানুষকেও বোকা বানাতে চায়। আর বিরোধী দলের কথা তো বলাই বাহুল্য। পরিশেষে বোকা সম্পর্কে একটা আপ্তবাক্য স্মরণ করা যাক। বহু লোককে কিছুকালের জন্য আর কিছু লোককে বহুকালের জন্য বোকা বানানো যেতে পারে। কিন্তু সব লোককে চিরকালের জন্য বোকা বানানো সম্ভব নয়। কারণ? এমন অনেক লোক রয়েছে, যারা সেই ‘বুদ্ধিমান’ লোকটিকে বোকা বানানোর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিচ্ছে! কাজেই অন্যকে যারা বুদ্ধু ভাবেন তারা সাবধান! লেখক:কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন