যে কোনো জাতির দেশাত্মবোধের নিরূপম আবেগের নাম জাতীয় সঙ্গীত। জগতের সকল দেশে, সকল ভাষায় গীত হইয়া থাকে অজস্র গান, বিচিত্র সুরধারায়। কিন্তু জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা পায় কেবল এক বা একাধিক গান। আমরা জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে পাইয়াছি অনন্যসাধারণ এক গান, আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি। বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বাণী ও সুরে আন্দোলিত করে প্রতিটি বাঙালির হূদয়। এই গানের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ কথা বলে তাহার সমস্ত সৌন্দর্য ও মহিমা লইয়া। একটি জাতির প্রতিটি মানুষের আন্তর-গভীর দেশবোধ, ভালবাসা, কখনওবা দেশের জন্য আকুল প্রার্থনা বাঙ্ময় হইয়া ওঠে জাতীয় সঙ্গীতের সুর ও বাণীর মধ্য দিয়া। ইতিহাসে এমন একটা সময় ছিল যখন রাজার স্তবগান করিয়া প্রজাগণ দেশাত্মবোধের প্রকাশ ঘটাইতেন। তাহারা গাহিতেন ‘হে ঈশ্বর রাজা/ রাণীকে রক্ষা করুন।’ সেই প্রথা এখনও প্রচলিত আছে আলংকারিক রাজতন্ত্র্রের দেশসমূহে। যতদূর জানা যায়, বিশ্বের ইতিহাসে সর্বপ্রথম আনুষ্ঠানিক জাতীয় সঙ্গীত নির্ধারণ করিয়াছিলেন ওলন্দাজগণ, ১৫৬৮ সনে। স্পেন এইক্ষেত্রে দ্বিতীয়। ১৭৭০ সনে সেইখানে জাতীয় সঙ্গীতের প্রচলন হয়।
জাতীয় সঙ্গীতের সহিত নিবিড় ও গভীর সম্পর্ক জাতীয় পতাকার। আর, দেশ ও জাতির সঙ্গে সম্পর্ক এতদুভয়ের। জাতীয় সঙ্গীতের সুরলহরির সমভিব্যাহারে উদার আকাশে যখন জাতীয় পতাকা উত্তোলিত হয় তখন কে না অনুভব করে হূদয়ের অনির্বচনীয় স্পন্দন। আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীতের নাম ‘দ্য স্টার স্পাঙ্গেল্স ব্যানার’-তারকা খচিত ঝাণ্ডা। সেও এক অসাধারণ গান। চার স্তবকের গানটি যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হয় ১৯১৬ সনে। দেশটির প্রথম জাতীয় সঙ্গীত গৃহীত হইয়াছিল ১৮৩১ সনে। সেটি ছিলো একটি প্রার্থনা সঙ্গীত। ১৮৯৩ সনে যুক্তরাষ্ট্রে আরও একটি গানকে জাতীয়ভাবে গ্রহণ করা হয়, যেইখানে বিবৃত হইয়াছে আমেরিকার সৌন্দর্য ও মহিমা। সেই গানের শিরোনাম ‘আমেরিকা, দ্য বিউটিফুল।’
সাধারণত সেই গান বা কবিতাই জাতীয় সঙ্গীত হিসাবে গৃহীত হইয়া থাকে, যাহা একটি দেশের সর্বস্তরের মানুষের বোধগম্য, যেই গান সকলের চিত্ত স্পর্শ করিয়া যাইতে পারে অবলীলায়। সেইজন্যে কখনও কখনও, কোনো কোনো দেশের জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যে একাধিক ভাষা কিংবা মিশ্রভাষাও ব্যবহার করা হইয়া থাকে। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় সঙ্গীতে (একই গানে) ব্যবহার করা হইয়াছে ১১টি ভাষা, যাহাতে প্রতিটি আঞ্চলিক গোত্রের মানুষ গানটিকে আপনার করিয়া লইতে পারেন। প্রতিবেশী ভারতের জাতীয় সঙ্গীতের ভাষায় দেখিতে পাওয়া যায় সংস্কৃতের প্রাধান্য। বাংলাদেশের জাতীয় সঙ্গীতের প্রতিটি শব্দ, বাণী-বন্দনা ও দৃশ্যচিত্র বাঙালি মাত্রই অতি পরিচিত। খুব কাছের, অতি চেনা প্রকৃতি, মাতৃরূপ আর কথার মেলবন্ধনে গানটি হইয়া উঠিয়াছে সর্বজনীন, সকলের।
সেই জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা ও মহিমা সমুন্নত রাখিবার জন্য নিরন্তর ও সুশৃঙ্খল প্রয়াস একান্ত বাঞ্ছনীয়। বিশেষ বিশেষ দিনে, নানান আনুষ্ঠানিকতায় গানটি গীত হইবে, ইহাই স্বাভাবিক। কিন্তু শুদ্ধ সুন্দরভাবে গাওয়ার জন্য চর্চারও প্রয়োজন রহিয়াছে। শুদ্ধতার চর্চা এবং এই গানের বাণীর তাত্পর্য হূদয়ে গাঁথিয়া লইবার জন্য শৈশব ও কৈশোরই শ্রেষ্ঠ সময়। তজ্জন্যে দেশের প্রতিটি স্কুলে, কলেজে এবং অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ইহার অনুশীলন হওয়া দরকার। ক্লাস শুরু হইবার আগে এসেমব্লির মাধ্যমে পতাকা উত্তোলন ও সমবেত কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাহিবার নিয়ম থাকিলেও আজকাল খুব কম প্রতিষ্ঠানেই তাহা পালন করা হইয়া থাকে। পাঠ্যসূচীর বাহিরে প্রতিটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত এ্যাসেমব্লি তথা জাতীয় পতাকা উত্তোলন ও জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত। এইক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষেরও সচেতন প্রয়াস একান্ত কাম্য। এই চর্চাটা নিয়মিত হইলে শৈশব-কৈশোরেই জাগ্রত হইবে দেশাত্মবোধ, যাহা তাহাদের হূদয়ে উদ্ভাসিত হইয়া থাকিবে আজীবন। এই প্রকারে গড়িয়া উঠিবে দেশপ্রেমিক নাগরিক সমাজ। তাহাদের মননে মেধায় গভীরতর তাত্পর্যে খোদিত হইয়া থাকিবে দেশ ও দেশের স্বাধীনতা। বিষয়টির প্রতি আমরা সংশ্লিষ্ট সকল কর্তৃপক্ষের মনোযোগ আকর্ষণ করি।
