ইউক্রেন হইতে ছুটিয়া যাইয়া রাশিয়ার সহিত ক্রিমিয়ার যুক্ত হইবার ঘটনায় বোধগম্য কারণেই ক্ষুব্ধ পশ্চিমা বিশ্ব। মস্কোকে তাহার পথ হইতে ফিরাইয়া আনিবার জন্য বারাক ওবামার নেতৃত্বে চেষ্টা-চরিত্র শুরু করিয়াছে তাহারা। প্রথম দফাতে কিছুসংখ্যক রুশ কর্মকর্তার ভিসা বাতিল এবং সম্পদ জব্দ করা হইয়াছিল। চলতি সপ্তাহে ওবামার ইউরোপ সফরকালে রাশিয়ার জ্বালানি সম্পদের উপরে বিধি-নিষেধ জারি করিবার ব্যাপারটি গুরুত্বের সহিত আলোচনা করা হইতেছে। পশ্চিমা বিশ্ব মনে করিতেছে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞার মধ্য দিয়া ক্রিমিয়া বিষয়ক কার্যের জন্য রাশিয়াকে শাস্তি দান সম্ভব হইবে। স্নায়ুযুদ্ধোত্তর মোটামুটি এক কেন্দ্রিক বিশ্বব্যবস্থার নেতৃত্বে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট অবশ্য এহেন উদ্যোগের ঝুঁকিগুলিও ভালোভাবেই বুঝিতে পারিতেছেন বলিয়া মনে হইতেছে। ওবামা স্পষ্ট করিয়া দিয়াছেন যে, রাশিয়ার বিরুদ্ধে জ্বালানি নিষেধাজ্ঞা আরোপ কেবল রাশিয়াকেই ক্ষতিগ্রস্ত করিবে না বরং ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত (ইইউ) দেশগুলিকেও আঘাত হানিবে। এমনকি বিশ্ব অর্থনীতির উপরেও ইহার প্রভাব পড়িবার আশঙ্কা স্পষ্ট করিয়া দিয়াছেন তিনি। এক্ষণে ইইউভুক্ত প্রধান রাষ্ট্রগুলি নিজ-নিজ ক্ষতি মানিয়া লইয়া কতখানি অগ্রসর হইতে পারে তাহাই দেখিবার বিষয়। ক্রিমিয়া-কাণ্ডের পরে পশ্চিমের মূলধারার একটি অংশ রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের আওয়াজ তুলিতে শুরু করিয়াছিল। তবে সুখের বিষয় এই যে, এহেন প্ররোচনাতে ওয়াশিংটন সায় দেয় নাই। প্রেসিডেন্ট ওবামা জানাইয়া দিয়াছেন যে, সামরিক ব্যবস্থা গ্রহণের কোন চিন্তাই করা হইতেছে না। এমনকি বর্তমান পরিস্থিতিকে নূতন একটি স্নায়ুযুদ্ধ যুগের সূচনা হিসাবে চিহ্নিত করিতেও নারাজ ওবামা। উদ্ভূত পরিস্থিত ও বিদ্যমান বাস্তবতাতে ওবামার এইসব উপলব্ধি যৌক্তিক বলিয়া, মনে হয়। বুধবার ব্রাসেলসে প্রদত্ত ওবামার ভাষণটিকে এহেন প্রবণতার সর্বশেষ উদাহরণ হিসাবে বিবেচনা করা যাইতে পারে।
ওবামার মতে ইউক্রেনে যাহা চলিতেছে তাহা হইল “আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকার বনাম শক্তির লড়াই”। প্রশ্ন হইতেছে ইউক্রেন প্রসঙ্গে যদি এই বক্তব্য সঠিক ধরিয়া লওয়া হয় তাহা হইলে ইরাক বা আফগানিস্তানের ক্ষেত্রে কি বলা হইবে? ইরাক হইতে একটা সময়ে সরিয়া আসাকেই পশ্চিমের ন্যায়পরায়ণতার ধ্বজা হিসাবে তুলিয়া ধরিয়াছেন ওবামা। ইরাকে অভিযান আন্তর্জাতিক নিয়ম-কানুনের মধ্যে থাকিয়া চালানো হইয়াছিল বলিয়াও দাবি করিয়াছেন তিনি। এহেন খণ্ডিতভাবে নিজদিগের কৃতকর্মের ন্যায্যতা প্রতিপাদন করিতে থাকিলে, রাশিয়া যেই ঘটনা ঘটাইয়াছে তাহা লইয়া সুনীতির ভাষণ দেওয়ার নৈতিক বৈধতা কিভাবে থাকে তাহা একটি বড় প্রশ্ন বটে। সন্দেহ নাই, রাশিয়া কাজটি ভালো করে নাই। ইহাতেও কোন সন্দেহ নাই যে, ইউক্রেনের অঙ্গচ্ছেদের মধ্য দিয়া জাতিরাষ্ট্রের সার্বভৌমত্বের বিষয়টি নূতন এক ধরনের প্রবণতার মধ্যে পড়িয়া গেল। কিন্তু পশ্চিমা বিশ্ব স্বীয়-স্বার্থে বিশ্ববাসীকে ইতিহাস ভুলাইয়া দেওয়ার চেষ্টা করিলে খুব একটা ভালো কিছু আশা করা ঠিক হইবে না। ইউক্রেনকে দ্রুতই ইইউভুক্ত করিয়া রাশিয়ার নাকের ডগাতে ন্যাটোর সামরিক উপস্থিতি নিশ্চিত করিবার জন্য সাম্প্রতিক সময়ের তোড়জোড়গুলি কি বুঝিতে অসুবিধা হয়? ইউক্রেনের রুশপন্থি প্রেসিডেন্টকে ক্ষমতা হইতে বিতাড়ন, দেশটির মধ্যে বিপুল সংখ্যক রুশ ভাষাভাষী মানুষের বিরুদ্ধে ইইউপন্থি ও উগ্র ডানপন্থি জাতীয়তাবাদীদিগকে যাবতীয় সমর্থন দানের মত সত্যগুলি একপাশে সরাইয়া রাখিয়া বিশ্ব জনমতকে কিছুদিনের জন্য বিভ্রান্ত করা সম্ভব হইলেও অশান্তির স্থলে যে শান্তি নামিয়া আসিবে না তাহা নিশ্চিত।
