একটি দেশের স্বাধীনসত্তা হিসেবে পতাকা হলো বিশেষ বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত প্রতীকী রূপ এবং পবিত্র আমানত। তাছাড়া জাতীয় পতাকা একটি দেশের সামগ্রিকভাবে পরিচয় বহন করে থাকে। কেননা একটি পতাকা দেখে সহজেই বলা যায় এটি কোন দেশের প্রতিনিধিত্ব করছে। ইংরেজীতে এটি Flag or Banner বলে। বাংলা ‘পতাকা’ হলো একটি সংস্কৃতজাত স্ত্রী বাচক শব্দ, যা ‘পত্্’ ধাতু থেকে উত্পত্তি।
এই পতাকা কবে থেকে কেমন করে সৃষ্টি হয়েছে, তা বলা কঠিন। তবে গবেষক ও ঐতিহাসিকরা বলে থাকেন যে, সুদূর প্রাচীনকালে মানব সভ্যতার গোড়া থেকে এই জাতীয় পতাকার সূচনা হয়েছে। অবশ্য প্রথমদিকে জাতীয় পতাকার ব্যবহার ছিলো ভিন্ন রকম। তখন এটি ব্যবহূত হতো শুধু যুদ্ধের ময়দানে (Battle field)। যুদ্ধ ক্ষেত্রে সৈন্যরা নিজেদের প্রয়োজনেই পতাকা বহন করতো, কেননা সৈন্যদের এক একটি বাহিনীকে এক জায়গায় জমায়েত করার উদ্দেশ্যে তাদের জন্য স্থান নির্ধারণ ও নিজেদের দল চিহ্নিত করার লক্ষ্যে দৃষ্টি আকর্ষণের জন্যে লাঠির মাথায় এক খণ্ড রঙিন কাপড় বেঁধে সেটাকে পুঁতে রাখা হতো। আর ঐ পতাকা দেখে সৈন্যরা নিজের নিজের দলে গিয়ে একত্রিত হতো। আদিতে পতাকা বা ঝাণ্ডার ব্যবহার সর্বপ্রথম শুরু হয় পারিসক এবং আসিরীয় সৈন্যদের মধ্যে। এদিকে যুদ্ধক্ষেত্রে পতাকার ব্যবহারের বিষয়ে বাইবেলে উল্লেখ আছে। পরিবর্তীতে পরিবর্তন ও ক্রমবিকাশের পথ ধরে যুদ্ধক্ষেত্রের মধ্যে পতাকা ব্যবহার সীমাবদ্ধ রইলো না। তা বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্ব স্ব মহিমায় উদ্ভাসিত হয়ে উঠলো। আর মধ্য যুগে এর ব্যবহার অনেকাংশে অনানুষ্ঠানিক হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিক রেওয়াজ হিসেবে দাঁড়ায়।
আধুনিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন রংয়ের কাপড় দিয়ে ঝাণ্ডা বা পতাকা তৈরির প্রথম প্রচলন শুরু হয় রোমান সাম্রাজ্যে। তারা বর্শার আগাতেও আয়তাকৃতির পতাকা ব্যবহার করতো। আর এটাই আধুনিক পতাকার আদি ভিত্তি বলে মনে করা হয়। এর মধ্যে অনেক চড়াই উত্রাই পার হয়ে যায়। বিভিন্ন দেশে পতাকা ব্যবহার করা হলেও, এর তেমন কোন আনুষ্ঠানিক মর্যাদা ছিল না। আর একটি কথা এই পৃথিবীতে যতগুলো বড় বড় ধর্ম আছে, তা প্রতিষ্ঠা পেতে অনেক কাঠখড়ি পোহাতে হয়েছে। বলতে গেলে সব ধর্মযুদ্ধে ফ্ল্যাগ ব্যবহার করার প্রচলন ছিল। এর মধ্যে ত্রয়োদশ শতাব্দী এসে যায়, যা ছিল জাতীয় পতাকার জন্য যুগান্তকারী সময়। কেননা ১২১৮ সালে ডেনমার্কে পতাকা জাতীয় প্রতীকীর স্বীকৃতি ও মর্যাদা পায়। আর এর ঠিক ১২১ বছর পর অর্থাত্ ১৩৩৯ সালে সুইজারল্যান্ডে পতাকা জাতীয় প্রতীক হিসেবে আসন গেড়ে বসে। এদিকে ১৭৭৭ সালে ১৪ জুন যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় পতাকা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি লাভ করে। তাছাড়া ফ্রান্সে জাতীয় পতাকার আনুষ্ঠানিক রূপ লাভ করে ফরাসী বিপ্লবের পর অর্থাত্ ১৭৮৯ সালে। আর এর কয়েক বছর পর অর্থাত্ ১৮০৫ সালে ইতালিতে জাতীয় পতাকা তৈরি হয়। তারপর ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরু থেকেই ইউরোপসহ সারাবিশ্বের দেশগুলোতে এর ব্যবহার ছড়িয়ে পড়ে। কালক্রমে জাতীয় পতাকা হয়ে ওঠে একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম জাতির প্রতীক এবং সাম্য মৈত্রী ও ভ্রাতৃত্বের বন্ধন স্বরূপ। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য যে, জাতীয় পতাকা ছাড়াও সরকারি বেসরকারিভাবে বিভিন্ন সংঘ, ক্লাব, দল, সংস্থা, কাউন্সিল, ইত্যাদির নিজস্ব পতাকা ব্যবহারও যুগপত্ শুরু হয়।
বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা প্রথম তৈরি হয় ১৯৭১ সালে। উল্লেখ্য যে, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানে ৪(২) আর্টিকেল অনুযায়ী উল্লেখ করা হয়েছে যে, ‘প্রজাতন্ত্রের জাতীয় পতাকা হইতেছে সবুজ ক্ষেত্রের উপর স্থাপিত রক্তবর্ণের ভরাট বৃত্ত’, যার দৈর্ঘ্য ও প্রস্থের অনুপাত ১০:৬ এবং এই আলোকে লাল বৃত্তের ব্যাসার্ধ হবে ২ ফুট, পতাকার দৈর্ঘ্যের সাড়ে ৪ ফুট এবং উপরে প্রস্থের মাঝ বরাবর অঙ্কিত আনুপাতিক রেখার ছেদবিন্দু হবে লাল বৃত্তের কেন্দ্রবিন্দু। তবে ভবন, মোটর গাড়ি, আন্তর্জাতিক ও দ্বিপাক্ষিক আলোচনার টেবিল, ইত্যাদির ক্ষেত্রে আনুপাতিক হারে আকার কম বেশি হয়ে থাকে। আর মুক্তিযুদ্ধের প্রথমদিকে যে অনানুষ্ঠানিক পতাকা তৈরি হয়েছিল, তাতে লাল বৃত্তের মধ্যে বাংলাদেশের মানচিত্র ছিল। এ প্রেক্ষাপটে প্রথম পতাকাটি এঁকেছিলেন ছাত্রনেতা শিবনারায়ণ দাশ। এদিকে বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেছিলেন ছাত্রনেতা আ.স.ম. আব্দুর রব, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় একাত্তরের ২রা মার্চে। আর এর একুশ দিন পর শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর বাসভবনে স্বাধীনতা ঘোষণার প্রাক্কালে পতাকা উত্তোলন করেছিলেন। অবশ্য আর একটি কথা জানা দরকার, তা হলো পরবর্তীতে অর্থাত্ ১৯৭২ সালে বঙ্গবন্ধু সরকার শিবনারায়ণ দাশের ডিজাইনকৃত পতাকার মাঝে মানচিত্রটি বাদ দিয়ে পতাকার বাকি সব ঠিক রেখে প্রতিটি বিষয়ের ব্যাখা বিবেচনায় এনে শিল্পী কামরুল হাসান দ্বারা পরিমার্জিত করেন। আর সেই পরিমার্জিত পতাকা আমরা ব্যবহার করে চলেছি এবং জন্ম থেকে জন্মান্তর চলতেই থাকবে, এই ধান শালিকের দেশে।
লেখক :গবেষক
