প্রত্যেক জাতির জীবনে ইতিহাস এক অমূল্য সম্পদ। এ অমূল্য সম্পদের সৃষ্টি হয়ে থাকে কোন এক দুর্লভ মুহূর্তকে কেন্দ্র করে। অমর একুশে ফেব্রুয়ারি সেই এক দুর্লভ মুহূর্ত, যার ফলশ্রুতিতে এদেশে স্বাধিকার আন্দোলন এবং পরবর্তী পর্যায়ে মুক্তিযুদ্ধ সংঘটিত হয়। বাংলাদেশের স্বাধীনতা এ একুশেরই সুবর্ণ ফসল। অন্য অর্থে ভাষা আন্দোলনই মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, যার প্রেক্ষিতে অভূতপূর্ব রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্যদিয়ে অনন্য ইতিহাস সৃষ্টি করে পৃথিবীর মানচিত্রে দক্ষিণ এশিয়ার একমাত্র ভাষাভিত্তিক এই স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা লাভ করে। আমরা স্বাধীনতা লাভ করেছি, বিজয় অর্জন করেছি। স্বাধীনতা কি কতটুকু স্বাধীনতা- এটা বোঝার বিষয়। স্বাধীনতা মানে যথেচ্ছাচারের ছাড়পত্র নয় যে আমরা যেমন খুশি তেমন চলবো বা আচরণ করবো। আমাদের যেমন Right রয়েছে তেমন Obligation-ও আছে। কোন একসময়ে এক টেলিভিশন সাক্ষাত্কারে আমার থেকে জানতে চাওয়া হয়েছিল, বাংলাদেশ স্বাধীন করে আমাদের অর্জন কি? অর্জনতো অবশ্যই হয়েছে। পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে মুক্ত হয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেছি- এটাইতো একটা বড় অর্জন। তবে স্বাধীনতার মর্ম স্পর্শ করে কাঙ্ক্ষিত অর্জন কতটুকু হয়েছে- তা বিশ্লেষণের ব্যাপার। অনেকে বলেন- আমরা রাজনৈতিক ও ভৌগোলিকভাবে স্বাধীন। কিন্তু সামাজিক, অর্থনৈতিক উন্নতি হয়নি। আমি বলবো কাঙ্ক্ষিত উন্নতি যদিও হয়নি- অনেক উন্নতি অবশ্য লক্ষণীয়। যোগাযোগ ব্যবস্থা তথা রাস্তাঘাটের উন্নতি হয়েছে- যা অর্থনীতির উন্নতির সাথে জড়িত। কৃষি সমপ্রসারণ ও কৃষিখাতে উন্নতি এবং খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন ও লক্ষণীয়। শিক্ষার ক্ষেত্র প্রসারিত হয়েছে। শিল্পক্ষেত্রে সর্বাঙ্গীন উন্নতি না হলেও বিশেষ করে পোশাকশিল্পে অনেক উন্নতি হয়েছে। তাই বলবো সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে এবং সামগ্রিক জীবনমানের ক্ষেত্রে লক্ষণীয় অগ্রগতি হয়েছে। বাংলাদেশকে তত্কালীন মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জারের “তলাবিহীন ঝুড়ি” পরিহাস করা মন্তব্য থেকে অবশ্য উত্তরণ হয়েছে। কিন্তু উন্নতির ফল সাধারণ জনগণ ভোগ করতে পারছে না। তা’ এক শ্রেণীর মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে কুক্ষিগত হচ্ছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসাটাও অর্জন- তবে জাতীয় সংসদকে সকল কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত করা সম্ভব হয়নি। তাই সামগ্রিক বিচারে কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হয়নি। সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক মুক্তি আশানুরূপ হয়নি। মালয়েশিয়া, কোরিয়া আমাদের বহু পরে স্বাধীনতা অর্জন করেও বর্তমানে সাফল্যের সোপানে পৌঁছেছে। আমরা কেন পারিনি? এর অন্যতম প্রধান কারণ এক শ্রেণীর লোকের দুর্নীতি, জনগণের স্বার্থ পদদলিত করে অবৈধভাবে বিপুল সম্পদ অর্জন, প্রতিহিংসার রাজনীতি, সহিংসতা, হানাহানি, সংঘাত, মিথ্যাচার ও ক্ষমতার লোভ। বছর ঘুরে আসে ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবস। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র যুদ্ধের পর ১৯৭১ সালের ডিসেম্বরে পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের মধ্যদিয়ে অর্জিত হয় মুক্তিযুদ্ধের চূড়ান্ত বিজয়। লাখ লাখ দেশবাসী-নারী ও পুরুষের রক্তের অক্ষরে লেখা আমাদের এই স্বাধীনতার ইতিহাস। স্বাধীনতার ৪৩ বছর পার হয়েছে। একটি রাষ্ট্রের জীবনে এটি একেবারে কম সময় নয়। যেসব আদর্শ, উদ্দেশ্য ও স্বপ্নকে সামনে রেখে অগণিত মানুষ জীবন দিয়েছিল, বিপুল ত্যাগ স্বীকার করেছিল এই দেশের সর্বস্তরের মানুষ- তার কতটুকু অর্জিত হয়েছে? পাকিস্তানী শাসকদের অত্যাচার, নিপীড়ন ও বঞ্চনা থেকে মুক্তি লাভের পর প্রকৃত অর্থে আমাদের প্রত্যাশিত মুক্তি কি হয়েছে? দেশের অগণিত মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে জীবনযাপন করছে। রাস্তাঘাটে-ফুটপাতে অন্নহীন, বস্ত্রহীন, আশ্রয়হীন, ভুখা মানুষের অবস্থা দেখলে মনে ভীষণ আঘাত পাই। বিপরীতে এক শ্রেণীর মানুষ সম্পদের পাহাড় গড়ে বিলাসী জীবন যাপন করছে। হতদরিদ্রদের দিকে তাকাবার অবসর তাদের নেই। তাদের মুখে জনগণের কল্যাণের জন্য অনেক বড় বড় কথা শোনা গেলেও বাস্তবে এর প্রতিফলন নেই। রাজনৈতিক সহিংসতা ও রক্তপাতের ঘটনাবলি নিত্যদিন দেখতে হচ্ছে। উদার গণতন্ত্রের চর্চা নাই বললেই চলে। মুখে গণতন্ত্রের কথা বলা হলেও কোথাও সহিষ্ণুতার চিহ্ন? ?নেই। আইন আছে, আইনের প্রয়োগ নেই। আইনের শাসন ও রীতিনীতির প্রতি শ্রদ্ধাবোধের বড়ই অভাব। সন্ত্রাস-সংঘাতই হয়ে উঠেছে প্রতিবাদ ও দাবি আদায়ের ভাষা, আর সহিংস রাজনীতির বলি হচ্ছে নিরীহ সাধারণ মানুষ। ধ্বংস হচ্ছে দেশের সম্পদ ও ঘটছে অর্থনৈতিক বিপর্যয়। এই মহান স্বাধীনতা দিবসে দেশের নিরীহ জনগণের আকুতি ও কামনা- তাদেরকে এই অনাকাঙ্ক্ষিত দুর্বিষহ যন্ত্রণা ও অপূরণীয় ক্ষতি থেকে পরিত্রাণ দেয়ার।
লেখক: ভাষাসৈনিক (একুশে পদকপ্রাপ্ত)
