বাংলাদেশের জনগণের গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ দীর্ঘ দিনের। ভারতীয় উপমহাদেশে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের সুবাদে পশ্চিমা গণতন্ত্রের প্রতি এই অঞ্চলের মানুষের বিশেষ অনুরাগ তৈরি হয়। এ পর্যায়ে ভারতে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের বিরুদ্ধে লড়াই ও সংসদীয় গণতন্ত্রের জন্য লড়াই একই সুতোয় গেঁথে যায়। ব্রিটিশ শাসকরাও এই আন্দোলনের পালে কম হাওয়া দেয়নি। ভারতে দল ব্যবস্থা (যদিও তা শাসকদের অনুগত) গড়ে ওঠার ক্ষেত্রে ঔপনিবেশিক শাসকদের ভূমিকা কম নয়। কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েরই প্রতিষ্ঠায় ঔপনিবেশিক শাসকদের ভূমিকা যথেষ্ট। তাছাড়া, দল ব্যবস্থার কার্যকর উপস্থিতি প্রমাণিত হয় যে প্রতিষ্ঠানে তথা সংসদে সেই প্রতিষ্ঠানটি নির্মাণেও ব্রিটিশরা হাঁটি হাঁটি পা পা করে এগিয়েছে। ১৮৬১ সালের আইন থেকে শুরু করে ১৮৯২, ১৯০৯,১৯১৯ ও ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইনের মাধ্যমে ভারতীয়দের দাবিতে লক্ষ্য রেখে ব্রিটিশ শাসকগণও একটি সংসদীয় ব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বিভিন্ন ভূমিকা রাখে (যদিও এই সংসদ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ভারতীয়দের স্বার্থের চেয়ে ব্রিটিশ স্বার্থ রক্ষাই সচেষ্ট ছিল)। উল্লেখ্য যে, ১৯১৯ ও ১৯৩৫ সালের ভারতে শাসন আইনের মাধ্যমে প্রাপ্ত বিভিন্ন ক্ষমতার কারণে পরবর্তী সংসদগুলো ভারতীয়দের স্বার্থরক্ষায় সচেষ্ট ছিল। এই জন্যই ভারতীয়দের মনে স্বাধীনতা ও সংসদীয় গণতন্ত্রের প্রতি আগ্রহ একই সুতোয় গেঁথে যায়।
কিন্তু স্বাধীনতার পর ভারতের দুই অংশে তথা পাকিস্তান ও ভারতে জনগণের এই আগ্রহের প্রতি নেতৃত্বের অনুরাগে ভিন্নতা পরিলক্ষিত হয়। ভারতের নেহরু-গান্ধীর বিপরীতে পাকিস্তানের জিন্নাহ- লিয়াকতরা নব্য উপনিবেশ তৈরিতে মনযোগী হয়। পাকিস্তানে স্বাধীনতা ও সংসদীয় গণতন্ত্র বিপরীতমুখী অবস্থান নেয়। শুরু হয় গণ অসন্তোষের পালা। এই গণ অসন্তোষই ভাষার নামে কখনো গভর্নর জেনারেল কখনোবা মিলিটারি জেনারেলের বিরুদ্ধে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীকার আন্দোলনে রূপ নেয়। এই স্রোতটাই বুঝতে পেরেছিল আওয়ামী লীগ যার নেতৃত্ব দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এই স্রোতের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে তিনি রাষ্ট্রজন্ম দেন। কিন্তু সেই নবীন রাষ্ট্রেই ২৫ জানুয়ারি ১৯৭৫ সংসদীয় গণতন্ত্রের মৃত্যু হয়। শুরু হয় সামরিক শাসন। অতপর সামরিক শাসকের হাতে বহুদলীয় গণতন্ত্রের যাত্রা তাও থেমে যায়। আশির দশকে স্বৈরাচারের রথযাত্রা। আবার গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের লড়াই। আওয়ামী লীগ ও বিএনপি ভাই ভাই। স্বৈরাচারের পতন হলো। চার চারটি সুষ্ঠু নির্বাচনও সম্পন্ন হল। এখনো গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াই অব্যাহত । তাহলে এই লড়াইয়ের অর্থ কি? স্বৈরাচারীরা নয়; এখন গণতন্ত্রকেই গণতন্ত্রকে হত্যা করেছে?
২০১৪ সালের সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হল। এই নির্বাচন কেন্দ্র করে বর্তমান আওয়ামী লীগ গণতন্ত্রের প্রতি জনতার অনুরাগ বুঝতে পারেনি। বিরোধী দলগুলো নির্বাচনে আসল না, সরকারও চেষ্টা করেও করল না।
নির্বাচনে ভোটার নেই, কিন্তু ভোট আছে। নির্বাচনের উত্সব না থাকলেও সরকার গঠনের উত্সব ছিল। নতুন বিরোধী দল আছে, সেই বিরোধী দলের কোনো ভূমিকা চোখে পড়ছে না। সরকার ও বিরোধী দল একাকার। মনে হচ্ছে সংসদীয় গণতন্ত্রে বিরোধী দলের কোনো প্রয়োজনই নেই। এতো নতুন মডেল। এভাবে গণতন্ত্রহীনা কার মন ভরে?
উপজেলা নির্বাচন হলো। বিরোধী দলগুলোও অংশগ্রহণ করল। কিন্তু গণতন্ত্র ধ্বংসের যে পুরাতন উত্সব। প্রার্থী খুন, ব্যালট পেপার ছিনতাই, ব্যাপক সহিংসতা এই যে পুরাতন মদ নতুন বোতল।
এই তো গেল নির্বাচনী গণতন্ত্রের আলাপ, গণতন্ত্রের নির্যাসের কী হবে? রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের আগ্রহের প্রতি কীভাবে সাড়া দিচ্ছে। অনেক সময়তো মনে হয় সাড়া দেয়ার প্রয়োজনই বোধ করছে না। বিচার বহির্ভূত হত্যা নিয়ে তর্কের শেষ নেই, তবুও শাসন ও বিচার বিভাগের তেমন কোনো উদ্যোগ নেই। টি-টুয়েন্টির উদ্বোধনী অনুষ্ঠান নিয়ে কী কান্ডইনা ঘটল। অথচ সাংস্কৃতিক কর্মীদের কোনো লক্ষ্যই নাই। সংসদের কথাতো আগেই বলেছি এই সংসদে গণমানুষ কীভাবে প্রতিনিধিত্ব করছে তা আমি বুঝতে পারছি না। আর প্রতিনিধিত্ব থেকে থাকলেও তা গণমানুষের অধিকারকে কীভাবে রক্ষা করছে তাও বোধগম্য নয়। তবে সকল প্রতিষ্ঠানই জনগণের পর্যবেক্ষণের অধীন। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। অপরাধ করলে সকলকেই কাঠগড়াই দাঁড়াতে হয়। নির্বাচন কমিশনও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামো। উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে এই কাঠামোটির বেহাল দশা আর গোপন রইলো না। তাই বলতে হয় বাংলাদেশের গণতন্ত্র এখন কোন পথে?
১৮৬১ সালকে সংসদীয় গণতন্ত্রের শুরু ধরলে ১৫৩ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। বাংলাদেশের গণতন্ত্র কোন পথে? আমার তো মনে হয় সেই আগের অবস্থায়। এক সময় এই সংসদ ঔপনিবেশিক শাসকদের স্বার্থ রক্ষা করতো আর এখন এই সংসদ লুটেরা ও ধনিকদের স্বার্থই রক্ষা করছে। আজকের নেতৃত্ব গণতন্ত্র নয়। ক্ষমতাই চায়। নাগরিকগণ উপেক্ষিত। রাষ্ট্র সন্ত্রাসবাদের দোহাই দেয়। আবার নিজেও সন্ত্রাস করে। আইন বিভাগ বিশেষ গোষ্ঠীর স্বার্থেই আইন প্রণয়ন করে শাসন বিভাগ নিজেকে রক্ষা করতেই তা প্রয়োগ করে।
আওয়ামী লীগ স্বাধীনতা আনয়ন ও রাষ্ট্রের জন্মে ভূমিকা রেখেছে; কিন্তু গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠায় তারা কোন পথে? সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম ও বুদ্ধিজীবীদের দায় আছে রাজনৈতিক দলগুলোকে সঠিক পথে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে। অন্যথায় জনতা কখনো না কখনো জেগে উঠবে। তখন কারোরই কিছু করার থাকবে না।
[ লেখক:ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের
রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক]
[email protected]
