একটি বিদ্যালয়ে শিক্ষক মাত্র একজন—এইরূপ পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ওলানপাড়া প্রকাশ চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। বিদ্যালয়ে মোট চারজন শিক্ষক ছিলেন। কিন্তু তাহাদের মধ্যে প্রধান শিক্ষক চলতি বত্সরের জানুয়ারি মাসে এবং একজন সহকারী শিক্ষক ফেব্রুয়ারি মাসে অবসরে গিয়াছেন। আরেক সহকারী শিক্ষিক পহেলা ফেব্রুয়ারি হইতে মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রহিয়াছেন। বর্তমানে বিদ্যালয়ে শিক্ষক আছেন সাকুল্যে একজন। শিশু শ্রেণি হইতে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত বিদ্যালয়টিতে ছাত্রছাত্রীর মোট সংখ্যা ২০১ জন। বর্তমানে ওই একজন শিক্ষকই সব শ্রেণির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করিতেছেন। উপজেলা হইতে বিদ্যালয়টির দূরত্ব প্রায় ১২ কিলোমিটার। তাই দাপ্তরিক কাজে একমাত্র শিক্ষককে শিক্ষা কার্যালয়ে যাইতে হইলে ওই দিন বিদ্যালয়ে পাঠদান বন্ধ রাখিতে হয়। আবার শিক্ষক এক শ্রেণিতে ক্লাস নিতে থাকিলে অন্য শ্রেণির ছাত্র-ছাত্রীরা চিত্কার-চেঁচামেচি করিতে থাকে। বলা যায়, বিদ্যালয়টিতে এক অসম্ভব পরিস্থিতি বিরাজ করিতেছে।
একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঁচটি শ্রেণির জন্য অন্তত পাঁচজন শিক্ষক প্রয়োজন। একজন বা দুইজন শিক্ষককে দিয়া একটি বিদ্যালয় কিছুতেই চলিতে পারে না। পাঠদান, বিদ্যালয় প্রশাসন ও ব্যবস্থাপনা, পরীক্ষা গ্রহণ ও ফলাফল প্রদান, সহশিক্ষা কার্যক্রম, দাপ্তরিক কারণে নিকটস্থ প্রশাসনের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা ইত্যাকার নানান কাজের জন্য উপযুক্তসংখ্যক শিক্ষক থাকা প্রয়োজন। কিন্তু এইরূপ শিক্ষক সংকট থাকিলে যেকোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষা কার্যক্রম বিপর্যস্ত হইতে বাধ্য। আর এই সংকট কেবল প্রকাশ চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের একার নহে। আমরা প্রায়শই সংবাদপত্রের পাতায় এইরূপ সংবাদ প্রকাশিত হইতে দেখি। বিশেষত গ্রাম পর্যায়ের প্রান্তিক বিদ্যালয়গুলিকে ঘিরিয়াই এই ধরনের সংবাদের জন্ম দেখিতে পাওয়া যায়। প্রকাশ চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও চারজন শিক্ষক ছিল। কিন্তু এই বত্সরই দুইজন অবসরে গিয়াছেন এবং একজন মাতৃত্বকালীন ছুটিতে রহিয়াছেন। ফলে হঠাত্ তৈয়ার হইয়াছে শূন্যতা। কিন্তু এই রকম শূন্যতার সম্ভাবনা তৈয়ার হইবার পূর্বেই কেন ব্যবস্থা লওয়া হয় নাই? কেন সকল ক্ষেত্রে ডাক্তার আসিবার পূর্বেই রোগী মৃত্যুবরণ করে? সরকার অনেকদিন পর পর একযোগে অনেক শিক্ষক নিয়োগ দিয়া থাকে। কিন্তু নূতন শিক্ষক পাইবার ফাঁকে পড়িয়া বহুকাল কাটিয়া যায় কোনো কোনো বিদ্যালয়ের। আবার শিক্ষক নিয়োগের দীর্ঘসূত্রতার অবসরে শূন্য পদ পূর্ণ হইবার পর্যায়ে সৃষ্টি হয় নূতন শূন্য পদ। ফলে শিক্ষক সংকট আর দূরীভূত হয় না।
কোন্ বিদ্যালয়ে কখন শিক্ষক শূন্যতা তৈয়ার হইবে, তাহার একটি চলমান চিত্র অধিদপ্তরের নিকট থাকা উচিত এবং সেইমতো শিক্ষক নিয়োগের বিষয়টিকে চলমান একটি কার্যক্রম হিসাবে চালু রাখা উচিত যাহাতে প্রক্রিয়াগত ফাঁকে পড়িয়া প্রকাশ চন্দ্র সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ন্যায় কোনো বিদ্যালয় চরম সংকটে না পড়ে। পাশাপাশি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলির সার্বিক ব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনের পরিবীক্ষণ ও পরিদর্শনের ব্যবস্থা থাকা উচিত। কারণ প্রাথমিক বিদ্যালয়ই পুরা শিক্ষা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি পর্যায়, যাহাকে শিক্ষার আঁতুড়ঘর বলা যাইতে পারে। দেশে জীর্ণ অবকাঠামোর বিদ্যালয়ের সংখ্যা এখনও অনেক। অন্যদিকে, অনেক নূতন সুদৃশ্য ভবন তৈয়ার হইয়াছে ঠিকই, কিন্তু কয়েক বত্সরের মধ্যেই ভবনগুলি অনেকক্ষেত্রে অকার্যকর হইয়া পড়ে এবং ছাত্র-ছাত্রীদের পূর্বের ন্যায় উন্মুক্ত মাঠে ক্লাস করিতে হয়। নূতন শিশুকে যেমন অধিক মনোযোগ দিয়া পরিচর্যা করিতে হয়, তেমনি প্রাথমিক শিক্ষার প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অধিক যত্নবান হইতে হইবে।
