স্বর্ণ চোরাচালান

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২২:০২
দেশের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরগুলিতে একের পর এক যেইভাবে স্বর্ণ আটক হইতেছে তাহাতে ধারণা হয় যে হঠাত্ করিয়াই স্বর্ণের চোরাচালান উদ্বেগজনকভাবে বৃদ্ধি পাইয়াছে। সর্বশেষ গত মঙ্গলবার চট্টগ্রাম শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রায় ১০৭ কেজি স্বর্ণ আটক করা হইয়াছে—যাহা এই যাবত্কালের মধ্যে সর্ববৃহত্। লক্ষণীয় যে গত বত্সর যেইখানে সর্বসাকুল্যে ৮০ কেজি স্বর্ণ আটকের ঘটনা ঘটিয়াছে, সেইখানে চলতি বত্সর গত তিন মাসেই আটক হইয়াছে ১৭০ কেজি স্বর্ণ। এই চিত্রটি কেবল চট্টগ্রাম বিমানবন্দরের। ঢাকা ও সিলেট আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের চিত্রও খুব একটা ভিন্ন নহে। দুইটি বিমানবন্দরেই আটক হইয়াছে স্বর্ণের বেশকিছু অবৈধ চালান। দেশে অবৈধ উপায়ে স্বর্ণ আনার ঘটনা নূতন নহে। তবে আটককৃত স্বর্ণের পরিমাণ ও চোরাচালানের ব্যাপকতা দৃষ্টে নিশ্চিতভাবে বলা যায় যে এখন তাহাতে নূতন মাত্রা যোগ হইয়াছে। ইহার কারণ কী—তাহা লইয়া নানা মত রহিয়াছে। দেশিবিদেশি নানা সূত্র উদ্ধৃত করিয়া গত মঙ্গলবার ইত্তেফাকে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে আটককৃত স্বর্ণের গন্তব্য হইল ভারত। প্রতিবেশী দেশটিতে সমপ্রতি স্বর্ণ আমদানির উপর উচ্চহারে শুল্ক আরোপিত হওয়ায় চোরাচালানিরা বাংলাদেশকে রুট হিসাবে ব্যবহার করিতেছে মাত্র। ভারতের ফিনান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের (এফআইইউ) প্রদত্ত তথ্যেও ইহার জোরালো সমর্থন রহিয়াছে। সংস্থাটির মতে, প্রতিদিন ৭ শত কেজি স্বর্ণ চোরাচালানের মাধ্যমে ভারতে প্রবেশ করিতেছে। জানা যায়, গত এক বত্সরে দেশটিতে স্বর্ণ চোরাচালান তিনশত গুণ বৃদ্ধি পাইয়াছে। ইহা সুবিদিত যে ১২৪ কোটি জনসংখ্যার বিশাল এই দেশটিতে ঐতিহ্যগতভাবে স্বর্ণের কদর ও চাহিদা ব্যাপক। অবশ্য বাংলাদেশে অবৈধভাবে এই বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কাহারা কেন আনিতেছে—তাহা লইয়া ভিন্ন মতও রহিয়াছে। গন্তব্য বা উদ্দেশ্য যাহাই হউক, আমাদের নানা দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ যে আটক করা সম্ভব হইতেছে—তাহা স্বস্তিকর শুধু নহে, অত্যন্ত প্রশংসনীয়ও বটে। মনে রাখিতে হইবে যে স্বর্ণ ও মাদকের মতো সামগ্রীর চোরাচালান ঠেকাইতে গিয়া বিশ্বের বহু দেশ হিমশিম খাইতেছে। কারণ কাজটি খুবই কঠিন। অভিজ্ঞতায় দেখা গিয়াছে যে এই ধরনের অপকর্মের সহিত শুধু যে বিশাল অর্থযোগ রহিয়াছে তাহাই নহে, আছে দৃশ্য-অদৃশ্য নানা প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠ যোগসাজশও। ফলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রে চোরাচালানকৃত স্বর্ণ বা পণ্য আটক করা সম্ভব হইলেও নাটের গুরুরা ধরাছোঁয়ার বাহিরেই থাকিয়া যায়। তদুপরি, উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে এই ক্ষেত্রে আমাদের সামর্থ্যের ব্যাপক সীমাবদ্ধতার বিষয়টি সর্বজনবিদিত। নিরাপত্তাজনিত নানা ফাঁকফোকর ছাড়াও ব্যক্তিপর্যায়ে অনিয়ম-দুর্নীতির বিষয়টিও উপেক্ষা করিবার মতো নহে। এই বাস্তবতার নিরিখে বিচার করিলে একের পর এক বড়ো ধরনের স্বর্ণের চালান আটকের বিষয়টি নিঃসন্দেহে উচ্চ প্রশংসার দাবিদার। পাশাপাশি, ইহাও গুরুত্বপূর্ণ যে আটককৃত স্বর্ণগুলি রাষ্ট্রীয় কোষাগারেই জমা হইতেছে। তবে আত্মতৃপ্তিতে ভুগিলে চলিবে না। চোরাচালানের সহিত নাম জড়াইয়া যাওয়াটা দেশের ভাবমূর্তির জন্য ইতিবাচক কিছু নহে। কাহারা কী উদ্দেশ্যে ইহা করিতেছে তাহা অবশ্যই তদন্ত করিয়া দেখা দরকার। পাশাপাশি আরও জোরদার করা দরকার চোরাচালানবিরোধী তত্পরতা। ইহার জন্য প্রযুুক্তিগত ও আনুষঙ্গিক দক্ষতা বৃদ্ধির বিষয়টি নিঃসন্দেহে সর্বাগ্রগণ্য। তবে এই ক্ষেত্রে ব্যক্তির ভূমিকাও কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ নহে। অতএব, সততা ও কর্মদক্ষতার স্বীকৃতি হিসাবে ব্যক্তিপর্যায়ে উপযুক্ত প্রণোদনা প্রদানের বিষয়টিও মাথায় রাখিতে হইবে বৈকি।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন