স্বাধীনতার চুয়াল্লিশ বছর

আপডেট : ২৭ মার্চ ২০১৪, ২২:০২
আমি যখন এটা লিখছি তখন বাংলাদেশ স্বাধীনতার ৪৪ বছরে পা দিয়েছে। একজন মানুষ যখন ৪৪ বছর পা দেয় সে তখন পূর্ণ বয়স্ক হয়ে যায়, দেশের জন্যে সেটা সত্যি নয়, ৪৪ বছরে একটা দেশের জন্য এমন কিছু বয়স নয়। আমাদের দেশের জন্যে তো নয়ই, এই ৪৪ বছরের ভেতর ১৫ বছর দেশটা ছিল মিলিটারি শাসকদের কব্জায়—দেশের মন-মানসিকতা তখন একেবারে উল্টো দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে, তাই আমাদের দেশ আসলে শূন্য থেকে শুরু করেনি—নিগেটিভ থেকে শুরু করেছে। এই ৪৪ বছরেও দেশের কয়েকটা খুব বড় অপ্রাপ্তি রয়েছে, আমার ধারণা সেগুলো গুছিয়ে না নেয়া পর্যন্ত আমরা ঠিকভাবে অগ্রসর হতে পারব না। তার একটা হচ্ছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অবস্থান—আমরা যারা স্বচক্ষে এই দেশটিকে জন্ম নিতে দেখেছি তারা জানি বাংলাদেশ আর বঙ্গবন্ধু প্রায় সমার্থক দুটি শব্দ। বঙ্গবন্ধুর যদি জন্ম না হতো তাহলে আমরা সম্ভবত বাংলাদেশ পেতাম না। ১৯৭৫ সালে সেই বঙ্গবন্ধুকে প্রায় সপরিবারে হত্যা করে এই দেশে এমন একটা পরিবেশ তৈরি করা হল যেখানে বঙ্গবন্ধুর সঠিক অবস্থান দূরে থাকুক, এই মানুষটির অস্তিত্বই রীতিমত মুছে দেয়া হল। শুধুমাত্র আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর বঙ্গবন্ধুর নাম প্রথমবার রেডিও টেলিভিশনে উচ্চারিত হতে শুরু করল। বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধে প্রচারণা এতো ব্যাপক আর পূর্ণাঙ্গ ছিল যে, এখনো অনেকেই মনে করে, যে বঙ্গবন্ধুর নাম উচ্চারণ করে সে বুঝি আওয়ামী লীগের সমর্থক। বঙ্গবন্ধুর প্রতি অসম্মান দেখানোর বিষয়টা সবচেয়ে উত্কটভাবে দেখিয়েছেন খালেদা জিয়া, বঙ্গবন্ধুকে যেদিন সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে সেই দিনটিকে নিজের জন্মদিনের উত্সব করার দিন হিসাবে বেছে নিয়ে। আমাদের পারিবারিক একজনের জন্মদিন ঘটনাক্রমে নিজেদের অন্য একজনের মৃত্যুদিন হয়ে যাওয়ার কারণে জন্মদিনটি আর সেদিন পালিত হয় না—অথচ বঙ্গবন্ধুর মতো একজন মানুষের সপরিবারে নিহত হওয়ার দিনটিতে বিছানার মতো বড় কেক কেটে জন্মদিনের উত্সব পালন করা যে কতো বড় রুচিহীন কাজ, সেটি একটি রাজনৈতিক দল জানে না—সেটি বিশ্বাস করা কঠিন। এই বিষয়টি থেকে একটা বিষয়ই শুধু নিশ্চিত হওয়া যায় যে, বিএনপি (এবং তাদের সহযোগী দলগুলো) এখন বঙ্গবন্ধুকে তার যথাযথ সম্মান দিতে রাজী নয়। সত্যি কথা বলতে কী, তাঁকে অসম্মান করাটা তারা তাদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের অংশ হিসাবে বিবেচনা করে। অথচ সবচেয়ে বিচিত্র ব্যাপার হচ্ছে বিএনপি দলটির জন্ম হয়েছে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর অনেক পরে। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক জীবনে বিএনপি কিংবা তাদের প্রতিষ্ঠাতা কোনো মানুষের সাথে তার কোনো বিরোধিতা হওয়ার কোনো সুযোগ পর্যন্ত ছিল না। তাহলে এই মানুষটিকে তাঁর যথাযথ সম্মান দেখাতে এই দলটির এতে অনীহা কেন? আমি রাজনীতির বিশ্লেষক নই, রাজনীতির অনেক মারপ্যাঁচ বুঝি না। কিন্তু অন্তত এতোটুকু জানি যে, ‘কমনসেন্স’ দিয়ে যদি রাজনীতির কোনো একটা বিষয় বোঝা না যায় তাহলে সেখানে অনেক বড় সমস্যা আছে। তাই কোনো রাজনৈতিক দল যদি বাংলাদেশে রাজনীতি করতে চায়, অথচ সেটা করার জন্যে এই দেশের স্থপতিকেই অস্বীকার করে তাহলে সেটা হচ্ছে ভুল রাজনীতি। ভুল রাজনীতি করলে একটা দল কতো দ্রুত ক্ষমতাহীন হয়ে যেতে পারে সেটা বোঝার জন্যে কী আইনস্টাইন হতে হয়? হয় না। কাজেই আমি ব্যক্তিগতভাবে মনে করি বিএনপিকে যদি এই দেশের রাজনীতিতে টিকে থাকতে হয় তাহলে তাদের সবার আগে বাংলাদেশের জন্ম ইতিহাসে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা স্বীকার করে নিতে হবে। আমরা সব সময়েই রাজনৈতিক দলগুলোর মাঝে সম্প্রীতির অভাব রয়েছে বলে অভিযোগ করি। কিন্তু রাজনৈতিক দলগুলো যদি দেশ, দেশের পতাকা, দেশের জাতীয় পতাকার মতোই সমান গুরুত্বপূর্ণ দেশের স্থপতিকে নিয়েই বিভ্রান্তির মাঝে থাকে, তাহলে তারা কোন্ বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করবে? ২. এবারের স্বাধীনতা দিবসে লাখো কণ্ঠে জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া নিয়ে শুরুতেই একটা জটিলতা তৈরি হয়েছিল, আমরা সবাই সেটা জানি। জটিলতাটি এসেছিল ইসলামী ব্যাংকের অনুদান নিয়ে। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করেছিল যে কুলাঙ্গারেরা, তাদের সমর্থনপুষ্ট এই ব্যাংক কী করেছে সেটি তো কারো অজানা নেই! এই মুহূর্তে যে যুদ্ধাপরাধীর বিচার কাজ চলছে, সেই বিচার কাজকে থামানোর জন্যে দেশে-বিদেশে যে লবিস্ট লাগানো হয়েছে তাদেরকেও টাকা-পয়সা দিয়ে সাহায্য করছে এই ব্যাংক—আমাদের কাছে সেরকম গুরুতর অভিযোগ আছে। জামায়াতে ইসলামী নামে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী যে দলটি আছে তাদের সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে টাকা-পয়সা আর ব্যবসা-বাণিজ্য, এই ব্যাংকটি দিয়েই সেই টাকা-পয়সা, ব্যবসা-বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করা হয়। সেই ব্যাংকটি আমাদের জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্যে টাকা দেবে আর সেই টাকায় আমরা “আমার সোনার বাংলা” গাইব—এটি যে কতো উত্কট একটি রসিকতা, সেটা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার জানে না—সেটা বিশ্বাস করা কঠিন! কিন্তু সেটাই ঘটে গিয়েছিল, এই দেশের তরুণেরা প্রথমে এর বিরোধিতা করে সোচ্চার হয়েছে, তারপর অন্যেরা। এই দেশের মানুষের প্রচণ্ড চাপে সরকার শেষ পর্যন্ত বলতে বাধ্য হয়েছে ইসলামী ব্যাংকের টাকাটা তারা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্যে ব্যবহার করবে না। এইটুকু হচ্ছে ভূমিকা, আমি এর পরের কথাটা বলার জন্যে এই ভূমিকাটুকু করেছি। সরকার ঘোষণা দিয়েছে ইসলামী ব্যাংকের টাকা জাতীয় সঙ্গীত গাওয়ার জন্যে ব্যবহার করা না হলেও টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের জন্যে ব্যবহার করা হবে! সরকারের আচরণ দেখে মনে হচ্ছে এই দেশের তরুণ ছেলেমেয়েরা ইসলামী ব্যাংকের সাথে দুর্ব্যবহার করে ফেলেছে, ইসলামী ব্যাংক যেন সেই দুর্ব্যবহারে মনে কষ্ট না পায় সে জন্যে যেভাবে হোক সরকারের তাদেরকে যথোপযুক্ত সম্মান দেখাতে হবে! তাই তাদের টাকাটা বাংলাদেশের আয়োজিত টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ব্যবহার করা হবে! বেশ কিছুদিন আগে যখন হলমার্ক চার হাজার কোটি টাকা চুরি করেছিল তখন আমাদের অর্থমন্ত্রী বলেছিলেন এটা এমন কিছু বেশি টাকা নয়! (শুনে আমি চমত্কৃত হয়েছিলাম টাকা চুরি করার টার্গেট হিসাবে কতো টাকা রাখা যেতে পারে সেখানে এটা একটা নতুন মাত্রা যোগ করেছিল!) যদি চুরি করার জন্যেই হাজার কোটি টাকা খুব বেশি না হয়, তাহলে ইসলামী ব্যাংকের মাত্র কয়েক কোটি টাকা কেন আমাদের দেশে জাতীয় একটা অনুষ্ঠানে নিতেই হবে? দেশের মানুষের রক্ত মাখা টাকা তাদের ফিরিয়ে দিলে কী হত? মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকারকে জানতে হবে ইসলামী ব্যাংকের প্রতি তাদের এই ভালোবাসা আর সহমর্মিতা এই দেশের অসংখ্য তরুণ-তরুণীকে হতাশ করেছে—আমাকেও হতাশ করেছে। ৩. শুরুতে বলেছিলাম দেশটাকে এগিয়ে নিতে হলে মূল কিছু বিষয়ে সবার একমত হতে হবে, বঙ্গবন্ধু যে এই দেশের স্থপতি সেটি হচ্ছে এরকম একটি বিষয়। এই দেশটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধ করে পাওয়া একটি দেশ, তাই মুক্তিযুদ্ধের যে স্বপ্ন নিয়ে এই দেশটি শুরু করা হয়েছিল সেই স্বপ্নকে ভিত্তি করে তার ওপর পুরো দেশটি দাঁড়া করানো হবে এই সত্যটিও সেরকম একটি বিষয়। আমরা আজকাল খুব ঘন ঘন গণতন্ত্র শব্দটি শুনতে পাই, যখনই কেউ এই শব্দটি উচ্চারণ করবেন তখনই কিন্তু তাকে বলতে হবে—এই গণতন্ত্রটি দাঁড় হবে মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তির ওপরে। আমরা মুক্তিযুদ্ধের ভিত্তি সরিয়ে একটি গণতন্ত্র তৈরি করব, সেই গণতন্ত্র এই দেশটিকে একটা সাম্প্রদায়িক দেশ তৈরি করে ফেলবে, সকল ধর্মের সকল বর্ণের সকল মানুষ সেই দেশে সমান অধিকার নিয়ে থাকতে পারবে না—সেটা তো হতে পারে না। কাজেই ধর্ম ব্যবহার করে রাজনীতি করা গণতান্ত্রিক অধিকার বলে দাবি করা হলেও সেটি কিন্তু আমাদের মুক্তিযুুদ্ধের স্বপ্নের সাথে খাপ খায় না। গত নির্বাচনের ঠিক আগে আগে নির্বাচন প্রতিহত করা আর যুদ্ধাপরাধীর বিচার প্রতিহত করার আন্দোলন যখন মিলে-মিশে একাকার হয়ে গেল, তখন সন্ত্রাস কোন্ পর্যায়ে যেতে পারে, সেটা দেশের মানুষের নিজের চোখে দেখার একটা সুযোগ হয়েছিল। সেই সন্ত্রাসের নায়ক ছিল জামায়াতে ইসলামী আর তার ছাত্র সংগঠন। একাত্তরে এই দেশটিতে যারা যুদ্ধাপরাধ করেছিল, চার দশক পরেও সেই যুদ্ধাপরাধের জন্য তাদের মনে অপরাধবোধ নেই, গ্লানি নেই, একাত্তরের সমান হিংস্রতা নিয়েই তারা এই দেশে তাণ্ডব করতে রাজী আছে। আমি অবশ্য এই লেখায় জামায়াতে ইসলামী সন্ত্রাস নিয়ে কথা বলতে আসিনি। আমি কিছুদিন আগে দেখা খবরের কাগজের একটা রিপোর্টের কথা বলতে এসেছি। যেখানে লেখা হয়েছে উত্তরবঙ্গের কোনো একটি শহরে জামায়াতে ইসলামী বড় একটা দল আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দিয়ে আওয়ামী লীগে যোগ দিতে এসেছে। বিষয়টা কী এতই সহজ? যে সারা জীবন জামায়াতে ইসলামী করে এসেছে, একাত্তরে মুক্তিযোদ্ধাদের জবাই করেছে, হিন্দুদের বাড়ি লুট করে তাদেরকে দেশ ছাড়া করেছে, এই কয়েক মাস আগেও পেট্রল বোমা দিয়ে সাধারণ মানুষকে পুড়িয়ে মেরেছে, হিন্দুদের বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে রাতারাতি তারা জামায়াতে ইসলামী থেকে আওয়ামী লীগ হয়ে গেল? তাদের সমস্ত মন-মানসিকতা চিন্তা করার ধরন, আদর্শ স্বপ্ন একটা ম্যাজিকের মত পাল্টে গেল? তারা এখন বঙ্গবন্ধুর অনুসারী, মুক্তিযুদ্ধের পতাকা বাহক? এটি কী করে সম্ভব? আমাকে কেউ বুঝিয়ে দেবে? নাকি প্রকৃত ব্যাপারটা আরো ভয়ংকর—জামায়াতে ইসলামীর কর্মীদের গ্রহণ করার জন্য আওয়ামী লীগকেই খানিকটা পাল্টে যেতে হবে? তাদের এখন মুক্তিযুদ্ধের কথা বেশি বলা যাবে না, বঙ্গবন্ধুর সমালোচনা করতে হবে, হিন্দু ধর্মের মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করতে হবে, পেট্রল বোমা বানানো শিক্ষতে হবে? কেউ কী আমাকে একটু বুঝিয়ে দেবেন? যে আদর্শকে আমরা এতো গুরুত্ব দিয়ে নিই, রাজনীতিতে সেটা আসলে একটা রং তামাশা? ৪. এই লেখাটি যখন লিখছি তখন খবর পেলাম খালেদা জিয়ার পুত্র তারেক রহমান লন্ডনে ঘোষণা দিয়েছেন, তার বাবা জিয়াউর রহমান যেহেতু “স্বাধীনতার ঘোষণা” দিয়েছিলেন তাই তিনিই হচ্ছেন দেশের “প্রথম” প্রেসিডেন্ট। ভাগ্যিস বেচারা জিয়াউর রহমান বেঁচে নেই, যদি বেঁচে থাকতেন তাহলে নিশ্চিতভাবেই তার গুণধর ছেলের কথা-বার্তা শুনে লজ্জায় গলায় দড়ি দিতেন। লেখক :কথাসাহিত্যিক, শিক্ষক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন