এখনই আগামী দিনের লক্ষ্য ঠিক করতে হবে

আপডেট : ২৬ মার্চ ২০১৪, ২১:৩১
যেকোন নির্বাচনই রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য গুরুত্বপূর্ণ। গণতন্ত্রে সার্বজনীন ভোটাধিকার প্রয়োগ, রাজনৈতিক সংগঠন, সমাবেশ, প্রচারণা ইত্যাদি রাজনৈতিক অংশগ্রহণের প্রধান হাতিয়ার। নির্বাচন ব্যতিরেকে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা পায় না। আর এক্ষেত্রে জাতীয় কিংবা স্থানীয় নির্বাচন- যাই হোক না কেন উভয় নির্বাচনেই নাগরিকদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণ হয়ে থাকে। গত ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে নাগরিকদের ব্যাপক রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সুযোগ ঘটেনি। এর জন্য দায়ী দেশে বিদ্যমান রাজনৈতিক দলগুলোর টানাপোড়েন। এক্ষেত্রে কোনো একক দলকে দায়ী করা যায় না। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাচন দেশের রাজনীতি ও রাজনৈতিক দলগুলোর জন্য নিঃসন্দেহে একটি চ্যালেঞ্জ ও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়েছে। সাধারণত একটি ক্লাস থেকে অন্য ক্লাসে উঠতে ফাইনাল পরীক্ষায় অবতীর্ণ হতে হয়। কিংবা আমরা বলতে পারি এভাবে যে, কোনো টুর্নামেন্টে কোয়ার্টার ফাইনাল, সেমিফাইনাল ও সর্বশেষ ফাইনাল খেলে চ্যাম্পিয়ন হতে হয়। কাজেই ফাইনাল পরীক্ষা কিংবা ফাইনাল খেলার আগেই ক্লাস বদল কিংবা চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায় না। নির্বাচনী রাজনীতিও এমনই। স্থানীয় নির্বাচনে ক্ষমতার হাত বদল না হলেও এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ নির্বাচনী গণতন্ত্রের। এ কথা সর্বজনস্বীকৃত যে, স্থানীয় নির্বাচনে নাগরিকদের ও রাজনৈতিক দলগুলোর অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি হয় পূর্ণ মাত্রায়। বাংলাদেশে সংবিধান মোতাবেক স্থানীয় নির্বাচনে দলীয়-প্রার্থী মনোনয়নের বিধান না থাকলেও বাস্তবে দেখা যাচ্ছে যে, প্রতিটি স্থানীয় নির্বাচনেই দলীয় প্রার্থী নির্বাচিত হচ্ছে। আমরা জানি, উপজেলা পর্যায়ের নির্বাচন স্থানীয় সরকার (রাজনৈতিক দলগুলোর প্রত্যক্ষ মনোনয়ন ব্যতীত) পদ্ধতির হলেও বাস্তবে এটি রাজনৈতিক নির্বাচন। গণমাধ্যমে যেভাবে নির্বাচনী ফলাফলকে উপস্থাপন করা হয়েছে তাতে এ নির্বাচনকে দলভিত্তিক হিসেবেই তুলে ধরা হয়েছে। বস্তুত কোনো নির্বাচনকেই রাজনৈতিক দলগুলোর ছত্রছায়ার বিপরীতে বিবেচনা করা যাচ্ছে না। কারণ লক্ষ্য করা যায় যে, নির্বাচন মানেই রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ। এক কথায় বলা যায়, দলভিত্তিক নির্বাচনই যুক্তিসঙ্গত। এ কারণেই হয়তো সরকারের পক্ষ থেকে এমন ধরনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। উন্নত রাষ্ট্রগুলো যেগুলো গণতন্ত্রের ধারক-বাহক সেগুলোতেও স্থানীয় নির্বাচন রাজনৈতিক দলগত অবস্থান থেকেই অনুষ্ঠিত হয়। সেসব রাষ্ট্রে খুব স্পষ্টভাবেই দলীয় বিবেচনাতেই মনোনয়ন ও নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়ে থাকে। ব্রিটেনের মতো পুরনো ও স্থায়ী গণতান্ত্রিক দেশের স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন দেয়া এবং প্রতীক ব্যবহারের সংস্কৃতি রয়েছে। ফলে স্থানীয় পর্যায়ের শাসন ব্যবস্থাতেও দলীয় মতাদর্শ প্রতিফলিত হয়ে থাকে। বিশেষ করে বাংলাদেশের প্রতিবেশি রাষ্ট্র ভারতেও স্থানীয় নির্বাচন সম্পূর্ণভাবে রাজনৈতিক বিবেচনায়। বাংলাদেশে সাংবিধানিকভাবে স্থানীয় নির্বাচনকে দলীয় নির্বাচনের আওতামুক্ত রাখা হলেও কার্যকর ক্ষেত্রে তা হয় না। উপজেলা নির্বাচনে উচ্চ আদালতের নির্দেশে রাজনৈতিক নিবন্ধন হারানো দলের সমর্থক প্রার্থীকেও সংশ্লিষ্ট দলটির নির্বাচিত প্রতিনিধি হিসেবে মিডিয়াতে তুলে ধরা হচ্ছে। যা সম্পূর্ণভাবে প্রচলিত আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। তবে এক্ষেত্রে পরিষ্কার যে, রাজনৈতিক দল কিংবা কেন্দ্রীয় রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটেই স্থানীয় নির্বাচনের গণতান্ত্রিক আচরণ দৃশ্যমান। উপজেলা নির্বাচনের ধারায় দেশে গণতান্ত্রিক উত্সব চলছে। দশম সংসদ নির্বাচনে বিএনপি’র আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের পর এই মুহূর্তে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণ ছাড়া তাদের কোনো বড় রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। ভেতরে ভেতরে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইস্যু নিয়ে আন্দোলনে রাজপথে নামার প্রস্তুতি চলছে। আর সে জন্যই হয়তো বিএনপিকে নতুন করে পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়েছে। এমনকি আন্দোলনের জন্য চলছে মহাপ্রস্তুতি। অন্যদিকে সরকারের পক্ষ থেকেও রয়েছে পাল্টা প্রস্তুতি। বিএনপি’র নীতি-নির্ধারকদের মতে, বিএনপিকে যদি পুনর্গঠন করে সরকার পতনের আন্দোলন জোরদার করতে না পারে তা হলে বিএনপি’র রাজনীতিতে ধস নামবে। এজন্য কুটনৈতিক মহলসহ সারা দেশে বিএনপি’র পক্ষে জোড়ালো ভূমিকা রাখার জন্য একটি বিশেষ টিম ইতিমধ্যেই কার্যক্রম শুরু করেছে। মাঝে-মধ্যে কিছু কর্মসূচি দিলেও তা পালন করতে দলীয় নেতা-কর্মীদের খুব বেশি লক্ষ্য করা যাচ্ছে না। বিশেষ করে সামনে আরও দুই ধাপের উপজেলা নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের চ্যালেঞ্জ কাজ করছে। বর্তমানে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ উভয় দলেরই লক্ষ্য নিজেদের অবস্থানকে উপরে রাখা। নির্বাচনের ফলাফলের দৌড়ে কে আগে যাবে সে হিসাবটা এখন সাধারণ মানুষের মধ্যেও। বিগত নির্বাচনগুলোর ফলাফলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীদের অবস্থান অনেকটাই কাছাকাছি। আগামী দুই পর্বে কোন দল এগিয়ে যাবে তা এখনই বলা মুশকিল। দেশের মানুষ এখন সেটিই দেখতে চায়। তবে বর্তমান নির্বাচনী প্রবণতা দেখে এ কথা বলা যায় যে, আাাওয়ামী লীগ ও বিএনপি’র জনপ্রিয়তার মাত্রা অনেকটা কাছাকাছি। এই মুহূর্তে বিএনপি ভাবছে, নিজেদের সাংগঠনিক শক্তিকে শক্তিশালী করে নির্বাচনের পরে সরকার পতনের আন্দোলনে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ইস্যুতে এগিয়ে যাবে। আর আওয়ামী লীগের শুভাকাঙ্ক্ষীরা মনে করছে, আগামী দুই পর্বের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ তাদের পূর্বের দলীয় কোন্দল আর সাংগঠনিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠে দল সমর্থিত প্রার্থীদের জয়ের ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। বর্তমানে রাজনৈতিক দিক থেকে বিএনপি কিছুটা ইতিবাচক। কারণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচনকে প্রতিহত করতে জামায়াত নির্ভর যে সহিংসতা দেশব্যাপী করেছে তার থেকে বেরিয়ে এসে উপজেলা নির্বাচনে অংশগ্রহণের মাধ্যমে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছে যে, নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে দলটির অনীহা নেই। এক্ষেত্রে উপজেলা নির্বাচনের মাধ্যমে সুযোগটি তারা গ্রহণ করেছে। জনগণও তার প্রতিদান দিয়েছে। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এখনও বিএনপি একটি ছন্নছাড়া রাজনৈতিক দল। কোনো দিক দিয়েই একথা জোর দিয়ে বলা যাবে না যে, দল হিসেবে বিএনপি নিজেদেরকে সুসংহত করতে পেরেছে। কেন্দ্রীয় নেতা-কর্মীদের ভেতর রয়েছে নানা ধরনের দ্বিমত। চলমান উপজেলা নির্বাচন সরকারের জন্য বিশেষ করে আওয়ামী লীগের জন্য বিশাল এক সুযোগ এনে দিয়েছে আত্মসমালোচনার। এ মুহূর্তে দুর্বলতাগুলোকে খুঁজে বের করে আওয়ামী লীগ নিজেদেরকে ঢেলে সাজাতে পারবে। তবে একটি বিষয় খুব গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করতে হবে যে, সাম্প্রতিক আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের লাগামহীন মন্তব্য থেকে বিরত থাকা জরুরি। প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো অনুষ্ঠানে দলটির প্রথমসারির নেতা-কর্মীরা অন্যায্য এবং আক্রমণাত্মক আচরণ করে যাচ্ছে। মনে রাখতে হবে, বিএনপি বর্তমানে এদেশের একটি বড় রাজনৈতিক দল মাত্র। বর্তমানে বিএনপি বিরোধী দলে নেই। তবে দলটিকে গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করে কিছুটা সহনশীল হতে হবে আওয়ামী লীগকে। সংসদ নির্বাচন নিয়ে যাই ঘটুক না কেন, এখন সরকারের কাজ দিয়ে নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা প্রমাণ করার সময়। সরকারকে নিয়ে জনগণ যদি আশাবাদীই না হয় তাহলে তাদের বিরুদ্ধে জনমত সংঘবদ্ধ হতেও বেশিদিন সময় লাগবে না। সবচেয়ে বড় কথা হলো, সরকারের দেয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী যে কাজগুলো দ্রুততম সময়ে সমাধান করার কথা সেগুলোর অগ্রগতি সম্পর্কে প্রতিনিয়ত জনগণকে অবহিত করতে হবে। জনগণের মনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হতে পারে এমন কোনো কাজ সরকারের করা ঠিক হবে না। আর তা না হলে এক্ষেত্রে সরকারের জন্য বিপরীত ফলাফল বয়ে আনবে তাতে কোনই সন্দেহ নেই। অতএব বলা যায়, চলমান উপজেলা নির্বাচনের ফলাফল দেশের দুটি বড় দলকেই অনেক সতর্ক করেছে। আওয়ামী লীগ দেশের অন্যতম বৃহত্ রাজনৈতিক দল, বিএনপি’র বয়সও কম নয়। এদেশের রাজনীতিকে সুষ্ঠু ও সুন্দর পথে পরিচালিত করতে দু’পক্ষেরই ভূমিকা অনেক। আর এই ভূমিকা পালনে যে পক্ষ অধিক সফলতার পরিচয় আনবে আগামী দিনগুলো তাদের জন্যই পরিষ্কার হবে। লেখক: রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক E-mail: [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন