ক্রিমিয়া সমস্যা বর্তমান বিশ্বের সবচেয়ে বেশি আলোচিত ঘটনা, যা স্নায়ুযুদ্ধোত্তর স্থিতিশীলতা বিনষ্ট করে একবিংশ শতাব্দীর আন্তর্জাতিক সম্পর্কে শ্বাসরুদ্ধকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। সদ্য সমাপ্ত গণভোটের মাধ্যমে ক্রিমিয়ার স্বাধীনতা ঘোষণা এবং ইউক্রেন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত হওয়াকে কেন্দ্র করে বিশ্বব্যাপী বিতর্ক চলছে। অনেকে মনে করেন, ক্রিমিয়ার বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন উসকে দিয়ে এবং পরবর্তীতে ক্রিমিয়াকে নিজ দেশের সীমানায় অন্তর্ভুক্ত করে রাশিয়া ইউক্রেনের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব লংঘন করে জাতিসংঘ সনদ অমান্য করেছে। আবার অনেকে গণভোট অনুষ্ঠান এবং রাশিয়ার সাথে সংযুক্তির বিষয়টিকে স্বায়ত্তশাসিত ক্রিমিয়ায় জনগণের নিজস্ব ব্যাপার হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁদের মতে, ক্রিমীয় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার রয়েছে এবং জাতিসংঘের সনদে সে আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের স্বীকৃতিও রয়েছে। স্পষ্টত পাশ্চাত্যপন্থী এবং মস্কোপন্থী পরস্পরবিরোধী এ বক্তব্যের ভীড়ে ক্রিমিয়ার সংখ্যালঘু জনগণের চাওয়া-পাওয়া ও আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের মৌলিক প্রশ্নটি একেবারে আলোচনার বাইরে থাকছে। ফলে সেইসব অত্যাচারিত-শোষিত-বঞ্চিত সংখ্যালঘু জনগণের মৌলিক অধিকারসমূহ আদৌ অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক বিবেচনায় স্থান পাচ্ছে না।
যুক্তরাষ্ট্র, ইইউসহ তাদের অনুসারী দেশের রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ এবং পাশ্চাত্যপন্থী রাজনৈতিক বিশ্লেষণকগণের মতে, ক্রিমিয়া-সংক্রান্ত রাশিয়ার অনুসৃত পদক্ষেপসমূহে ইউক্রেনের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে রাশিয়ার হস্তক্ষেপ প্রমাণিত হয়েছে। কৃষ্ণ সাগর এলাকায় সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়ে এবং সশস্ত্র রুশ কমান্ডোদের সহযোগিতা দিয়ে রাশিয়া ক্রিমীয়দেরকে গণভোটে উত্সাহিত করে ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার সাথে সংযুক্ত করার অন্যায় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। ইতিমধ্যে কোন কোন বিশ্লেষক রাশিয়ায় এ কাণ্ডকে হিটলারের ‘সুডেটেনল্যান্ডকরণের’ সাথে তুলনা করেছেন। সুডেটেনল্যান্ডে জার্মান নাগরিকদের নিরাপত্তার অযুহাত দেখিয়ে হিটলার ঐ ভূখণ্ডকে জার্মানির অধীনে নিয়ে আসেন। পরবর্তীতে গ্রেট ব্রিটেনের যোগসাজশে মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে তাঁর সুডেটেনল্যান্ডই জেসনের বৈধতাও পেয়ে যায়। এ বক্তব্যের দুর্বল দিক হলো হিটলারের দখলকৃত ভূখণ্ডে জার্মান নাগরিকরা সংখ্যাগরিষ্ঠ ছিল না। ফলে হিটলারের দখলের আইনসংগত যৌক্তিকতাও ছিল না। কিন্তু পুতিনের দাবি অনুযায়ী ক্রিমিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ রুশদের নিরাপত্তা বিধানের বিষয়টি হয়ত সুডেটেনল্যান্ডের জার্মানদের নিরাপত্তার সাথে তুলনা করা যায় না। গত ২৩ মার্চ এএফপি প্রকাশিত একটি ছবিতে দেখা যায় কিয়েভের স্বাধীনতা চত্বরের র্যালিতে একটি পোস্টারে বিক্ষোভকারীরা ভ্লাদিমির পুতিনকে অ্যাডল্ফ হিটলারের ছবিতে চিত্রিত করে ছবিটির নাম ‘অ্যাডল্ফ পুতিন’ হিসেবে উপস্থাপিত করে ব্যঙ্গ করেছেন।
এ ধারার অনেক বিশ্লেষক পুতিনের ক্রিমিয়া-নীতিকে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারের প্রয়াস হিসেবে অভিহিত করেছেন। মূলত রাশিয়ার ভবিষ্যত্ পরিকল্পনা নিয়ে বিশ্লেষকগণ বেশ কয়েক বছর ধরে এমন জল্পনা-কল্পনা করছিলেন। পুতিন নিজ মুখে স্পষ্ট করে না বললেও রাশিয়ার অনুসৃত পদক্ষেপের মধ্যদিয়ে এক ধরনের ‘পুতিন মতবাদ’ বিকশিত হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা কৌশলে বিদেশি-নেতৃবৃন্দের শরীরের ভাষা অনুধাবনের জন্য মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ে, ‘সার্বিক মূল্যায়ন’ নামক যে প্রক্রিয়া চালু আছে, তাতে গত কয়েক বছর ধরে পুতিনের জুডো স্টাইলের স্পোর্টসম্যান সুলভ নগ্ন বক্ষ প্রদর্শনেও পণ্ডিতগণ পুতিন মতবাদের ইংগিত পেয়েছেন। পেন্টাগণের মুখপাত্র এডমিরাল জন কিরবি স্বীকার করেছেন যে পুতিন এবং মেদভেদেভের শারীরিক ভাষা মূল্যায়নে অফিস অব নেট এসেসমেন্ট ২০০৮ সালে এবং ২০১২ সালে বেশ তত্পর ও সক্রিয় ছিল। ২০০০ সালে রাশিয়ায় প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হয়েই পুতিন রাশিয়াকে স্নায়ুযুদ্ধকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের শৌর্য-বীর্যে প্রতিষ্ঠিত করার প্রকল্প পাকাপোক্ত করে আসছেন। উদাহরণস্বরূপ রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ সম্পদ যথা- গ্যাস ও তেলের উপর তিনি ইতোমধ্যে রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করেছেন, দেশের আভ্যন্তরীণ ক্ষয়িষ্ণু অর্থনীতির সংস্কার সাধন করেছেন এবং গণমাধ্যম ও বিচার বিভাগের উপর নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণ কায়েম করে কর্তৃত্ববাদী শাসনের যুগে রাশিয়াকে প্রবিষ্ট করিয়েছেন। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ইরান, সিরিয়া, ভেনেজুয়েলাসহ সকল ইস্যুতে তিনি রাশিয়ার নীতিকে যুক্তরাষ্ট্রের নীতির সাথে সাংঘর্ষিক করে প্রণীত করেছেন।
পুতিন মতবাদের স্পষ্ট প্রকাশ ঘটেছিল ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রকাশিত পররাষ্ট্রনীতির ধারণাপত্রে, এর মূল প্রতিপাদ্য বিষয় হলো, রাশিয়া প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর সাথে নিবিড় সহযোগিতার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে আঞ্চলিক একতাবদ্ধতার নতুন যুগে প্রবেশ করবে। পররাষ্ট্রনীতির এ ধারণাপত্রে আঞ্চলিক ঐক্যের ডাক ছিল প্রকাশ্যে, যার মধ্যে প্রচ্ছন্ন ছিল আঞ্চলিক হস্তক্ষেপের নীল-নকশা। ক্রিমিয়া দখলের মাধ্যমে পুতিন মতবাদের সেই সুদূরপ্রসারী লক্ষ্য বাস্তবায়িত হওয়ার পথে।
ক্রিমিয়া দখলের পর অনেকে শংকিত রাশিয়ার পরবর্তী পদক্ষেপের বিষয়ে। ইতিমধ্যে ইউক্রেনের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের রুশভাষী নাগরিকরা পুন-বিচ্ছিন্নতাবাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। অনতিবিলম্বে রাশিয়া ইউক্রেনও দখলের ফন্দি আঁটবে বলে অনেকে বিশ্বাস করতে শুরু করেছে। অনেক বিশ্লেষক পূর্ব ইউরোপের বিশেষত রাশিয়ার সাবেক রাষ্ট্রগুলোর উপর রাশিয়ার কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা বা সেগুলো দখলে রাশিয়া ক্রিমীয় নীতি অনুসরণ করবে বলে ভবিষ্যদ্বাণী করছেন। এ রকম যদি ঘটে তাহলে রাশিয়ার প্রতি পাশ্চাত্যের নম্রনীতি অনেকটা দায়ী হবে, যেমন ত্রিশের দশকে হিটলারের প্রতি ইউরোপের তোষণ-নীতির কারণে জার্মানী পার্শ্ববর্তী ভূখণ্ডগুলো দখল করতে সক্ষম হয়েছিল। ২০১৩ সালের মার্চে প্রকাশিত ‘ফরেন পলিসি’ জার্নালের এক নিবন্ধে লিও এরন পুতিনের কার্যাবলী এবং সম্প্রসারণ নীতিকে ফিনল্যান্ডকরণ হিসেবে অভিহিত করেন। স্নায়ুযুদ্ধকালে ফিনল্যান্ডের উপর সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের একচ্ছত্র আধিপত্য চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। এ নীতির ফলে রাশিয়ার প্রতিবেশী দেশগুলো নিজস্ব অভ্যন্তরীণ, অর্থনীতি, শিক্ষা প্রভৃতি বিষয়ে স্বীয় সিদ্ধান্ত প্রয়োগ করতে পারলেও পররাষ্ট্র বিষয়ে রাশিয়া কর্তৃক প্রণীত নীতি অনুসরণ করতে বাধ্য।
আঞ্চলিক ঐক্যের ছদ্মাবরণে আঞ্চলিক আধিপত্য বিস্তারে রাশিয়ার মহাপরিকল্পনার বাস্তবায়নের উদ্দেশ্যে রাশিয়া তার পারমাণবিক শ্রেষ্ঠত্ব অক্ষুণ্ন রেখে দূরদেশে অস্ত্র প্রেরণের ধারা বজায় রেখেছে।
ক্রিমিয়ায় রাশিয়ার সাম্প্রতিক নীতিকে অপর রাষ্ট্রে হস্তক্ষেপ হিসেবে যারা মনে করেন না, তাদের যুক্তি হলো ক্রিমিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণই তাদের ভাগ্য নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। রাশিয়া কেবল তাদের ইচ্ছের বাস্তবায়নে সহযোগিতা করেছে। এ ধারায় বিশ্লেষকগণের যুক্তি হলো, ক্রিমিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণ রুশভাষী এবং তাদের নিরাপত্তা রক্ষার বিষয়টি রুশ সংবিধানে স্বীকৃত। তাদের দ্বিতীয় যুক্তি হলো, ক্রিমিয়ার জনগণ নিজ থেকে ইউক্রেনের শাসনমুক্ত হতে স্বাধীনতার পক্ষে গণভোটের আয়োজন করেছে। ইতিপূর্বে তারা স্বায়ত্তশাসিত ছিলেন, এখন পূর্ণ স্বাধীনতা অর্জন করতে চাইছেন। এ ধারার বিশ্লেষকদের তৃতীয় যুক্তি হলো, ঐতিহাসিকভাবে ক্রিমিয়া রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত ছিল। ১৯৫৪ সালে ক্রুশ্চেভ ক্রিমিয়াকে ইউক্রেনের কাছে সমর্পণ করেছিলেন মাত্র। নব্বই-এর দশকে স্নায়ুযুদ্ধের অবসানের পর যখন ইউক্রেন স্বাধীন হয়, তখন ক্রিমিয়ার জনগণের রায়ের প্রতি কোন শ্রদ্ধা দেখানো হয়নি। অধিকাংশ ক্রিমিয়াবাসী এ অন্তর্বর্তীকালীন সময়কে যন্ত্রণাদায়ক হিসেবে বিবেচনা করে থাকেন। তবে তিনমাস পূর্বেও গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত মস্কোপন্থী প্রেসিডেন্ট ইউক্রেনের ক্ষমতায় ছিলেন বলে কোনভাবে ক্রিমীয় রুশরা নির্বিঘ্ন থাকতে পেরেছেন। কিন্তু মস্কোপন্থী সরকারের উত্খাতের পর থেকে গত তিনমাস ধরে ক্রিমীয়রা ব্যথাতুর ভাগ্য বরণ করে নিয়েছেন। স্বাভাবিকভাবে তাই গণভোটের মাধ্যমে আপন ভাগ্য গঠনের অধিকার ক্রিমীয়দের আছে, যাকে কোনভাবে সুডেটেন ল্যান্ডকরণ বা ফিনল্যান্ডকরণ প্রক্রিয়ার সাথে তুলনা করা যৌক্তিক নয়।
আগেই বলেছি, এ ধরনের তর্ক-বিতর্কের যাঁতাকলে ক্রিমিয়ার সংখ্যালঘু তাতারদের ভাগ্য চরম অনিশ্চয়তায় নিক্ষিপ্ত হয়েছে। স্মরণ করা যেতে পারে, তাতাররা ছিলেন ক্রিমিয়ার সংখ্যাগরিষ্ঠ অধিবাসী। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা হিটলারকে সমর্থন করেছিলেন এ অভিযোগ উত্থাপন করে ১৯৪৪ সালের দিকে স্টালিন প্রায় দুইলক্ষ তাতারদেরকে দেশত্যাগে বাধ্য করেছিলেন এবং রুশদেরকে ঐ এলাকায় পুনর্বাসিত করে তাতারদের বংশ ধ্বংস করেছিলেন। এখনো তাতাররা জনসংখ্যার ১২ শতাংশ এবং এথনিক ইউক্রেনীয়রা এক-চতুর্থাংশ দখল করে আছে। রুশরা জনসংখ্যার ৫৮ শতাংশ। অর্থাত্ ক্রিমীয় জনগণের ৪২ শতাংশ রুশ জনগণের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক। তবে এদের মধ্যে তাতারদের স্পষ্ট, নৈতিক ও রুশবিরোধী অবস্থান সর্বজনবিদিত। তাদের উপর স্টালিনের ভয়াবহ মহাসন্ত্রাস এবং অদ্যাবধি তাদের উপর রুশদের অকথ্য নির্যাতনের মুখে তাতাররা এবারো গণভোট বর্জন করে নি:সন্দেহে রাশিয়ার বিরাগভাজন হয়েছেন। ক্রিমিয়াকে রাশিয়ার অন্তর্ভুক্ত করার পর পর রাশিয়ার উপর যে ঐতিহাসিক দায়িত্ব বর্তায়, তা হলো সংখ্যালঘু তাতারদের উপর সুবিচার প্রতিষ্ঠা করে তাদের বেদনাবিধূর স্মৃতিতে স্বস্তি ফিরিয়ে আনা। ক্রিমিয়ার উন্নয়নে দীর্ঘসূত্রিতা নিশ্চিত করতে সংখ্যালঘুদের অধিকার নিশ্চিত করে জাতিগত সমতা ও জাতিগত একতা প্রতিষ্ঠিত করে জাতীয় ঐক্য ও সংহতির পথ ত্বরান্বিত করা। ক্রিমিয়া দখল করে যে বৈশ্বিক দুর্নাম রাশিয়া অর্জন করেছে, ক্রিমিয়ার সংখ্যালঘু সম্প্রদায়, বিশেষত তাতারীয় মুসলিমদের প্রতি সদাশয়, সুবিচারমূলক নীতি প্রণয়ন করে রাশিয়া কিছুটা বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন করতে পারে।
লেখক :অধ্যাপক, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
